সাইফুল আজম: নীলাকাশের ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’

সাইফুল আজম – খুব কম মানুষই এই নামের সাথে পরিচিত। তিনি একমাত্র ফাইটার পাইলট যিনি চারটি দেশের জন্য যুদ্ধ বিমান উড়িয়েছেন (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরাক ও জর্দান)। এখন পর্যন্ত একক ভাবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিমান ভূপাতিত করার অনন্য বীরত্ব আছে তাঁর দখলে। ফাইটার পাইলটরা বিশ্বজুড়ে তাঁর নাম উচ্চারণ করেন সম্মানের সাথে।

১৯৪১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবার কর্মসূত্রে তাঁর ছোটবেলা কেটেছিল কলকাতায়। ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় তার পরিবার ফিরে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ)।

১৪ বছর বয়সে শিক্ষালাভের জন্য তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে যান। ১৯৫৮ সালে তিনি ভর্তি হন পাকিস্তান এয়ার ফোর্স ক্যাডেট কলেজে। দুই বছর পর ১৯৬০ সালে তিনি পাইলট অফিসার হয়ে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ওই বছরই জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে সাইফুল আজম যোগ দেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে।

সিসেনা টি-৩৭ বিমানের প্রশিক্ষণ ওঅ্যারিজোনার লুক এয়ার ফোর্স বেসে এফ-৮৬ সেব্রেসের উপর পড়াশোনার পর ১৯৬৩ সালে তিনি সংক্ষিপ্তকালের জন্য ঢাকায় নিযুক্ত হন। এরপর তিনি করাচিতে টি-৩৩ এর প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এখানে কর্মরত থাকার সময় ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুদ্ধের সময় এফ-৮৬ নিয়ে ভারতে উড্ডয়নে অংশ নেন।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর অফিসার মায়াদেবের বিমানকে তিনি ভূপাতিত করেন। তাকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক সিতারায়ে জুরাত প্রদান করা হয়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দ্বিতীয় স্কোয়াড্রনের কমান্ড লাভ করেন।

১৯৬৬ সালের নভেম্বরে তাকে জর্ডানের বিমান বাহিনীতে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। ডেপুটেশনে পাঠানো দু’জন পাকিস্তানি অফিসারের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। অন্যজন ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এম. সরোয়ার শাদ। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধ শুরু হলে তিনি হকার হান্টার নিয়ে জর্ডানের বিমান বাহিনীর পক্ষে উড্ডয়ন করেন। ইরাক ও জর্ডানের পক্ষ থেকে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

দুই দিনের ব্যাপ্তিতে তিনি দুইটি ভিন্ন স্থানে আক্রমণ পরিচালনা করেন। এজন্য তাকে জর্ডানের অর্ডার অব ইসতিকলাল ও ইরাকি সাহসিকতা পদক নুত আল শুজাত প্রদান করা হয়। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হামলা থেকে জর্ডানের মূল বেস মাফরাকের প্রতিরক্ষার জন্য তাকে ডাকা হয়।

চারটির মধ্যে একটি বিমান পাকিস্তানিরা উড্ডয়ন করে। সাইফুল আজম একটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করেন এবং আরেকটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১৯৬৭ সালের ৬ জুন তাকে ইরাকি বিমান বাহিনীতে বদলি করা হয়। বিমানঘাঁটি আক্রমণের সময় তিনি পশ্চিম ইরাকে ছিলেন।

ইসরায়েলি পাইলট ক্যাপ্টেন গিডিওন ড্রোর সাইফুল আজমের উইংমেনসহ দুজন ইরাকি যোদ্ধাকে গুলি করতে সক্ষম হন, কিন্তু তিনি গুলি করে তাকে ভূপাতিত করেন। তিনি ক্যাপ্টেন গোলানের বোমারু বিমানকেও ভূপাতিত করেন। তাদের দুজনকেই যুদ্ধবন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে সাইফুল মোট চারটি ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করেন।

এই কৃতিত্বের অধিকারী হলেন বাংলাদেশের বিমানসেনা সাইফুল আজম। এককভাবে সর্বোচ্চ ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার রেকর্ড তাঁর দখলে। সাইফুলের কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে উপাধি দিয়েছিল লিভিং ঈগল। এই উপাধি এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বে মাত্র ২২ জন পেয়েছেন।

২০২০ সালের ১৪ জুন সকালে ঢাকার মহাখালি ডিএসএইচও’র তার নিজ বাস ভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিন তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

১৯৬০ সালে জিডি পাইলট ব্রাঞ্চের একজন পাইলট হন তিনি। ১৯৭১ সালের পূর্বে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।  বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ছিলেন সাইফুল আজমের সরাসরি শিষ্য। বিমান নিয়ে ঢাকায় ফেরত আসার পরিকল্পনা সাইফুল আজমও করেছিলেন। কিন্তু মতিউর রহমান এর মৃত্যুর পর তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর রোষানলে পরেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৮০ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নিলেও পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন পাবলিক সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তিনি ছিলেন আনোর্থডক্স, তিনি ছিলেন সাহসী। বাংলাদেশের তো বটেই, বিশ্বের ইতিহাসেরই সেরা ফাইটার পাইলটদের একজন তিনি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।