তারকাদের সব সময় হাসতে হয়: সালমান খান

সালমান খানের পুরোটা জগৎই আলোকিত। যদি কখনো তাঁর সাথে আপনার দেখা করার সুযোগ হয়, মনে হবে আপনি এক রোলার কোস্টার রাইডে আছেন। ঠিক তাঁর সিনেমার মতই, যেমনটা তাঁর সিনেমা হলে এলে লোকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তেমনি তাঁকে সামনে পেলে আপনার হিয়াও ধড়ফড় করতে বাধ্য।

সালমান খানের সিনেমা লোকে কেন দেখে? দুর্দান্ত সেটের জন্য? অসাধারণ গল্পের জন্য? ভাল স্ক্রিন-প্লে’র জন্য? সালমানের সহ অভিনয়শিল্পীদের জন্য? – এই সব ছাপিয়ে সত্য একটাই, সালমান খানের সিনেমা হিট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল, ওটা সালমান খানের সিনেমা। তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন, একের পর এক মোক্ষম ডায়লোগ দিবেন, দর্শক সিটি মারবে, তালি বাজাবে – এই তো হয়ে যুগের পর যুগ।

সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ফিল্মফেয়ার-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন সালমান খান। সেটাও সালমানের কোনো ধুন্ধুমার সিনেমার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।

৫০-বছর পেড়িয়ে গেলেও সালমান ব্র্যান্ডটা টিকিয়ে রাখা কতটা কঠিন?

– আমি জানি না, আপনাকে কি জবাব দিবো। আমি এসব নিয়ে ভাবি না। দাদা কিংবা নাতি – সবাইকে আমি বিনোদন দিতে পারি। আমি পারিবারিক সিনেমা করি। অনেক কিছু ফ্যাক্টর আছে, যা আমাকে এতদূর টেনে এনেছে। অবশ্যই সবার আগে আমার পরিবার। কিংবা ধরেন, আমি যে ছেলেবেলার বন্ধুদের সাথে সময় কাটাই সেটাই কাজে সাহায্য করে। আমি সব সময় নিজের চেয়ে বয়স্কদের সাথে বন্ধুত্ব করি। কারণ, ওদের থেকে অনেক কিছু শেখা যায়।

যেমন?

– প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পেরেছিলাম কৈলাশ সুরেন্দ্রনাথ (অ্যাড-ফিল্মমেকার) ও তাঁর স্ত্রী আরতীর জন্য। এরপর থেকে ওদের প্রতি আমার ঋণের শেষ নেই। আমি যখন আমার প্রথম অ্যাড করি, তখন আমার বয়স মাত্র ১৬। কৈলাশ সাহেব তখন বয়সে ও প্রজ্ঞায় আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। তখন ওর কথা আমি মন দিয়ে শুনতাম, সাহায্যের জন্য ওর চারপাশে ঘুরতাম। আর আমার বাবার (সেলিম খান) কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে সততার সাথে জীবন কাটাতে হয়।

সিনেমা মুক্তির আগে আপনার নার্ভাস লাগে এখনও?

– তা তো লাগেই। প্রথমত একটা ছবির পিছনে প্রাণপণ খাটার পর সেটা যদি না চলে, তখন নিজের বিশ্বাসটাই নড়ে যায়। আর পর পর দু’তিনটে ছবি যদি ফ্লপ করে তখন অভিনেতার যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো হয়ই, ছবির সঙ্গে যুক্ত বাকি মানুষগুলোও বিপদে পড়েন। সবচেয়ে কষ্টের কী জানেন? ভক্তেরা যখন টিকিট কেটে ছবি দেখে সন্তুষ্ট হন না। তাঁদের এই ভাল না লাগাটা নেওয়া যায় না।

অনলাইনের যুগে দর্শককে হলে টেনে আনা কতটা শক্ত?

– ছবির পোস্টার বা প্রোমোগুলো তো সে জন্যই কাজে লাগে! একবার ছবি দেখতে গেলে পোস্টার দেখে বা ছবির আগে যে প্রোমো চালানো হয়, সেগুলো দেখে দর্শক জেনে যান পরে কী ছবি আসছে। আগে তো আমরা ছবির কোনও প্রচার করতামই না! স্রেফ অল ইন্ডিয়া রেডিওয় সাক্ষাৎকার দিতাম। পোস্টার আর ট্রেলারের জোরেই ছবি ৩০০-৪০০ দিন চলত। কখনও বছরের পর বছর ধরেও! আর এখন দেখুন এত চ্যানেল, এত প্রোমোশন, তাও ছয় সপ্তাহের বেশি ছবি চলে না!

সালমান খান ব্র্যান্ডের দায়িত্ব কতটুকু?

– দায়িত্ব হল নিজের নামের ভারিক্কিটা বজায় রাখা। এটা শুধু কেবল নিজের জন্য নয়, নিজের ভক্তদের জন্য, নিজের পরিবার, এই ইন্ডাস্ট্রি ও নিজের দেশের দেশের। এখানে কোনো ছাড় দেয়া যায় না। ঠিক কথা বললেও অনেক সময় ভুল বোঝার সম্ভাবনা আছে। ফলে, সতর্ক থাকাটা খুব জরুরী। এখানে খানিকটা রাজনীতিও দরকার, যেটা আমি পারি না। এই দেশে সাংবাদিকরা যা খুশি তাই লিখতে পারেন, রাজনীতিবিদরা যা ইচ্ছা তাই বলতে পারেন।

সুপারস্টার হওয়ার চ্যালেঞ্জ কী?

– সুপারস্টার আবার কী? আপনি তো শাহরুখ খানের কথা বলছেন! অভিনয়টা আমার কাজ। ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নিয়ে ফেললে তো মাথায় চড়ে বসবে!

এতদূর আসার জন্য কি কি ত্যাগ স্বীকার করেছেন?

– আমিই খুবই ভাগ্যবান যে আমার কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। আমি কাজ করেছি, কাজকে উপভোগ করেছি। কাজের সাথে নিজের আনন্দকে মেলাতে চাননা অনেক। কিন্তু, আমি এখানে আছি, আনন্দের জন্য। এবং এর মধ্যেও আমি পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো মেলা সময় পাই। আমার সহকর্মীদের সাথেও আমি সময় কাটাই।  একটা ব্যাপার আমি সব সময় নিশ্চিত করার চেষ্টা করি যে, যখন আমরা কাজের মধ্যে থাকবো তখন যেন বন্ধু হয়ে যাই। কাজের মধ্যে হ্যাপি মসলা থাকা জরুরী।

সাম্প্রতিক সময়ে আপনাকে শারীরিক ভাবে কিছু বাজে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে…

– এখন আমি শতভাগ ঠিক আছি। শরীর ঠিক আছে। তবে, এটা হওয়ারই ছিল। কারণ এত অ্যাকশন, নাচ, ব্যায়ামের মধ্যে থাকার কারণে শরীরের ওপর অনেক চাপ নিতে হয় আমাদের।

‘বাজরাঙ্গি ভাইজান’ আর ‘সুলতান’এর পরে আপনি নাকি সিরিয়াস অভিনেতা হয়ে উঠেছেন?

– একটু বেছে কাজ করছি। ‘বজরঙ্গি ভাইজান’এ যেমন স্ক্রিনপ্লেটা এতই জোরদার ছিল যে আমায় কোনও কাজ করতেই হয়নি, হর্ষালিকে নিয়ে হাঁটা ছাড়া! ‘টিউবলাইট’এ ব্যাপারটা একটু কঠিন। দুই ভাইয়ের গল্প, ইমোশনালি একটু ডিফিকাল্ট। ‘সুলতান’এর সময় কষ্টটা ছিল শারীরিক। এখনও উঠে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুতে, গোড়ালিতে ব্যথা হয়, জানেন! তার পরেও বোকার মতো ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ সাইন করে বসেছিলাম।

আপনি জীবনে খ্যাতিও দেখেছেন, বদনাম হওয়াও দেখেছেন। জীবনের এই দুটো চূড়ান্ত অধ্যায় আপনাকে কি শিক্ষা দিয়েছে?

– আমি শিখেছি, জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী হয়। যখন আপনি চূড়ায় আছেন, তখনও আপনাকে লড়কেই হবে। কোনো দুর্ভাগা ঘটনার উদয় যেন না হয়, সেই চেষ্টা কতে হবে। আর শুধু আমার না, সকল অভিনেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, ব্যক্তিগত জীবনে যত সমস্যাই হোক না কেন, আপনাকে সিনেমার প্রচারণায় থাকতে হবে, হিরোইনদের সাথে রোম্যান্স করতে হবে।  আর যদি টিভিতে আসেন, আপনাকে হাসতে হবে, মজা করতে হবে।

এই অবস্থাতেও অনেকে আবার ভাববে, আরে এর তো যাই হোক কোনো সমস্যা হয় না। যারা এসব বলে, তাঁরা আমাদের কাজটাই বোঝে না। এখানে আপনার মনের ওপর যাই চলুক না কেন, সব সময় আপনাকে হাসতে জানতে হবে।  যখন আরবাজ (খান) আইপিএল বেটিং মামলায় ভুগছে তখনও আমাকে রেস ৩’র প্রেস কনফারেন্স করতে হয়।

এই কয় বছরে আপনার জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কি?

– প্রতিটা দিন আমাকে একটু একটু করে বড় করছে। আমি জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করি, আর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করি।

কোনো ভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়?

– না, আমি বাকিদের মতই। আমিও বাকি সবার মতই ভালবাসা চাই।

কোনো আক্ষেপ আছে?

– না, তেমন কিছু নেই। তবে, একটা ঘটনা শেয়ার করি, আগে কাউকে বলিনি। তখন আমি সেইন্ট অ্যানির স্কুলে পড়ি। একটা ছেলের সাথে দৌঁড়াচ্ছিলাম। একজন আরেকজনকে হারাতে চেষ্টা করছিলাম। আমি ওকে হারালাম। কিন্তু, ও আমার সামনে পড়ে গিয়ে দুই দাঁত ভেঙে ফেলে। সেই ঘটনা এখনো আমার মাথায় গেঁথে আছে, কারণ আমিই ওকে ধাক্কা মারি। যদিও, ওটা ছিল স্রেফ খেলা।

দু’বছর বাদে আমি ও আরবাজ একইরকম খেলা খেলছিলাম। এবার ও আমার দাঁত ভেঙে দেয়। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর।

ক্যারিয়ারের এই অবস্থায় কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান আপনি?

– সবাইকে আনন্দিত দেখার মাঝেই আমার আনন্দ। যখন সিনেমা ভাল চলে, দর্শক হলে যায়, তালি দেয়, প্রশংসা করে… তখন তাতে পয়সার অপচয় হয় না, আমি আনন্দিত হই। যখন দেখি দাস কা দাম ভাল ফিডব্যাক পাচ্ছে, আনন্দিত হই। যখন সবাই ভাল থাকে, সবার শরীর ভাল থাকে, তখন কে না ভাল থাকে। আপনার ভালবাসার মানুষই তো পারেন আপনাকে সুখে রাখতে।

এক্স গার্লফ্রেন্ডদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক কী করে বজায় রাখেন বলুন তো?

– পরে বোধহয় ওরা সকলেই বুঝতে পেরেছে যে আমি ততটাও খারাপ নই! হা হা হা! বন্ধু হিসেবে আমি খুব ভাল। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড হিসেবে বোধহয় ভাল না।

 

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।