মাত্র ৩৫০০ টাকায় সাজেক ভ্রমণের ‘অবিশ্বাস্য’ গল্প!

  • যা যা ঘুরলাম

সাজেক, কংলাক পাহাড়, রুইলুই পাড়া, হাজাছড়া ঝর্না, রিসাং ঝর্না, আলুটিলা গুহা, আলুটিলা তারেং, ঝুলন্ত ব্রিজ, বৌদ্ধ বিহার ইত্যাদি।

এবার মূল ট্যুরের বর্ণনায় আসি।

৩১ আগস্ট, ২০১৮ রাত আটটা।

কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড আমরা চার বন্ধু।সৌদিয়া কাউন্টার থেকে ৫৮০ টাকা করে চারটা টিকেট কাটলাম ঢাকা টু দীঘিনালা। সৌদিয়া আর শান্তি এই দুইটা বাস ডিরেক্ট দীঘিনালা পর্যন্ত যায়। সাড়ে ১০টায় বাস আসবে। তাই ভাবলাম এবার, ডিনার করে ফেলা যাক। পাশেই একটা হোটেলে গেলাম। জনপ্রতি খাবারের বিল আসলো ৮০ টাকা। এরপর উপরওয়ালার নাম নিয়ে উঠে গেলাম সাড়ে ১০টার বাসে।

এক সেপ্টেম্বর, ভোর ছয়টা। শুভ সকাল খাগড়াছড়ি।

আমরা দীঘিনালা নামলাম। খাগড়াছড়ি থেকে ২১ কিলোমিটার পর দীঘিনালা। খাগড়াছড়ি থেকে এখানে নেমে চাদের গাড়ি বা সিএনডিজ রির্জাভ করলে ১-১.৫ হাজার টাকা কমে পাওয়া যায়। এখানে আমার পরিচিত তিনজন ভাই আছে। সুমন ভাই, অপু ভাই, দেলোয়ার ভাই। সো সুমন আর অপু ভাইয়ের জন্য একটু দাড়ালাম, তারপর তারা আসলো। তাদের নিয়ে সকালের নাস্তা করলাম একসাথে। জনপ্রতি ৪০ টাকা।

অপু ভাই আমাদের জন্য আগেই সিএনজি রিজার্ভ করে রেখেছিলেন। আগামীকাল বিকাল পযন্ত আমাদের সাথে এই সিএনজি থাকবে। খাগড়াছড়ির সব ঘুরিয়ে দেখাবে। ভাড়া ৪৫০০ টাকা।

সকাল নয়টা। দীঘিনালা থেকে রওনা দিলাম সাজেকের উদ্দেশ্য। ২০ মিনিট যাওয়ার পর বাঘাইছড়ি উপজেলা। এখানে পুলিশ চেকপোস্ট। ৩০ মিনিটের মত সময় লাগলো। গাড়িগুলোর সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে ছেড়ে দিলো। তারপর আর ২০ মিনিটের মত গাড়ি চললো, চলে আসলাম হাজাছড়া ঝর্না।

সিএনজির কাছেই শার্ট, প্যান্ট খুলে জাস্ট হাফ-প্যান্ট পড়ে রওনা দিলাম ঝর্নায়। ১০ মিনিট হাটার পর ঝর্নায় পৌছালাম। কিছুক্ষণ গোসল ও ছবি তুললাম। তারপর দেখলাম ঝর্নার উপরে যাওয়া যাবে কিন্তু টাকা লাগবে ২০ টাকা উঠা নামার জন্য। উপরে উঠলাম। হাই-রিস্ক উপরে উঠা।খাড়া পাহাড়ের মত,দড়ি ধরে বেয়ে বেয়ে উঠতে হয় উপরে। এক ঘন্টার মত সময় কাটালাম।

তারপর ঝর্না থেকে এসে আবার কাপর-চোপড় পড়ে রওনা দিলাম। আর হ্যা, এই বাঘাইছড়ি থেকে কলা কিনে নিতে পারেন কারণ এখানে দাম অনেক কম, মানেও ভাল ভালো। সাজেকের আকা বাঁকা রাস্তা গুলো মনোমুগ্ধকর। দু’পাশে ছোট গাছ-গাছালি আর মাঝখানে সাপের মত ‍ওপরে ওঠার রাস্তা। সিএনজি চালকের আমাদের নিয়ে ওপরে উঠতে যথেষ্ট ঝক্কি পোহাতে হয়েছে।

দুপুর একটা। সাজেক গেইট। চারটা টোকেন নিয়ে সাজেক ঢুকলাম। সাজেক ঢুকেই মনটা ফুরফুরা হয়ে গেলো। আহ! কি সুন্দর পরিবেশ। পাহাড়ের মাথায় কত সুন্দর একটা জায়গা। তারপর অনেক গুলো হোটেল দেখলাম। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি আর দামাদামির পর উঠে গেলাম হিমাচল রিসোর্ট। অনেক ভালো মানের রিসোর্ট। সিজনের সময় এটার ভাড়া থাকে ৪-৫ হাজার টাকা প্রতি রুম। আর আমরা এখন নিলাম ডাবল বেডের এক রুম ২২০০ টাকা মাত্র।

রুমে টেলিভিশন সব ছিলো। আর বারান্দাটার কথা না বললেই না। তিনটা চেয়ার আর একটা আরামকেদারা। মনে হয় পাহাড়ের কোলঘেষে বানানো হয়েছে। এখানে অনেক রকম রিসোর্ট আছে। যাই হোক আমরা ফ্রেস হয়ে খেতে বের হলাম।

তারপর একটা হোটেলে প্যাকেজ লাঞ্চ মেন্যু খেলাম। ব্রয়লার, আলু ভর্তা, বাঁশের তরকারি, সবজি, ডাল, সালাদ ১৫০ টাকা। বাশের স্বাদটা ছিলো মূলার মত, মূলা রান্না করলে যেমন লাগে ঠিক তেমন। জীবনে প্রথমবারের মত খেলাম।

সবমিলিয়ে খাবার টা ভালো ছিল। খেয়ে রুমে আসলাম। তারপর ড্রাইভার মামাকে বললাম চারটায় আসতে, কংলাক পাহাড় যাবো। তারপর রুমে গিয়ে রেস্ট নিবো তাই ছোট একটা ঘুম দিবো চারটা পযন্ত।

বিকাল চারটা। ঘুম থেকে উঠেই সিএনজি নিয়ে বের হলাম। হ্যালিপেডের সামনে এসে মামা বললো, এই সোজা পাহাড়ি রাস্তা ধরে পাহারের মাথায় উঠে যান। ওইটাই কংলাক পাহাড়, এখানাকার সবচেয়ে উচু জায়গা। তারমানে ১৮০০ ফিট উপর।

পাহাড়ি রাস্তায় হাততে আমার অভ্যাস হয়ে গেসে,এখন কেন জানি খারাপ লাগে নাহ বরং মজা পাই। ৩০ মিনিটের ট্র্যাকিং ছিলো, উঠে গেলাম। পাহাড়ের একদম উচুতে অল্প একটু জায়গা, মানুষের ভিড় বেশি আর ছোট্ট একটা চায়ের দোকান আছে। সেটা দু’জন মেয়ে পরিচালনা করে। তারপর অনেকক্ষণ উপর থেকে আকাশ ও মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। তারপর নামা শুরু করলাম, নামলাম অর্ধেক সময়ে।

সন্ধ্যা ছয়টা। রুমে এসেই ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে গেলাম। কারণ আমরা ব্যাম্বু-চিকেন খাবো। সেটার অর্ডার দিবো। ব্যাম্বু চিকেন হচ্ছে পাহাড়িদের জনপ্রিয় একটি খাবার। একটা বাশের ভিতর মুরগীর মাংস, মশলা, মরিচ একসাথে দিয়ে আগুনে পুরিয়ে রান্না করা হয়। এখানে সাধারণত রাতে সবাই দুটো খাবার খায়। ব্যাম্বৃ চিকেন বা চিকেন বারবিউকিউ। বারবিকিউ ঢাকাতে খুব প্রচলিত বলেই আমরা ব্যাম্বু চিকেনটা চাচ্ছিলাম।

তারপর অনেক দোকান ঘুরলাম। ওরা একেক দোকান একেক দাম চাইবে। আর প্রতিটা খাবার দোকানে এগুলা হবে। তারপর দুপরে যে  মামার হোটেলে খেয়েছি সেখানেই অর্ডার করলাম। ১২ টা পরটা একটা বাম্বো চিকেন। দাম ৭০০ টাকা। অর্ডার দিয়ে হালকা চা নাস্তা করে রুমে আসলাম ফোন চার্জ দিবো আর রেস্ত নিবো। আমাদের যেতে বলছে ১০ টা দিকে।

রাত ১০টা। আহা বাঁশ খাবো। গিয়ে দেখি রেডি। তারপর বাঁশ থেকে বের করলো আমাদের সামনে মাংস। আহা কি রঙ! তারপর পরোটা দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। একটু ঝাল ঝাল ফ্লেভার আর মসলাটা বেশি। ভালোই লাগছিল খেতে।

আর একটু ঝাল হওয়াতে বেশি ভাল লাগছিল। কারণ ঝালটা না দিলে একটু সিদ্ধ সিদ্ধ লাগতো, তার চেয়ে ঝাল ভালো। মজা করে খেয়ে গেলাম চা খেতে। তারপর চা গেলাম। তারপর রাতের সাজেক দেখছি আর হাঁটছি। রাতে হাটতে আমার এমনি ভালো লাগে, আর যদি সেটা সাজেক হয়। আমি যেখানেই ঘুরতে যাই, একটু রাতের বেলা হেঁটে হেঁটে ঘুরি। রাত ১২টায় হোটেল রুমে ফিরে ঘুম দিলাম, ভোর পাঁচটায় উঠে আবার মেঘ দেখতে হবে।

দুই সেপ্টেম্বর। ভোর পাঁচটা। হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে মেঘ দেখার জন্য হোটেল রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। ওমা বেড়িয়ে দেখি বাইরে অনেক শীত। শীতে কাঁপছি আমি। আর অনেক অন্ধকার। তেমন কেউ নেই। যাই হোক আমরা কাঁপতে কাঁপতে আসতে আসতে হ্যালিপেডের দিকে এগোলাম। সাড়ে পাঁচটার দিকে আলো ওঠা শুরু করলো, মেঘ ওপরে আসছে।

কিছুক্ষণ পর চারপাশে মেঘে ভরে গেলো। আমাদের ভিতর দিয়ে মেঘ যাচ্ছে আসছে। অসম্ভব একটা অনুভূতি। এই সকাল বেলার যে অনুভূতি এটা সত্যি এখানে না আসলে কেউ বুঝতে পারবে নাহ! এটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

অনেকক্ষণ আশে পাশে ঘুরাঘুরি করলাম আর মেঘের খেলা দেখলাম। হাত দিয়ে ধরতে চেষ্টা করলেও হয় না। হ্যালিপেড থেকে নেমে এসে আমরা নাস্তা করলাম। আর প্রথমে বলছিলাম এখানে আমার তিনজন পরিচিত। তিনজনের মধ্যে দেলোয়ার ভাইয়ের দোকানে সকালের নাস্তা করলাম পরটা আর ডিম দিয়ে। বিল আসলো জনপ্রতি ৪০ টাকা।

তারপর রুমে গিয়ে বারান্দায় বসে এক কাপ চা খেলাম। সামনে বিশাল পাহাড়, আর মেঘে ঢেকে আছে পাহাড়গুলো। হিমেল ঠাণ্ডা বাতাস, আমি আরাম কেদারায় বসে গরম চা খাচ্ছি। আপনি অনুভব করেন, ওই সময় কেমন লাগতে পারে!

তারপর রেস্ট নিয়ে ১০ টার দিকে বের হয়ে গেলাম খাগড়াছড়িরর উদ্দেশ্যে, সাজেককে বিদায় দিয়ে দিলম। কারণ আসার সময় ১০.৩০ গেইট খুলে সাজেক আসার। যাওয়ার সময়ও একি সময় গেইট খুলে দেয় সাজেক থেকে বের হওয়ার।চেকপোস্ট গিয়ে গাড়ির নাম্বার আর ঠিকানা দিয়ে বেড়িয়ে গেলাম।

দুপুর একটা। খাগড়াছড়ি বাস স্ট্যান্ড। এসেই গেলাম হানিফ কাউন্টারে। গিয়ে ছেকা খেলাম, কারণ টিকেট শেষ। তারপর ড্রাইভার মামা বললো মামা আগে খেয়ে নেন, পরে টিকেট পাবেন। তারপর ভালো দেখে একটা হোটেলে ঢুকলাম খেতে। মুরগী দিকে প্যাকেজ খেলাম ১৫০ করে।

তারপর গেলাম টিকেট কাটতে। সৌদিয়া, শ্যামলী, ইকোনো, ঈগল, গ্রিনলাইন একটা বাসেও একটা টিকেট নাই। পরে অনেক কষ্টে ভাগ্য ভালো থাকায় শান্তি বাসে একদম লাস্টে চারটা সিট পেলাম। ভাড়া ৫২০ টাকা। যাক তাও তো যেতে পারবো।

দুপুর আড়াইটা। তারপর বের হয়ে গেলাম ঘুরতে। খাগড়াছড়ি থেকে চলে গেলাম আলুটিলা তারেং। সিএনজি দিয়ে একদম ওপর পযন্ত চলে গেলাম। ওপর থেকে পুরো শহর টা দেখা যায়। উপর থেকে টেঙ্গা নদীটা অনেক সুন্দর লাগে।

অনেক লম্বা সাপের মত দেখতে। আর তারেং-এর ওপর অনেক গুলো স্কুলের মারমা মেয়ে দেখলাম। তাদের সাথে একটু কথা বললাম। যাই হোক সময় নষ্ট না করে কিছুক্ষণ থেকে তারপর নেমে গেলাম। নেমেই রাস্তার বিপরীত পাশে বৌদ্ধবিহার। অনেক সুন্দর স্থাপনা।

তারপর চলে গেলাম আলুটিলা গুহায়। ১০ টাকা করে টিকেট কিনে মশাল নিয়ে ভিতরে গেলাম। তারপর গুহায় ঢুকলাম। আমাদের পিছনে আরেকটা গ্রুপ ছিলো। গুহার মাঝখানে গিয়ে একটু ভয় পেয়েছি কারণ মশালের আগুন শেষ। প্রচুর অন্ধকার, আর সাধে বাদুড় তো আছেই।

আর একটা কথা মনে রাখবেন, জনপ্রতি মশাল নিবেন নাহ টাকা নষ্ট করে। সর্বোচ্চ একটা নিতে পারেন ছবি তোলার জন্য। অনেক কষ্ট করে গুহা মিশন শেষ করলাম। তারপর ওইখান চলে গেলাম খাগড়াছড়ি পার্কে। এখানেই ঝুলন্ত ব্রিজ।

এখন বাজে বিকাল পাঁচটা। ব্রিজে ছবি তুললাম কিছুক্ষণ। তারপর পার্কের আশে পাশে ঘুরলাম। জায়গাটা সুন্দর নিরিবিলি। ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরার মত একটা জায়গা। অনেকক্ষণ ঘুরে ওখানে একটা পিচ্চি ছেলের গান শুনলাম বসে। মধু হৈ হৈ। তারপর সন্ধ্যা ৬ টায় বের হয়ে খাগড়াছড়ি শহরে আসলাম। এসে মামাকে ৪৫০০ টাকা দিয়ে বিদায় করলাম। মামাটা ভালোই ছিলেন। তারপর একটু ঘুরে রাতের খাবার খেলাম ১০০ টাকা দিয়ে। তারপর রাত নয়টার টার বাসে উঠে ঢাকা পৌছালাম সকাল ছয় টায়।

  • মোট খরচ

৫৮০ + ৮০ + ৪০ + ৫৫০ (হোটেল ভাড়া, জনপ্রতি) + ১৫০ + ১৭৫ + ৪০ + ১০ + ১৫০ + ৫২০ + ১০ +  ১১২৫ (সিএনজি ভাড়া, জনপ্রতি) + ১০০ = ৩৫৩০ টাকা জনপ্রতি।

শেষে একটা কথা বলতে চাই। যেখানে ঘুরতে যাবেন, ময়লা-আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলবেন। নোংরা করবেন নাহ পরিবেশ। কারণ, মনে রাখবেন দেশটা আমাদের। সুন্দর দেশটাকে সুন্দর করে রাখার দায়িত্বটাও আমাদের।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।