অতীত আকাশের বিস্মৃত তারা

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

‘পরশু তো ষষ্ঠী… আপনার কাজ পরশুর মধ্যে শেষ হবে?’

ব্যস এইটুকু সংলাপেই বাঙাণির কাছে শেষ হয়ে গেছেন এই স্নেহমাখা মুখের বৃদ্ধ পটোরূপী অভিনেতা। পুজো আজকাল শুনি সবাই এই ছবির এই দৃশ্য দিয়ে চিনছে। এই ডায়লগ, এই ছবি ভাইরাল সবাই আপলোড করেন প্রতিবার কিন্তু কজন চেনেন এই কুমোর বৃদ্ধটিকে? তাঁর ডায়লগ বিখ্যাত কিন্তু তাঁর নাম কেউ জানেনা।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ বাদেও তিনি অজস্র লেজেন্ডারি স্বর্ণযুগের ছবিতে অভিনয় করেছেন।

এই পটো ভদ্রলোক একজন অতীত কালের বলিষ্ঠ অভিনেতা। তাঁর নাম সন্তোষ সিনহা বা সন্তোষ সিংহ। অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন সহ তাঁদের আগের যুগের লেজেন্ডারি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস,ছায়া দেবী দের সঙ্গেও।

সন্তোষ সিনহা ছিলেন একজন বর্ষীয়ান অভিনেতা যার যৌবনে অভিনীত ছবি সমুহ ছায়া দেবীর হিট ছবি ‘রিক্তা’ বা উত্তম-সুচিত্রা জুটির ‘সাগরিকা’ বা সুচিত্রা সৌমিত্রর ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন। এছাড়াও সন্তোষ সিনহা মাটির ঘর, শুকতারা, জিঘাংসা, কুহেলিকা, অভয়ের বিয়ে, মহিষাসুর বধ, মর্যাদা, শ্যামলী বহু ছবিতে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেছেন।

কিন্তু এত ছবি করেও একমাত্র সত্যজিতের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর কুমোর হিসেবেই তিনি পরিচিত হয়েছেন।

সেদিন মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তম কুমার ও উত্তম কুমারের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান শিল্পী সংসদ নিয়ে কথা হচ্ছিল দীর্ঘক্ষণ। চারুলতা মাধবী মুখোপাধ্যায় হলেন গল্পের ভান্ডার সব তথ্য ওঁনার কাছে থাকে। শিল্পী সংসদের টাকায় বহু দুঃস্থ শিল্পীর শেষ জীবন চলত। কিছুটা তাঁদের পেনসানের মতো ব্যবস্থা করে এই সংস্থা।

‘অভয়ের বিয়ে’ ছবিতে উত্তম কুমারের সাথে

তো এই সন্তোষ সিনহাও শেষ জীবন খুব কষ্টে কাটিয়েছেন। আসেননি কখনও সংবাদ শিরোনামে। শেষ ভরসা ছিল শিল্পী সংসদ।

মাধবী আন্টি বললেন, ‘সন্তোষ সিনহা, এনার নাম মনে নেই কারো, মনে থাকার কথা যিনি জয় বাবা ফেলুনাথে ঠাকুরের চোখ মুখ আঁকতেন তখন ওঁনার বয়েস হয়ে গেছিল যে লুকটা বিখ্যাত কিন্তু উনি পুরনো দিনের ভালো অভিনেতা ছিলেন যুবক বয়সে।’

সত্যি আজও যে দৃশ্য নতুন প্রজন্মর কাছে পুজো চেনা, পুজোর গন্ধ কিন্তু সেই অভিনেতাকে আমরা চিনিনা। সন্তোষ সিংহ মঞ্চেও সফল। তাঁর প্রবেশ স্টার থিয়েটারে আর ১৯৬৫ সালে বিশ্বরূপায় শেষ মঞ্চাভিনয় করেন।

আর একটা কথা দিয়ে শেষ করি উত্তম কুমারের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশানের গুরু ছিলেন এই সন্তোষ সিনহা। উত্তম কুমার এনার মুখের অভিব্যক্তি বদল থেকে অভিনয়ের পাঠ নিতেন। এবং যিনি এত ধরনের অভিব্যক্তি এত রকমের ভয়েস মডিউলেশান করতে পারেন তাঁকে আমরা সম্মান দিইনি।

উত্তম কুমার সন্তোষ সিংহ সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘সিনেমা-থিয়েটারে বাবা-কাকা চাকর-বাকর ইত্যাদি ছোট ছোট রোল করেন। কিন্তু কী অসম্ভব গুণী লোক। ছাপান্ন রকমের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশান জানেন। ভয়েস মডিলিউশনের ক্ষমতা অসাধারণ। আমাদের দেশ বলে ওঁর এই হাড়ির হাল। অন্য কোনও দেশ হলে ওঁকে মাথায় করে রাখত। একটা ইনস্টিটিউশনের কর্তা করে দিত।… আমি তাঁকে গুরু বলে স্বীকার করি, শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। অথচ তাঁকে এক্সট্রার পর্যায়ে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি ফেলে রাখল।’

তাই শেষ জীবনে সন্তোষ সিনহার শেষ ভরসা উত্তমই হন।

আজ ষষ্ঠীর শুরুতে সন্তোষ সিনহাকে মনে করিয়ে দিলাম। ছোট রোলের অভিনেতারাও প্রিয় হতে পারেন তিনি আদর্শ উদাহরণ। কিন্তু নাম টুকু আমরা মনে রাখিনা, দিইনি প্রাপ্য সম্মান।

আসলে সত্যজিৎ রায়ের ছবি সংরক্ষণ হয়েছে কিন্তু আগের বহু ছবি অন্য পরিচালকদের সংরক্ষণ হয়নি যার ফলে আরো বিস্মৃত হয়ে গেছেন সন্তোষ সিংহ। প্রণাম শ্রদ্ধা এই প্রকৃত শিল্পীকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।