‘নির্মাতা মানেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হবে’

বাংলাদেশে নারী নির্মাতাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি না। তবে, এই আধুনিক সময়ে এসে নারীরাও শুধুমাত্র ক্যামেরার সামনে নিজের যোগ্যতা বা প্রতিভার ঝলক দেখাতে চান এমনটা নয়, অনেক নারীই আছেন যারা ক্যামেরার পেছনে বসেও নিজেদের মেধা বা যোগ্যতা দিয়ে তাক লাগিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন।

যদিও, দুঃখজনক হলেও সত্যি তাদের সেই দক্ষতা বা কাজের প্রতি ডেডিকেশন দেখানোর স্কোপ খুব একটা মেলেনা এই দেশে। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই থেমে যাবার পাত্রী নন, তেমনই এক নাম সাকী ফারজানা। সাকী ফারজানা নামটা অনেকের কাছেই একটু বা অনেকের কাছেই অনেকটা অপরিচিত লাগবে।

অবশ্য, মিডিয়ার খোজ-খবর যারা একটু আকটু রাখেন তাদের কাছে নামটি বেশ পরিচিত। ইতোমধ্যে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ছোটগল্প অবলম্বনে ‘ছেলেমানুষী’ এবং ‘The Park The Bench & The Girl’ নামক দুটি শর্টফিল্ম বানিয়ে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ভয়েজ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন টেলিভিশন চ্যানেলেও।

চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা, নারী নির্মাতা হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা, সংসার এবং সন্তান সামলে মিডিয়াতে কাজ করার ঝক্কি সামলানো, পরবর্তী কাজের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরস্কৃত হওয়ার অনুভূতি সহ আরো অনেক বিষয় নিয়ে অলিগলি.কম আলাপচারিতায় মুখোমুখি হয়েছেন অদম্য এই নারী।

ঠিক কবে মনে হলো পরিচালক হিসেবে কাজ করতে চান?

খুবই কঠিন প্রশ্ন, কারন ব্যাপারটা কখনোই হুট করে মনে হলো একদিন টাইপ নয়। আমার পড়াশুনা কিন্তু নাট্যকলাতে, ফিল্ম মেকিং আমার কোর্সের একটা পার্ট ছিল, অনার্সে। মাস্টার্সে অবশ্য আমি এ্যকটিং নিয়েছিলাম, নির্মাতা হতে ভয় পেতাম। অনেক রেস্পন্সিবিলিটি থাকে একজন নির্মাতার, অনেক ম্যাচিওরিটি ডিমান্ড করে, আমার ভয় হতো পারবো না। তবে মনের ভেতর একটা বিষয় পুষে রেখেছিলাম, একদিন আমিও সিনেমা বানাবো।

পড়াশোনা শেষে আমি অভিনেতা হবারই চেষ্টা করেছিলাম, অনেকটা বছর, শুধু আমি নিজেকে অভিনয়ে স্পন্টিনিউয়াস মনে করেতাম বলে। মাথাতেই আসে নি, যে হিউজ রেস্পন্সিবিলিটি বলে আমি যে পথে পা-ই বাড়াই নি, সেই পথটা একটু কষ্টসাধ্য বটে, কিন্তু নিজের কথাগুলো, নিজের ভাবনাগুলোর প্রকাশ সেখানেই হয়।অভিনেতা নির্মাতার ভাবনা প্রকাশের একটা উপাদান মাত্র। অভিনেতার চরিত্র নির্মানের ভাবনাটাও বেসিক্যালি নির্মাতারই ভাবনা। এই পার্সপেক্টিভটাই আমাকে নির্মাতা হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমি অন্য কারও ভাবনার রিফ্লেকশন হতে চাই না। এই ভাবনা যেদিন থেকে জোড়ালো হয়েছে, সেদিন থেকেই আমি অভিনেতা নয়, নির্মাতা হতে চেয়েছি। এখন সেই পথে হাঁটছি, একদিন ঠিক হয়ে যাব।

ছেলেমানুষী

পুরুষতান্ত্রিক এই ইন্ডাস্ট্রিতে নারী নির্মাতার সংখ্যা হাতে গোনা। নিশ্চয়ই রিস্ক বা কিছুটা অনিশ্চিত অবস্থা ছিল, তবুও কিভাবে এগিয়ে আসলেন?

রিস্ক এখন নেই একথাই বা বলি কি করে? এখনো আমি অনিশ্চিত পথেই হাঁটছি। আর ইন্ডাস্ট্রির কথা আমি বলতে পারব না এখনই। আমি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকিনি এখনো। এখন পর্যন্ত মোটে দুইটা শর্টফিল্ম বানিয়েছি, কাওকেই বলতে গেলে তেমন চিনতে হয় নি। হাজবেন্ড পাশে থেকেছে, নিজেদের সেভিংস ভাঙিয়ে সিনেমা বানিয়েছি। তবে হ্যাঁ, দেশে নারী ফিল্মমেকার কম এটা সত্যি। এই দোষ কি ইন্ডাস্ট্রির পুরো? আমাদের পরিবার বা সমাজের কি কোন দায় নেই? ইন্ডাস্ট্রিতে নারী নির্মাতা কেন পুরুষ নির্মাতারাও তো নাজুক অবস্থায় আছে। এখানে একজন নির্মাতা মানেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হবে।

একজন নারী নিজের সংসার, পরিবার, সমাজের জন্য দায়িত্ব পালন করতেই হিমশিম অবস্থায় থাকে। আর এসব ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ইন্সপিরেশন কই পাবে বলুন? এখন পর্যন্ত আমি কাজের জায়গায় নারী নির্মাতা হিসেবে সেভাবে চ্যালেঞ্জ ফিল করি নি। আসলে লাইফের অনেকটা সময় পার করে বেশ দেরিতে নিজের ক্যারিয়ার শুরুটা আমার নিজের কাছেই বিশাল চ্যালেঞ্জ, এই চ্যালেঞ্জ আমি এত বেশি মগ্ন থাকি যে, আলাদা করে আমার নারী নির্মাতা হিসেবে রিস্কগুলো বদার করে না। নারী হিসেবে সমাজে ডিগনিটি নিয়ে টিকে থাকার জন্য লড়াই, এটা পার্ট অফ লাইফ হয়ে গেছে। আমি ইউজ টু এতে।

পরিবার, সন্তান সামলে এই মাধ্যমে কাজ করাটা কতটা কঠিন?

সামলে না বলে বরং বলি, আমার পরিবার সন্তান আমাকে সাপোর্ট করে বলেই আমি এই মাধ্যমে কাজ করতে পারছি।আমি কখনো আমার বাবা-মাকে আমার পাশে পাইনি ইন্সপিরেশন হয়ে, কোনদিন সাহস করে অনিশ্চিত পথে পা বাড়াতেই পারি নি। অভিনেতা হবার যখন চেষ্টা করেছিলাম, তখনো একটা মান্থলি ইনকামের বন্দোবস্ত করে রেখে তারপর ট্রায় করতে হয়েছে।কিন্তু ফিল্ম বানানো তো এভাবে হয় না। তাই পড়াশুনা শেষ করার দশ বছর পরে আমি এই কাজে এলাম।এর মাঝে আমি বিয়ে করেছি, আমার বেবি আছে।

আমি যখন সিনেমা নিয়ে থাকি, আমার নিয়মিত উপার্জন হলো কি না, আমার বাসায় কি রান্না হবে, ছেলের স্কুলের প্যারেন্ট মিটিং এ, বা ছেলেকে প্যারেন্ট হিসেবে সময় দেয়া নিয়ে আমার মাথা ঘামাতে হয় না, অর্থাৎ আমি সাংসারিক চাপমুক্ত থাকি, আমার হাজবেন্ডই সব সামলান।এখন আর আমি একা নই, আমার মা-বাবা, পরিবার, আমার শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে সাপোর্ট করেন, এই অনিশ্চিত পথে হাঁটতে।আমি জানি, আমার চলার পথটা মসৃন নয়, আমি বারবার পড়ে যাই, আহত হই, কিন্তু হতাশ হই না।মানুষের মনের এক অদ্ধুত ধরনের শক্তি আছে।

মন থেকে কিছু করতে চাইলে অবশ্যই সম্ভব, দেরীতে হলেও সম্ভব। একবার ছাত্রাবস্থায় আমি আমার এক সহপাঠী বন্ধুকে বলেছিলাম, ‘তুই যখন কোন কাজের ডাক পাস, তুই কাজটা নিয়ে ভাবিস, কাজটা কত ভালোভাবে করবি তার প্রস্তুতি নিস। আর আমি কোন কাজের ডাক পেলে ফ্যামিলি কি করে ম্যানেজ করবো, তাদের রাজি করাতে নতুন কি কৌশল অবলম্বন করা যায়, তাই নিয়ে ভাবি। অনেক চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে যখন লাস্টলি ফ্যামিলি কনভিন্সড, তখন দেখি হয় ট্রেন ছুটে গেছে, নয়তো ছাড়বে ছাড়বে করছে। হয়তো প্যাশনেটলি কাজ করা হয়তো একদিন ভুলেই যাব ।’ আমি এখন শুধু কাজ নিয়েই ভাবতে পারি, কাজের সময় অন্য কিছু নিয়ে আমায় ভাবতে হয় না। এটাই আমার পরম পাওয়া।

কিছুদিন আগে ‘ছেলেমানুষী’ চলচ্চিত্রের জন্য দেশের বাইরে থেকে পুরস্কৃত হলেন, সেই সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করবেন?

– হ্যা, গত ডিসেম্বরে পুনে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট উইমেন ডিরেক্টর হিসেবে পুরস্কার পেয়েছি, স্বীকৃতি পেয়েছি।এই প্রাপ্তিটা আমার কল্পনার অতীত ছিল।এছাড়াও ছেলেমানুষী দেশের ত্রিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিস বিভাগ থেকে বেস্ট ফিল্ম এবং বেস্ট সাউন্ড এন্ড মিউজিকে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ছেলেমানুষী ফিল্ম নিয়ে আমার মাঝে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। ছেলেমানুষী আমার এক লড়াই, নিজের সাথে নিজের লড়াই।এই ফিল্ম করার আগের তিন বছর আমি ২৪/৭ একজন মা, শুধুই মা। তারও আগে আমি একজন ফেইলর এ্যাকটর। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এই পৃথিবীতে শুধু শুধু জন্ম নেয়া, গুড ফর নাথিং মানুষদের মধ্যে আমি একজন।

আমি লিটারেলি হারিয়েই গিয়েছিলাম, আমার কাছের সব বন্ধুরা জমিয়ে কাজ করছে, এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমি বাচ্চার ন্যাপি পরিস্কার করছি দিন-রাত। সেই সময় আমার খুব কাছের এক শিক্ষক আমার দেখার চোখটা বদলিয়েছিলেন- আমার বাচ্চাটাকে আমার নিজের ইচ্ছেতেই আমি পৃথিবীতে এনেছি, তাকে ঠিকঠাক মানুষ করাও আমারই দায়িত্ব, সেই মূহুর্তে আমার একমাত্র কাজই হলো, আমার বাচ্চাটাকে আমার মতো করে মানুষ করা, যেভাবে আমি পৃথিবীর মানুষকে দেখতে চাই, ওভাবে আমি ছাড়া আর কে পারবে? এরপর আসলেই মায়ের কাচটা আমি খুব মন দিয়েই করেছি। এরপর ছেলে একটু বড় হলো, কাজের জন্য মনটা আকুপাকু করতে লাগলো। আমার পুরোনো কাজ এবিসি রেডিওতে আবারও যুক্ত হলাম। এরপর ইচ্ছে হলো, একটু স্ক্রিপ্ট লিখি। ছেলেমানুষীর শুরুও এভাবেই।

স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে ডিরেকটর হয়ে গেলাম বলা চলে। সে কি নার্ভাসনেস ছিল আমার! শুধু মনে হতো পারব তো! দুইটা মানুষ সে সময় আমার পেছনে তখন জোঁকের মতো লেগেছিল, এক আমার হাজবেন্ড আর দুই কিশোর মাহমুদ, এই ফিল্মের সিনেমাটোগ্রাফার। ছেলেমানুষীতে কোন প্রফেশনাল এ্যাকটর নেই, রাজশাহীর থিয়েটার কর্মী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা, আমার কাছের শিক্ষকরা, বন্ধুরা সবাই মিলে ছেলেমানুষীকে নিজের করে নিয়ে গাধা খাটনি খেটেছে। আমি ছেলেমানুষী করতে গিয়েই বুঝলাম, আমি সবার কাছ থেকে সরে থাকলেও আজও আমাকে অনেক মানুষ ভালোবাসে, আগের মতোই।ছেলেমানুষীর একটা দৃশ্যে হিন্দু বনেদী বাড়ির ভাতের থালার জন্য ল্যাডলী দা’র মা ১৩ পদ রান্না করেছিলেন। আমি সেদিন ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম।

ছেলেমানুষী একই সাথে আমাকে ম্যাচিওর করেছে। শ্যুটিং এর পর থেকে ফাইনালি ফিল্মটা হাতে পাওয়া পর্যন্ত এত এত বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে, আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এই ফিল্ম আর কোনদিন বেরুবে না। আমাকে কানের কাছে বার বার শুনতে হয়েছে, আমি নতুন ডিরেক্টর, মিডিয়ার হালচাল বুঝি না। প্রথম কাজেই আমার তিক্ততা আমার অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে, ভালোবাসাগুলো আমায় প্রেরণা দেয় নতুন কিছু সৃষ্টির।আমি মনে করি এগুলো আমার পুরস্কার, আর দেশের বাইরে বা দেশে যেটা পেয়েছি, সেটা স্বীকৃতি।

 

আই স্ট্যান্ড ফর উইমেন মুভমেন্টের জন্য আপনার বানানো ফিল্মটি বেশ আলোচিত হয়েছিল। সেই ফিল্মের আলোকেই আপনার দৃষ্টিতে সমাজে নারীর অবস্থানটা কেমন?

আলোচিত হয়েছিল কি? আমি কিন্তু টের পাই নি। আমার কিছু পরিচিত নির্মাতা, বন্ধু, কাছের ছোট ভাই বোনেরা প্রসংশা করেছে, তবে সকলের প্রসংশা মিলিয়ে আমার মনে হয় সেটা বিষয় বস্তুর জন্য জন্য নয়, বিষয়বস্তুর প্রেজেন্টেশনের জন্য। এই ফিল্মটি আমার জন্য মেয়েদের সাথে ঘটে যাওয়া সকল অযাচিত দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিবাদ ছিল। আমি নিজেও একজন নারী, আমি নিজেও এই সমাজে বিদ্যমান ভায়োলেন্সের শিকার। আমি সাড়ে চার বছর বয়সে প্রথম ফিজিক্যালি অ্যাবিউজের শিকার হই। দেশের ৯৯% মেয়েদের জীবনেই এটা এক কমন ঘটনা।

শুধু নারী নয়, পুরুষরাও অনেক সময়ই ছোটবেলায় এ্যাবিউজের শিকার হয়। আমার হাজবেন্ডের কাছেই শুনেছি, সেও খুব ছোটবেলায় এ্যাবিউজের শিকার হয়েছিল, কিন্তু সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাকে কিন্তু কুঁড়ে কুঁড়ে খায় না।সে বলতে পারে এটা ছোবেলার ঘটনা।যেদিন থেকে তার পার্সোনালিটি তৈরি হয়েছে, তখন থেকে তাকে এ্যাবিউজ এর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নি। কিন্তু মেয়েদের বেলায় কি ঘটে?হাতের দাগে গুনেও শেষ করা যাবেনা অ্যাবিউজের ঘটনা কতগুলো?ভোলার কোন অবকাশই নেই। পরিবার, সমাজ, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র সব জায়গা ফুল অফ ইরিটেশন।

নারীর ইরিটেশনকে কতটুকু ফিল করে আমাদের চারপাশ!তাই একটু ফিল করাতে চেয়েছি এই ফিল্মে এবং মনে হয়,আমি কিছুটা পেরেছি। বেশ কিছু মানুষ আমাকে এই ফিল্মের একটা সিনকে বাড়াবাড়ি বলেছেন, আবার কেউ এই একই সিনের কারণে ‘কেউ তো অন্তত সাহস করে বললো’ বলে সাধুবাদও জানিয়েছেন।

The Park The Bench & The Girl

চীনের একটি ফেস্টিভ্যালে অংশ নিলেন, সেটির অভিজ্ঞতা কেমন?

সরাসরি চীনে নয়, চীনের একটি ছোট্ট প্রদেশ বলা চলে, ম্যাকাওতে। আমি এর আগে কখনো সরাসরি দেশের বাইরের কোন ফেস্টিভ্যালে অংশ নিইনি। বিভিন্ন দেশের মানুষের ফিল্ম নিয়ে ভাবনা, তাঁদের সাথে আলোচনারও সুযোগ হয় নি।এই অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক ঋদ্ধ করেছে। কিছু কিছু ফিল্ম দেখে আমি চরম বিমোহিত হয়েছি। বেশ কিছু ক্লিশে কাজও চোখে পড়েছে। তবে একটা বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে, বিভিন্ন কারনেই বাইরের কাজগুলো টেকনিক্যালি অনেক সাউন্ড, তবে প্রসংশা পায় সেসব কাজই, যেগুলোর গল্প আলাদা রকম কিংবা গল্পের প্রেজেন্টেশন আলাদা রকম। একটু ডিফারেন্ট গল্প ডিফারেন্ট ওয়েতে বলা আর কি।সেই জায়গা থেকে বলতে পারি, আমরা তো টেকনিক্যাল বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিই, ততটা গুরুত্ব আমরা সবসময় গল্পতে দিই না। অথচ আমরা একটু দৃষ্টিভঙ্গীটা বদলালেই আমাদের অভাব এ্যাসেট হয়ে যেতে পারে। ইরানী চলচ্চিত্র আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।

আমাদের সিনেমার বর্তমান অবস্থাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

দেখুন আমি খুবই ক্ষুদ্র একজন মানুষ, আর নির্মাতা হিসেবেও আমি একেবারেই নতুন।রাষ্ট্র ব্যবস্থার মতোই প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, অব্যপস্থাপনা। সিনেমার জায়গাটি আরও অনেক বেশি অবহেলিত বলা চলে। সুনির্দিষ্ঠ কোন নীতিমালা নেই, কোন রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা নেই, প্রতি বছর সরকারী অনুদানে সিনেমা বাবদ একটা খাত বরাদ্দ আছে বটে, তবে সেখানে যাওয়ার সাধ্য সবার নেই। আমি শর্টফিল্মের জায়গা থেকেই বলছি, বড় ফিল্ম নিয়ে কথা বলা আমার ঠিক হবে না।আমি ঐ পর্যায়ে এখনো যাইনি। শর্টফিল্মের কোন বাজার নেই।

এখন অবশ্য ওয়েবে শর্টফিল্মের একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। তবে সেখানে নতুন কেউ ভালো কনটেন্ট নিয়ে গেলেই যে সুযোগ পাবে কাজের এমন নয়। এই জায়গাটাও অনেকটাই টিভি মিডিয়ায় রেগুলার কাজ করা নির্মাতা এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের দখলে। আমি বা আমার মতো স্বাধীনভাবে কাজ করা নির্মাতাদের জায়গা করে নেয়া খুবই কষ্টসাধ্য। আরেকটা বিষয়, আমাদের কাজে মে বি প্রফেশনালিজমের বেশ ঘাটতি আছে, কাজ হচ্ছে, তবে প্রফেশনাল ওয়েতে নয়। অভিনেতা, নির্মাতা সবক্ষেত্রেই স্টারডমের প্র্যাকটিস মারাত্মকভাবে। এটা সিনেমার জন্য সুফল বয়ে নাও আনতে পারে।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এই মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে কাজ করার জন্য সবার আল্টিমেট গোল থাকে ফুল লেন্থ সিনেমা বানানোর, আপনাকে কবে দেখা যাবে বড় পর্দায় ‘ক্যাপটেন অব দ্য শিপ’-এর দায়িত্ব পালন করতে?

গোল তো আছেই, সিনেমার দৈর্ঘ্য কখনো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।ছোট সিনেমায় কম দর্শক, বড় সিনেমায় অনেক দর্শক এটাই পার্থক্য।অনেক অনেক মানুষ আমার সিনেমা দেখবে, কথা বলবে এটা সব নির্মাতাই চায়। আমি সবচেয়ে গুরুত্ব দিই নিজের ভালোলাগাকে। আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।আমার কাছে সিনেমার জন্ম দেবার প্রক্রিয়াটা অনেক আনন্দের।

যেদিন মনে হবে ছোট সিনেমায় আনন্দটা আর সেভাবে পাচ্ছি না, তখন বড় পরিসবে ভাববো। ঠিক জানি না, সেটা কবে হবে।এখন পর্যন্ত আমি কূয়ার ব্যাঙ, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটা ভালো করে বুঝি আগে।এখন পর্যন্ত শুধু ফিল্মটা বুঝছি, এরপর বুঝবো ফিল্ম বিজনেসটা। আমি একদমই সেই পথে হাঁটতে চাই না, যেখানে আমাকে অনেক কষ্টে সৃষ্টে একটা সিনেমা বানিয়ে হাত মুছে বসে থাকতে হয়।আমি সিনেমার জন্ম দিতে চাই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। এটাই আমার গোল।

বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

এমন প্রশ্ন করছেন যেন আমি কত ব্যস্ত মানুষ।দুটো গল্প নিয়ে ভাবছি।আপাতত এটা ডিসাইডেড নিজের পয়সায় এই মূহুর্তে আর কাজ করতে পারছি না। একটু বানিজ্যিক ভাবে কাজ করতে চাই। কিভাবে করতে পারবো এখনো শিওর না।আমি নিজেও অপেক্ষা করছি, কাজেই আপনাদেরকেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।