সাঞ্জু: অ্যাকশন, ড্রামা, কমেডি, রোমান্স, সানপেন্স, থ্রিলার… ইত্যাদি

পিকে সিনেমার শেষ দৃশ্যে হঠাৎ রণবীর কাপুরকে দেখে মনে হয়েছিল রণবীর রাজ কুমার হিরানির পরবর্তী সিনেমায় থাকছেন। হোক সেটা পিকে ২ বা অন্য কিছু। যখন খবর পেলাম সেটা ‘সাঞ্জু’ তখন আগ্রহ একটু কমে গেল মনে হল।

খান বা কাপুরদের কারো বায়োপিক হলে মজা হত কিন্তু রাজকুমার হিরানির মুভি বলে কিছুটা দেখার ইচ্ছা ছিল। কারণ, তার মুভি অন্যান্য বায়োপিকের মত ধীরগতির বা বিরক্তিকর হবে না কিছু মালমশলা থাকবে, যেটা কি না সঞ্জয় দত্তের মতো জনপ্রিয় ও ভাল কিন্তু বিতর্কিত অভিনেতা নিয়ে করা ।

সাঞ্জুর প্রতি আগ্রহী হওয়ার কারণ দু’টো। এটা রণবীর কাপুর নাকি সঞ্জয় দত্ত। একই চেহারা, হাঁটা চলা ও কথা বলার স্টাইল, ভয়েজ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সব এক, দ্বিতীয়ত, ট্রেইলার দেখে মনে হল একজন মানুষের জীবনে সিনেমার মত রোমান্স, কমেডি, অ্যাকশন, সাসপেন্স, ইমোশন, টুইস্ট, থ্রিলার সবই একসাথে এত পরিমানে থাকতে পারে কিভাবে! তাও আবার রাজকুমার হিরানি বললেন ট্রেইলারে নাকি কিছুই দেখানো হয়নি, রণবীর কাপুর এর আসল অভিনয় আর সঞ্জয় দত্তের জীবনী কতটা রোমহর্ষক হতে পারে তা নাকি মুভি দেখলেই হারে হারে টের পাওয়া যাবে।

এবার আসি আসল বিষয় ‘সাঞ্জু’ মুভিটা নিয়ে। অনেকেই ভাবছেন বায়োপিক মুভি কাহিনি থাকার কথা না, কিন্তু রাজকুমার হিরানি সঞ্জয় দত্তের ছোট থেকে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে কৈশোর ও যৌবনকাল এবং বর্তমান সময়ে তার বৃদ্ধকালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিপদ, সমস্যা ও তার সমাধান, মজাদার কিংবা দুঃখের রোমহর্ষক ঘটনা, রোমান্স, অ্যাকশন, টুইস্ট, থ্রিলার এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বিশেষ করে বাবার উপর রাগ করে বা মাকে প্রায় হারানোর কষ্টে ড্রাগস নিতে নিতে পার্ট টাইম ড্রাগ অ্যাডিকটেড থেকে ফুল টাইম ড্রাগ অ্যাডিকটেড হয়ে যাওয়া, আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠা থেকে অন্ধকার জগত থেকে আর ফিরে আসতে না পারা, পুলিশের ও সাংবাদিকের কবলে পড়া, প্রেমিকা রুবির চরিত্র করা সোনম কাপুরের সাথে রসায়ন, বাবা সুনিল দত্ত’র চরিত্র করা পরেশ রাওয়ালের সাথে মান অভিমান ভালোবাসা, তারকা বনে যাওয়া, সঞ্জয় দত্তের স্টাইল, দামী ও বিলাসবহুল জীবনের গল্প বলার ভিতরে পরিচালক পুরো ছবির কাহিনী তুলে ধরেছেন।

দেখে মনে হল সাঞ্জু বায়োপিক না সঞ্জয় দত্তের দাস, মুসাফির, শুট আউট, খলনায়ক, লাক, কাটে, ধামাল, মুন্না ভাই সিরিজের মত কোন কাহিনী নির্ভর বা বিনোদনমূলক, নাচ গানে ভরপুর কোন মসালাদার মুভি দেখছি। মুভিতে একবার ও মনে হয়নি রানবির অভিনয় করছে মনে হচ্ছিল এটা সঞ্জয় দত্তের কোন মুভি।

সঞ্জয় দত্তের কৈশোর ও যৌবনকাল আমার মনে হয়নি রণবীরের থেকে ভালভাবে কেউ নিখুঁত অভিনয় করে তুলে ধরতে পারতেন। কারণ সঞ্জয় দত্তের কৈশোর ও যৌবনকালের চাঞ্চল্য, প্রিয় বন্ধুর সাথে ঘোরাঘুরি, দুষ্টামি, হাসি ঠাট্টা, তামাশা, মদ ও ড্রাগ অ্যাডিকশন, প্রেম, বিরহ, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলা এসব কাহিনী বা দৃশ্য রণবীরের রকস্টার, বেশরম, আজব প্রেম কি গাজাব কাহানি, ইয়েহ জাওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি, তামাশা, রকেট সিং, অয়েক আপ সিডেই আমরা দেখতে পেয়েছি তাই রণবীর কাপুর এসব রোলে অভ্যস্ত।

এজন্য শুধুমাত্র সঞ্জয় দত্তের কৈশোর ও যৌবনকাল দেখানোর সময় মনে হল রণবীর কাপুরের কোন মুভি দেখছি। তাছাড়া বাকি মুভির পুরো অংশ জুড়ে রণবীর কাপুর তাঁর মেকাপ গেট আপ দিয়ে তার নিজের স্টাইল এ বুঝিয়েছেন আমরা সঞ্জয় দত্তের কোন মুভি দেখছি। রণবীর যে জাত অভিনেতা সেটা এতেই পরিস্কার। এতদিনে এসে কাপুর পরিবার তাদের ইতিহাসের সেরা অভিনেতাকে গেল।

অভিনেতা রণবীর সে ছাড়া মনে হয় না এই চরিত্রটি আর কেউ এতো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এমনকি সঞ্জয় দত্ত নিজেও পারতেন না সম্ভবত। ঠিক যেভাবে চার্লি চ্যাপলিন সাজার অভিনয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চার্লি চ্যাপলিন নিজেই তৃতীয় হয়েছিলেন।

আণূশকাকে বায়োগ্রাফারের রোলটা ভালো মানিয়েছে। দিয়া মির্জার প্রতি সঞ্জয় দত্তের বা প্রযোজক-পরিচালকের সফট কর্নার আছে কারণ তাদের প্রায় ছবিতে তাকে দেখা যায়। অভিনয়ও বরাবরের মত ভালো ছিল।

আর পরেশ রাওয়াল আমাদের আর দশজন স্নেহপরায়ন বাবা যেমনটি হন তেমনই। একটু রাগী, আদরের সাথে কখনে শাসন করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ দেয়া ছেলেকে – সবই ছিল তাঁর মধ্যে।  বাবার পেপার পড়া ও চা খাওয়ার স্টাইল, ছেলের অনেক মিষ্টি দুষ্টামি না দেখার ভান করা মনে হচ্ছিল তার অভিনয়ের মধ্যে আমাদের সবার বাবার ছায়া লুকিয়ে আছে। যদিও মেকাপম্যান বা পরিচালক পরেশ রাওয়ালের মধ্যে সুনীল দত্তের চেহারা বা মেকাপ গেটাপ ফুটিয়ে তোলার দিকে জোর দেননি।

তবে কিছুদিন আগেই কাম ব্যাক করা মনীষা কৈরালা সঞ্জয় দত্তের বুড়ো, অসুস্থ মায়ের ভূমিকায় ছিলেন। তার অভিনয়, মেকাপে, বার্ধক্যের ছাপ অকৃত্রিমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রমাণ করেছেন শ্রীদেবীর মত তিনি এখনো কিংবদন্তী অভিনেত্রী। সাঞ্জুর বিপদের সময় তার মৃত মায়ের আত্মা এসে গান শুনিয়ে তাকে অনুপ্রাণিত করত এই দৃশ্যটি অনেক চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক।

থ্রি ইডিয়টস, পিকে, মুন্না ভাই সিরিজের মত এ ছবিতে বোমান ইরানী গুরুত্বপূর্ণ রোল পাননি বলে অবাক হলাম। তবে ভিকি কৌশল রাজ কুমার রাও-এর মতই অসাধারণ অভিনেতা । সাঞ্জুর গেঁয়ো বন্ধুর চরিত্রটি অসাধারণভাবে করেছেন। আরশাদ ওয়ার্সি, টাবুর রল ছোট হলেও মজাদার ছিল।

ছবির ব্যাকগ্রাঊণ্ড মিউজিক আগের থ্রি ইডিয়টস, পিকে, মুন্না ভাই সিরিজের মত সেম হলেও এবার কিছু নতুন ব্যাকগ্রাঊণ্ড মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে। আর লিরিক্স ও এ আর রাহমান, রোহান , বিক্রম প্রমুখদের কম্পোজ করা গানগুলোর মধ্যে সঞ্জয় দত্তের লিপসিং নিয়ে একটা ভিন্নধর্মী মজাদার মিউজিক ভিডিও ‘ম্যা বাড়িয়া তু ভি বাড়িয়া’ আর ইমোশনাল মিউজিক ভিডিও ‘কার হার মায়দান ফাতেহ’ লিরিক্স ও গান দুটোর মাধ্যমে ছবিকে আরও ভিন্নধর্মী ও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। অন্যান্য গানগুলিও ভালোই ছিল।

প্রায় প্রতিটি ডায়লগ অনেক শক্তিশালী, মোটিভেশনাল, মিনিঙ্গফুল, ভিন্নধর্মী ও আকর্ষণীয় ছিল। দেশ বিদেশের লোকেশনগুলো ছিল যেমন চমৎকার তেমনি সাঞ্জু বাবার জেল, হাসপাতাল, ড্রাগ নেয়ার ফল, মায়ের মৃত্যু, রাস্তার ভিক্ষার দৃশ্যগুলো ছিল অনেক ভয়ানক। বিশেষ করে জেলের ভিতর টয়লেট থেকে পানি উঠে আসার দৃশ্য সহজে ভুলতে পারব না । আমাদের এগুলো দেখতে ভয় লাগে, রণবীরের অভিনয় করতে ভয় লাগে আর সঞ্জয় দত্তের বাস্তব জীবনে এসব সহ্য করতে না জানি কি করতে হয়েছে।

ছবিতে সঞ্জয় দত্তের জীবনের কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বাদ গেছে। বিশেষ করে তাঁর তিনটি বিয়ে, সংসার – এসব ব্যাপার গুলো আসেনি। তবে, এটাও সত্যি যে, এক সিনেমায় সব অংশকে আনাও কঠিন। যাই হোক, শেষে এসে বলতেই হয় সিনেমাটা হিরানি, রণবীর, প্রযোজক বিধু বিনোদ চোপড়া ও তাঁদের প্রোডাকশন হাউজের দলীয় প্রচেষ্টার ফসল।  অনেক যত্ন নিয়ে, অনেক পরিশ্রমের পরই যে সিনেমাটা মুক্তি পেয়েছে সেটা প্রতিটা দৃশ্য দেখলেই বোঝা যায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।