উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের গডফাদার

লক্ষাধিক ভারতীয়-উপমহাদেশীয় ও ভিনদেশীদের নিকট ভারতের ‘ইমেজ’ দাঁড়িয়ে আছে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের উপর। সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন ছবি যেমন, পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, দেবী, অপুর সংসার, চারুলতা ইত্যাদি দর্শককে জীবনের দর্শন শিখিয়েছে। সত্যজিৎ সারা জীবনে প্রায় ৩৬ টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য, ডকুমেন্টারি ইত্যাদি।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে নানান ঘটনা ঘটে। যেসব ঘটনা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, শিক্ষা দেয়। সত্যজিৎ রায়ের জীবনেও এমন কিছু ঘটেছে যা তাঁকে জানতে আগ্রহী করে তুলবে নতুন প্রজন্মকে, সন্দেহ নেই। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, লেখক ও চিত্রশিল্পী।

সত্যজিৎ রায়ের শৈশবে গান শিখতে হতো। তিনি পূর্ব ও পশ্চিমা জগতের গান গেয়েছিলেন। শৈশবে পাওয়া শিক্ষা মানিক বাবু চলচ্চিত্রেও লাগিয়েছিলেন।

চলচ্চিত্রে আগমনের পূর্বে সত্যজিৎ রায় গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে কাজ করে হাত পাঁকিয়েছিলেন। তাঁর মেধার প্রতিফলন ছিল জিম করব্যাট ও জওহরলাল নেহেরুর বইয়ের প্রচ্ছদে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা হবার আগে সত্যজিৎ রায় ১৯৪৭ সালে কলকাতায় খুঁজে পান ফিল্ম ক্লাব।

সত্যজিৎ রায় সবকাজে খুঁতখুঁতে ছিলেন। তিনি অনেকবার শুটিং বন্ধ করে বসেছিলেন শুধুমাত্র তিনি যেমন চাচ্ছিলেন তেমন দৃশ্য, এঙ্গেল, লাইটিং প্রভৃতি মনমতো হয়নি বলে। তিনি শুটিং করার সময় কি করে কম খরচে সেরা দৃশ্য শুট করতে হয় সে চিন্তায় থাকেন। তিনি শুটিং করার পূর্বে দৃশ্যের স্কেচ এঁকে নিতেন।

সত্যজিৎ রায় শুধুমাত্র চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তার একাধিক আয়ের উৎস ছিল। তিনি পত্রিকা, ম্যাগাজিনের জন্য লেখালেখি করতেন, ছবি আঁকতেন। তিনি অনুবাদকও ছিলেন। তার অন্যতম সেরা সৃষ্টি ছিল ফেলুদা ও প্রফেসর শঙ্কু।

এই মানুষটি ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন সেরা পরিচালক হিসেবে। তাঁর এ সম্মানের সমকক্ষ কেউ হতে পারেনি আজো। তিনি যে চলচ্চিত্রগুলোর জন্য পুরষ্কার পেয়েছিলেন সেগুলো হলো –

চিড়িয়াখানা – ১৯৬৭

গোপী গায়েন বাঘা বায়েন – ১৯৬৮

প্রতিদ্বন্দ্বী – ১৯৬৯

সোনার কেল্লা – ১৯৭৪

জন অরণ্য – ১৯৭৫

আগন্তুক – ১৯৯১

প্রথম রঙিন বাংলা চলচ্চিত্র ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২) যেটি নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবিটিকে ভারতের প্রথম সাহিত্য সঙ্কলিত চলচ্চিত্র হিসেবে ধরা হয়।

‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের সময় সত্যজিৎ রায়ের হাতে তেমন টাকা পয়সা ছিল না। তিনি নিজের লাইফ ইন্সুরেন্স বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী গয়না ধার দিয়ে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন। ‘পথের পাঁচালী’ সফল হবার পর সত্যজিৎ রায়কে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি লোন শোধ করেছিলেন, পুরোদস্তর নির্মাতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার সিদ্ধান্তও নিতে পেরেছিলেন।

অবশ্য রায় বাবু সমালোচিত হয়েছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা। ভারতের দারিদ্রতা তুলে ধরেছিলেন একদম ঠিকঠাক, এতেই গাত্রদাহ শুরু হয় সেসব ব্যক্তির। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। তিনি বরং তিরস্কার করেন যারা ভারতের প্রকৃতরূপ তুলে ধরার জন্য সত্যজিৎ রায়কে সমালোচনা করছিল তাদের। সত্যজিৎ রায়ও যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেলেন।

অপু ট্রিলজিকে কখনোই অস্কারের জন্য মনোনিত করা হয়নি, কারণ তাতে ভারতের দারিদ্রতাকে তুলে ধরা হয়েছিল। যদিও অধিকাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে অপু ট্রিলজি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। অস্কার কমিটি অবশেষে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করে যখন তিনি বিছানায় অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন তখন।

তার প্রিয় অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ণ তাঁকে কলকাতায় গিয়ে অস্কার পুরষ্কারটি দিয়ে আসেন। বিছানায় শায়িত অবস্থায় অস্কার হাতে তার একটি ফুটেজও দেখানো হয়েছিল সেবারের একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের (অস্কার) অনুষ্ঠানে।

অসুস্থতা সত্যজিৎ রায়কে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে হঠাতে পারেনি। শেষ সময়ে তিনি ইনডোর শুটিং করতেন, আউটডোর শুটিং করতে ডাক্তারের মানা ছিল। আউটডোর পরিচালনা করতেন পূত্র সন্দীপ রায়।

মৃত্যুর কদিন আগে ভারত সরকার তাকে ভূষিত করে ভারতরত্নে। সত্যজিৎ শুধুই একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, তিনি মানুষকে নানান স্বাদের, বর্ণের দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিয়েছিলেন তার কাজের মাধ্যমে। চলচ্চিত্রের এ গুণী মানুষটি ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল ৭১ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নেন। বিদায় নেন, উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের গডফাদার।

– চাইপানি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।