তুলনার জায়গাটিও এমন, সময় যেতে দিতে হবে: সাদাত হোসাইন

সাংবাদিকতা, লেখালেখি, চলচ্চিত্র নির্মাণ সব কাজেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সাদাত হোসাইন। পাঠকসমাজে অন্যতম পছন্দের লেখক তিনি। হুমায়ূন পরবর্তী লেখকদের অটোগ্রাফের জন্য বিস্তর লাইন তেমন একটা দেখা যায় নি। সাদাত হোসাইন তার লেখা দিয়ে পাঠককে এতোটাই মুগ্ধ করেছেন যে, তারা ভালোবাসার টানে ছুঁটে আসেন বইমেলায়, প্রিয় লেখকের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার আশায় কিংবা একটা অটোগ্রাফের আশায়। সেই সাদাত হোসাইন অলিগলি.কমের মুখোমুখি হয়েছেন বইমেলা পরবর্তী তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানাতে।

বিগত বইমেলায় আপনার লেখা ‘মানবজনম’ বইটি বেশ ভালোরকমের পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এবারের ‘নিঃসঙ্গ নক্ষত্র’ বইটি সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।

– সাড়া পাওয়ার বিষয়টি দু’রকম। প্রথমত, বইটি কেমন বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বইটি কেনার পর পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া। এখন বইমেলার মাঝামাঝি বা শেষ দিকে এসে বইয়ের বিক্রি সংক্রান্ত সাড়ার বিষয়টি হয়তো বোঝা যেতে পারে। তবে পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত সাড়ার বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে আরও সময় লাগবে। কারণ, বেশিরভাগ পাঠকই মূলত বইমেলার সময় বই কেনেন, পড়েন আরও অনেক পরে। আর একটি নির্দিষ্ট বইয়ের বিক্রি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই লেখকের অন্যান্য বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বা পাঠকপ্রিয়তার উপর। গত তিন বছরে প্রকাশিত আমার ৩ টি বই, আরশিনগর, অন্দরমহল এবং মানবজনম যেহেতু বিস্তৃত পরিসরে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল, তার প্রতিফলন স্পষ্টতই প্রতিফলিত হয়েছে এবারের বই নিঃসঙ্গ নক্ষত্রে। এবং সেটি অনেকভাবে আমাকে এবং আমার প্রকাশককে চমকেও দিয়েছে। বইটি একটা বড় অংশের পাঠক কিনবেন বলেই আমার বিশ্বাস ছিল, কিন্তু এ পর্যন্ত এসে এটির বিক্রি আমাদের রীতিমত চমকে দিয়েছে। পাঠক যে এমন সর্বপ্লাবী ভালোবাসা এবং আগ্রহে বইটি সংগ্রহ করবেন, সেটি আমরা ভাবিনি। এটি সত্যিই বিস্ময়কর।

‘নিঃসঙ্গ নক্ষত্র’ নিয়ে আপনার যেটুকু কামনা ছিলো তা কি পূরণ হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

– প্রথম প্রত্যাশার বিষয়টি নিয়েতো বললাম-ই। দ্বিতীয় অংশ নিয়ে বলি। আমার বই প্রতিবছরই যেহেতু জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এসে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পায়, সেহেতু একটু আগেভাগেই সেটি পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকের কাছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবং এর কারণেই পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ হয়েছে কিছুটা। আবার অনেক পাঠক রয়েছেন, যারা বইটি কিনে সাথে সাথেই পড়তে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন। তাদের কাছ থেকে এ অব্দি যতটুকু প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, তাতে আমি বিচলিত। বিচলিত এই কারণে যে, আমার প্রতিটি বই নিয়েই আমি শঙ্কিত থাকি। মনে হয়, বইটা আমি যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম সেভাবে পারি নি। একটা প্রচন্ড তেষ্টা, অতৃপ্তি। কিন্তু ব্যক্তিগত, পেশাগত নানান ব্যস্ততার কারণে এবারের বইটি নিয়ে এই অতৃপ্তিটা সম্ভবত একটু বেশিই ছিল। এমনকি, বইটি লেখা শেষ করে আমি এর থেকে প্রায় বার হাজার শব্দ ফেলেও দিয়েছি। অর্থাৎ আমি এতোটাই কনফিউজড ছিলাম। মজার ব্যাপারটা এখানেই যে, এখন অব্দি পাওয়া পাঠ প্রতিক্রিয়ায় এটা সম্ভবত আগের সবগুলোর চেয়ে বেশি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। যদিও এখনই বলার সময় আসে নি। এটি সময় গেলে বুঝতে পারবো। তারপরো এটি বলবো যে অনেক সময়েই হয়তো লেখক-পাঠকের বোঝাবুঝি একই বিন্দুতে এসে মেশে না। কখনো লেখকের প্রত্যাশা, কখনো পাঠকের প্রত্যাশা, একে অপরকে ছাপিয়ে যায়, আবার স্পর্শও করতে পারেনা। আমার মনে হয়েছে, এই বইটি আমার প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গেছে। পাঠক এতোটা স্পর্শিত হবেন এটি আমি ভাবিনি।

আপনি মূলত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে থাকেন। এটার পাশাপাশি লেখালেখিতে আগ্রহী হলেন কীভাবে? সিনেমা পরিচালনা, লেখালিখি – কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং? কোনটা বেশি উপভোগ করেন?

– এটি একটি ভুল তথ্য এবং ধারণা। আমি প্রথমে লিখেছি, আমার বই প্রকাশিত হয়েছে, তার অনেক পরে আমি চলচ্চিত্রের দিকে আগ্রহী হয়েছি, এবং সেটি একটি কো-ইনসিডেন্সই ছিল আমি বলবো। আমার লেখক পরিচয় আগে, তারপর অন্যান্য পরিচয়। আমি আসলে গল্প বলতে পছন্দ করি। আমার মনে হয় প্রতিটি সৃজনশীল মাধ্যমই মূলত গল্প বলে, তা সে ফটোগ্রাফি, ফিল্ম, পেইন্টিং বা লেখালেখিই হোক না কেন! তো আমার যেহেতু গল্প বলতে ভালো লাগে, আমি চেষ্টা করছি যে সকল মাধ্যমে আমি একটু হলেও কম্ফোর্ট ফিল করি এবং আমার খানিকটা হলেও দক্ষতা রয়েছে, সে সকল মাধ্যমেই গল্প বলতে। যেহেতু ফিল্মের প্রতি আমার আগ্রহ এবং অল্পবিস্তর জানাশোনা রয়েছে, সুতরাং আমি চেয়েছি এই মাধ্যমটিতেও গল্প বলতে। তবে আমার মূল আগ্রহ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভালো লাগার জায়গা লেখালেখি।

লেখক হিসেবে কি আপনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন বলে মনে করছেন কি?

– এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় এখনই নয়। কিংবা একজন লেখকের পক্ষে তার নিজের সম্পর্কে এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া কখনোই সম্ভব হয় বলে আমি মনে করিনা। আমি মনে করি, আমি লেখক কিনা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে একমাত্র পাঠক ও সময়।

পাঠক সমাজ আপনাকে হুমায়ূন আহমেদের পরিপূরক হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ আবার হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার তুলনাও জুড়ে দিচ্ছে। এসম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত চিন্তা বা মতামত কি?

– এ বিষয়ে আমি কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় স্পষ্ট করে আমার মতামত জানিয়েছি। এখানে আবারও বলছি। এই যে হুমায়ূন আহমেদের সাথে তুলনা, এটি আমার একার ক্ষেত্রে হচ্ছে, তা না। আজকাল কারো লেখা কারো ভালো লাগলেই এটা হয়। আমি মনে করি, এতে খুশি হওয়ার যেমন কিছু নেই, তেমনি অতি শঙ্কিত হবারও কিছু নেই। বিষয়টা হচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদ স্যার আমাদের সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ, তাঁর ছিল তুঙ্গস্পর্শি জনপ্রিয়তা, সর্বপ্লাবী প্রভাব। তার মৃত্যুতে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর পাঠকের মধ্যে তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়েছে, মানুষ অবচেতনেই তাঁর প্রিয় কিছুর শূন্যতা মেনে নিতে পারেনা। সে তাই সবসময় তাঁর মত কিছু খোঁজে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে, বা আদৌ হবে কিনা? আর হলেও সে কী এখনকার হুমায়ূন আহমেদ হবে? নাকি তার নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে?

এই তুলনাটা সবসময়, সবকালেই হয়েছে, এটি নতুন কিছু নয়। কিংবা এটি শুধুমাত্র লেখালেখির ক্ষেত্রেই হচ্ছে, তাও না। এটি সর্বক্ষেত্রেই আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। ধরুন ক্রিকেট, পাশের দেশে শচিন টেন্ডুলকারকে তারা একভাবে ক্রিকেটের ঈশ্বর ভাবেন, তার পরবর্তি ভালো কেউ ক্রিকেট খেললেই তাকে সবাই নতুন শচিন তকমা দেন। তাই না? এখন এই নতুন শচিন তকমা পাওয়া অন্যান্যদের মধ্যে বিরাট কোহলিও কিন্তু ছিলেন। কিন্তু এখন দেখুন, তিনি শচিনের সেই ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছে, অন্যরা কিন্তু পারে নি। বা হারিয়ে গেছে। এখন এই প্রশ্ন বা তুলনার উত্তর দিবে সময়। তুলনা করা যেতে পারে, কিন্তু এখনই সুনির্দিস্ট কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াটা হবে বোকামি।

যেমন ধরুন, কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে আর ম্যারাডোনা পরবর্তি সময়ে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনায় কী হলো? কেউ একটু ভালো খেললেই তাকে বলা হতো, নতুন পেলে, নতুন ম্যারাডোনা। তো এই ব্রাজিলে একের পর এক নতুন পেলে খেতাব পাওয়া খেলোয়ার ছিল প্রচুর, ধরুন আদ্রিয়ানো, রবিনহো, কাকা, নেইমারসহ এই সংখ্যা অনেক। আবার আর্জেন্টিনায় নতুন ম্যারাডোনা খেতাব পেলেন অনেকেই, ওর্তেগা, আইমার, রিক্যুয়েলমে, মেসি সহ আরও অনেকেই। কিন্তু দেখেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ওই নতুন পেলে ম্যারাডোনা তকমা নিয়েই হারিয়ে গেলেন। কিন্তু মাত্র হাতে গোনা দুয়েকজন সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে নিজ পরিচয়ে বিকশিত হলেন। যেমন ধরুন ব্রাজিলে নেইমার। আর্জেন্টিনায় মেসি। এদের দুজনকেই দীর্ঘসময় ধরে শুনতে হয়েছে নতুন পেলে, নতুন ম্যারাডোনা। কিন্তু এখন কী আর তা শুনতে হয়? হয়না। কারণ কী? কারণ তারা এখন স্বমহিমায় সমুজ্জল। বরং এখন অন্য নতুনদের বলা হচ্ছে নতুন নেইমার, নতুন মেসি। সুতরাং এই তুলনা নিয়ে আপ্লুত হবার যেমন কিছু নেই, শঙ্কিত হবারও কিছু নেই।

আসল বিষয়টি হচ্ছে নিজের কাজটি করে যাওয়া। কার কী পরিচয় থাকবে, কার কী জায়গা থাকবে সেটি নির্ধারণ করবে পাঠক আর সময়। এর চেয়ে বড় নির্ধারক আর নেই। আমি মনে করি, দুম করে কাউকে অন্তত নাকচ করে দেয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের সরে আসা উচিত। এটিকে আমার অর্বাচিনতা মনে হয়। আজকাল এটি খুব হয়, এক শ্রেণির স্বঘোষিত বোদ্ধা বা নির্ধারক রয়েছেন, উনারা মুখের কথায় রাত দিন, টিকে থাকা না থাকা, সস্তা – দামি নির্ধারণ করে দেন। আমি বলি, অপেক্ষা করুন, সময় দিন। দেখুন কী হয়?দেখুন সময় কী বলে!

তুলনার জায়গাটিও এমন, সময় যেতে দিতে হবে। একমাত্র সময়ই বলতে পারবে, কে, কী, কোথায় কতদিন থাকবে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।