সাত মসজিদ: লুকিয়ে থাকা মুঘল বিস্ময়

মুঘল সাম্রাজ্যের অধিপতিরা গোটা ভারতবর্ষ নিজেদের অধিকারে রেখে শাসনই করেননি শুধু, ভারতবর্ষের শিল্পেরও প্রসার ঘটিয়েছেন ব্যাপকভাবে।এর প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভারতসহ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে।

দিল্লীর ‘লালকেল্লা’, আগ্রার ’তাজমহল’ এর ন্যায় তাঁরা গোটা ভারতবর্ষে অনেক স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন।কখনো সম্রাটেরা স্বয়ং, কখনো তাদের সুবেদাররাই এসব নির্মাণ করলেও প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক-উভয় দিক থেকেই মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহন করে। আজ তেমনই এক নিদর্শনের কথা বলবো। বলবো ঢাকায় অবস্থিত মুঘল সাম্রাজ্যের এমনই এক ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ নিয়ে।

১৮১৪ সালে স্যার চার্লস ডি ওয়াইলির আঁকা ‘গঙ্গার একটি নদী বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত সাত গম্বুজ মসজিদ’ নামের একটি শিল্পকর্ম

ঢাকায় মোহাম্মদপুরে এক ব্যস্ত সড়কের পাশ দিয়েই ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ এর অবস্থান। স্থানীয়দের কাছে এর নাম সাত মসজিদ। যারা যেতে চান,তাদের অবগতির জন্য বলছি-ঢাকার মোহাম্মদপুরের কাটাসুর থেকে শিয়া মসজিদের দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে বাঁশবাড়ী হয়ে। এই রাস্তাতেই যাওয়ার পথে পড়বে ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’।

অপূর্ব এই মসজিদটির পাশেই এক সময় বুড়িগঙ্গা নদীর একটি অংশ ছিলো। বলা হয়ে থাকে, এই নদীর ঘাটটিতে প্রচুর নৌকা, বজরা, জাহাজ মালামাল ও যাত্রী নিয়ে ভিড় করতো।তবে কাল পরিক্রমায় ওসব কিছুই নেই।নদীর অংশ ভরাট হয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা। বিশালাকৃতির এই মাদ্রাসার পাশে মসজিদটি বেশ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ লাগে।

১৯৩০-এর দশকের সাত মসজিদ

মোহাম্মদপুর থেকে ধানমন্ডি হয়ে পিলখানায় বডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গেট অবধি রাস্তাটাকে বলে সাত মসজিদ রোড। এই মসজিদের নাম অনুসারেই এই রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।

মসজিদটির ধ্বংসপ্রাপ্ত শিলালিপি থেকে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়ে থাকে। ১৬৮০ সালের দিকে উমিদ খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। উমিদ খাঁ ছিলেন বিখ্যাত মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। মসজিদটির নির্মাণ কৌশল ‘লালবাগ দূর্গ মসজিদ’ ও ‘খাজা আম্বর মসজিদ’ এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয় স্থাপনাই মুঘল শিল্পের আরো দুটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

ষাটের দশকের সাত মসজিদ। তখনও নদী টিকে ছিল।

মসজিদটির ছাদে রয়েছে তিনটি বৃহাদাকৃতির গম্বুজ এবং চার কোণায় রয়েছে চারটি অণু গম্বুজ। তিনটি গম্বুজ মূলত নামায কক্ষের ওপর এবং বাকি চারটি গম্বুজ চার কোণের চারটি টাওয়ারের ওপর অবস্থিত। এই সাতটি গম্বুজের কারণেই মসজিদটি ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

আয়তাকার এই মসজিদটি বাইরের দিক থেকে দৈর্ঘ্যে ১৬.৬৮ মিটার ও প্রস্থে ৮.২৩ মিটার। মসজিদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে পূর্বদিকের গাঁয়ে ভাঁজবিশিষ্ট তিনটি খিলান এবং পশ্চিম দেয়ালের তিনটি মিহরাব। মসজিদে চারটি মিনারও রয়েছে। দূর থেকে এই মসজিদটিকে দেখতে এখন আর পর্যটক আসেন কি না সেটা বলা মুশকিল, অনেকটা লুকিয়েই আছে এই মুঘল নিদর্শন।

১৯৮২ সালের সাত মসজিদ

মসজিদের সামনে রয়েছে একটি বড় উদ্যান। সারাবছর এটি বন্ধ থাকলেও বছরে দু’বার এটি খুলে দেয়া হয় ঈদ উপলক্ষ্যে। উদ্যানের অভ্যন্তরে রয়েছে বেশ কয়েকটি সমাধি যেগুলো মুঘল স্থপতিদের সমাধি হিসেবে ধারণা করা হয়।

তবে এই মসজিদের সবচাইতে আকর্ষনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে ‘বিবির মাজার’ যা মূলত শায়েস্তা খাঁর কন্যা সমাধি।এটি মাজারের পূর্বপাশে অবস্থিত। সমাধিটির বাইরের দিক চতুষ্কোণাকৃতির এবং ভেতরের দিক অষ্টকোণাকৃতির। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সমাধিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিলো যা বর্তমানে সংস্কার করা হয়েছে।

সাত গম্বুজ মসজিদ সমাধি

মসজিদটিতে মূলত চার কাতারে প্রায় ৯০ জনের মতো নামায পড়তে পারেন। তবে ঈদের দিন রোদের প্রখরতায় কিংবা বৃষ্টির দিন নামায আদায় করা মুশকিল হয়ে যায় বিধায় বাইরে সামিয়ানা টাঙানো হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিজস্ব উদ্যোগে মসজিদের ভেতর ও বাইরের নামাজ পড়ার অংশটি সংস্কার করে মোজাইক করে দেয়া হয়েছে।

মসজিদটির আশেপাশে বিভিন্ন কারখানার অবস্থান, ও বড় বড় দালান গড়ে ওঠার কারণে মুঘল শিল্পের এই ঐতিহাসিক অংশটির জৌলুশ প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে। তবে আশার কথা, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে এ সমস্ত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

সাত গম্বুজ মসজিদের বর্তমান অবস্থা
অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।