একটি শক্ত ঝড়ের পূর্বাভাস

যদি আপনার জীবন অবলম্বন করে কেউ সিনেমা বানাতে চায়?

– তাঁকে অবশ্যই হতাশ হতে হবে। আমার জীবনে আসলে তেমন কিছু নেই। কাজ করি, বাসায় ফিরি। আবারো কাজ করি, বাসায় ফিরি। আমার জীবন এই চক্রে আবদ্ধ। এখানে বাড়তি কিছু নেই। কেউ সিনেমা বানালে সেটা খুবই বিরক্তির হবে।

‘সাঞ্জু’র টিজার মুক্তির দিন সংবাদ মাধ্যমে কথাগুলো বলেছিলেন রণবীর কাপুর। নিজের কাজের প্রতি তিনি কতটা নিষ্ঠাবান সেটা বোঝা যাচ্ছে এই ছোট্ট কথাটাতেই। আর রণবীর এত নিষ্ঠাবান বলেই তো বলিউডের খ্যাতনামা কাপুর পরিবার এতদিনে এসে তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে প্রতিভাবান অভিনয় শিল্পীকে খুঁজে পেল।

এত প্রতিভা থাকার পরও অবশ্য শেষ ক’টা বছরে যুৎসই কিছু করতে পারছিলেন না রণবীর। না, নিজের কাজটা তিনি ঠিকই করে যাচ্ছিলেন। শুধু বক্স অফিসকে পাশে পাচ্ছিলেন না। তাই তো রয়, বোম্বে ভেলভেট, তামাশা, অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল এমনকি জাজ্ঞা জাসুসের মত ছবিও ঠিক শীর্ষ পর্যায়ের ছবিগুলোর মত ব্যবসা করতে পারেনি।

রণবীর তো আর থেমে যাওয়ার পাত্র নন। এবার তিনি আক্ষরিক অর্থেই এক ঝড় নিয়ে অপেক্ষায় আছে। এমন এক ঝড়, যার টিজারই কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা উপমহাদেশকে। ঝড়ের নামটা তো আগেই বললাম – ‘সাঞ্জু’ – সঞ্জয় দত্তর বায়োপিক। টিজারেই রণবীর এমন ভেলকি দেখিয়েছেন, ভাবুন তো মূল সিনেমা মুক্তির সময় অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে!

গল্পটা সাঞ্জু বাবা মানে সঞ্জয় দত্তর জীবন নিয়ে। জীবনটা অতিমানবীয় বললেও কম বলা হয়। রণবীর যেমন বলেই দিয়েছেন, ‘এটা আসলে বায়োপিক না। এটা একটা সাইন্স ফিকশন সিনেমা। একটা মানুষের কি করে এতধরণের জীবন যাপন করা সম্ভব আমি ভেবে পাই না।’

সঞ্জয়ের জীবনে উত্থান-পতনের কমতি ছিল না। স্বনামধন্য সুনিল দত্ত ও নার্গিসের ছেলের জীবনে আদরের কোনো কমতি ছিল না। তরুণ বয়সে ড্রাগসে ডুবে ছিলেন। ডাক্তার হাল ছেড়ে দেন, সেই অবস্থা থেকে ‍উঠে এসেছেন। এমন শারীরিক গঠন করেছেন যে বাকি পুরুষদের দেখলে ঈর্ষা হয়, নারীরা দেখলে বুকে কাঁপন ধরে। নব্বই দশকে ছিলেন হার্টথ্রুব, বনেছেন বলিউডের এক নম্বর নায়ক।

মাধুরী দিক্ষিতসহ তিন শতাধিক প্রেমিকা ছিল তাঁর। বিলাসের কমতি ছিল না জীবনে। বিলাসবহুল বিমান ভ্রমণ করেছেন, আবার রাস্তায় একটা বাস টিকেটের জন্য মানুষের কাছে হাত পেতেছেন। প্রাসাদতুল্য হোটেলে থেকেছেন, আবার জেলখানায় থেকেছেন সাধারণ বন্দীদের মত। পুলিশ অফিসারের হাতের মার খেয়েছেন, খেয়েছেন জেল খানার আর ১০ জন বন্দীদের জন্য বানানো স্বাভাবিক খাবারও।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে শোনা যায়। মুম্বাই ব্লাস্টেও তার হাত ছিল বলে অভিযোগ আছে। তাঁর কাছে ছিল একটা একে ফিফটি সিক্স রাইফেল। জীবনের কোনো অলিগলি নেই যেখানে সঞ্জয়ের হাঁটা হয়নি।

সেই সবগুলো পথ পরিচালক রাজকুমার হিরানীর সাথে হেঁটেছেন রণবীরও। অথচ এই রণবীরকেই এক দিন নিজের এক পার্টিতে দাওয়াত করে কত অপমানই না করেছিলেন সঞ্জয়! তখন সবে বিধু বিনোদ চোপড়া ও পরিচালক হিরানী ছবির কাস্টিং ফাইনাল করেছেন। সঞ্জয় তার পর পরই রণবীর, হিরানি, ডেভিড ধাওয়নদের নিজের একটা পার্টিতে ডাকেন।

সেখানে একদম গলা পর্যন্ত মদ পান করার পর স্বাভাবিক ভাবেই ভারসাম্য হারান তিনি। বলা হয়ে থাকে, সেখানে সঞ্জয় সেদিন রণবীরের সিনেমা ‘বারফি’ নিয়ে ব্যঙ্গোক্তি করেছিলেন। রণবীরের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রজন্ম যখন আর থাকবে না, তখন সব হিন্দি ছবির নাম হবে ‘পেঁড়া’, ‘জিলিপি’, বা ‘ইমারতি’। আমি রণবীরের জন্য একটা ছবি প্রযোজনা করতে চাই। নাম দেব ‘লাড্ডু’!’

এখানেই শেষ হলে হত, কিন্তু হয়নি। রণবীরকে সিনেমায় নিয়ে রাজু যে আসলে ভুল করেছেন, সেটাও নাকি সবার সামনেই সঞ্জয় বলে বসেছিলেন, ‘আগে মাচো ছবিতে কাজ করার প্রশিক্ষণ নিতে হতো আমার কাছ থেকে, না হলে তো আমি বলে মানাবেই না!’

সেদিন টু শব্দটি করেননি রণবীর। নিজের কাজের প্রতি, পরিশ্রমের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। ১৬ কেজি ওজন বাড়িয়েছেন। কোন বয়সে সঞ্জয়ের চলার ধরণ, তাঁর পোশাক-আশাক সব অনুকরণ করেছেন। পেশীবহুল শরীর গড়েছেন, একদম সঞ্জয়ের অনুকরণে। চেহারায় এনেছেন ভারিক্কি। পাল্টে ফেলেছেন চোখের চাহনীও।

সেজন্যই তো দর্শকরা এবার শখ করে ঝড়ের মুখে পড়ার অপেক্ষা আছেন। টিজারের শেষে যেমন তাই সঞ্জয় রূপি রণবীর বলেই দিয়েছেন, ‘দেবিও ওউর সাঞ্জোনো, সিট বেল্ট বেঁধে বসেন, আবহাওয়া খারাপ হতে যাচ্ছে…’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।