সড়ক ২ ও অযৌক্তিক আবেগের চক্করে গা ভাসানো

‘সড়ক ২’ নামের একটা সিনেমার ট্রেলার রিলিজ হল। এখন অবধি সাড়ে ১৭ মিলিয়ন লোক দেখেছে এবং তার মধ্যে সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন লোক ডিজলাইক করেছে ইউটিউবে। বেশিরভাগ লোক না দেখেই ডিজলাইক করেছে! কারণ, ছবিতে আলিয়া ভাট আছে। সে মহেশ ভাট এর কন্যা। এবং সুশান্ত পরবর্তী নেট দুনিয়ার লোকজনদের কাছে নেপটিজমের এক জ্বলন্ত উদাহরণ! ফলে তার সিনেমা বয়কট করা হোক, এইরকম একটা দাবি! এই প্রসঙ্গে আমার দুই চার কথা বলার আছে।

প্রথম কথা, নেগেটিভ পাবলিসিটি ও একটা পাবলিসিটি এবং যারা এই ডিজলাইক ঠুকছে, সুশান্তের স্মরণে, তাঁদের এই কথাটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে ইউটিউবে ডিজলাইক ঠুকে আলিয়া ভাটেরে ক্যারিয়ারের বারোটা বাজানোর আশা করাটা বোকামি! বছরে যতগুলো ছবি তৈরি হয় তার নিরিখে বিচার করলে ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম!

এই বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রিতে কত আলিয়ারা এলো গেলো আসবে যাবে। এখানে পারফর্ম না করতে পারলে ধুয়ে মুছে সাফ হতে সময় লাগে না বেশি। বাবা কাকার ছত্রছায়াতে থেকে বিশেষ সুবিধা কেউই খুব একটা করতে পারেনা। কিছু ছবি হাতছাড়া হতে পারে ম্যাক্সিমাম। ওই টুকুই। অর্থাৎ আখেরে আপনার বয়কটে ওদের খুব একটা কিছু আসবে যাবে না। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আপনার উত্তেজনা সাময়িক প্রশমিত হবে মাত্র!

দ্বিতীয় কথা, একটা ছবির সাথে এক গুচ্ছ টেকনিশিয়ান যুক্ত থাকে। যেই ছেলেটা চা দেয়, যারা আলো ধরে, ক্যামেরা ধরে, ট্রলি করে, মেকআপ করায়, কস্টিউম পরায়, হিসাব রাখে, ফ্লোর দেখে এরকম আরো একগুচ্ছ লোকজনের ইনকাম কিন্তু আলিয়ার সিকিভাগ ও না। এদের মধ্যে, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই সবাই সুশান্তের ফ্যান এবং নেপোটিজমের বিরুদ্ধে, সবাইই কিন্তু কাজটা করেছে, আলিয়ার ছবি বলে বয়কট করেনি! কারণ এটা তাঁদের রুটি রুজির প্রশ্ন।

একটা ছবি থেকে প্রযোজক পয়সা না পেলে তার সুদুরপ্রসারী প্রভাব ওই লোকগুলোর উপরেও পড়তে বাধ্য! আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা সিনেমা কোনদিনও একজনের শিল্প না। সেটা একটা সার্বিক শিল্প যেখানে আরো অনেক কলাকুশলীরা থাকেন। এই ছবিতেই যেমন সঞ্জয় দত্ত ও আছেন যিনি এই মুহূর্তে স্টেজ থ্রি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং চিকিৎসাধীন! ফলে কাকে সম্মান দিতে ছবিটা দেখবেন আর কাকে অসন্মান করতে ছবিটা বয়কট করবেন এটা আপনাকেই ভাবতে হবে। এবং সেই চয়েস টাও খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা না!

তৃতীয় কথা, একটা সিনেমা কে সিনেমা হিসেবে দেখাই উচিত। ছবিতে যেই লোকটা নায়ক, সে ধর্ষণ কেসে অভিযুক্ত বলে খারাপ লোক, অতএব তার ছবি দেখবো না। কিম্বা, ছবির নায়িকা বিজেপি করে বা তৃণমূলী, তাই তার সিনেমা বয়কট করবো। এগুলো বড়ই ছেলেমানুষী এবং নির্বুদ্ধিতার পরিচয়! রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি, বড়লোকের বাড়ির ছেলে, কোনদিনও গরীবের দুঃখই বোঝেননি, তাই ওনার লেখা পড়বো না, এইরকম চিন্তা ভাবনা আমার কিছু পরিচিত মানুষের মধ্যে আছে যেগুলোর আমি তীব্র বিরোধী।

আজকে শচীন টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে যদি বেশ গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং ধরে নিলাম প্রমাণিত ও হয়, তার প্রতি মানুষ হিসাবে আমার হয় তো অস্বস্তি তৈরি হবে, কিন্তু একজন ক্রিকেটার হিসেবে তাকে আমি তখনও ভগবানই মনে করবো! কবীর সুমনের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা এর জন্য আমার তাকে মানুষ হিসেবে অসুস্থ মনে হয়, কিন্তু একজন গায়ক শিল্পী হিসেবে এখনো তার গান আমার প্লে লিস্ট এ চলে, চলবেও!

ফলে, মোদ্দা কথা হচ্ছে সিনেমা দেখতে হবে। দেখে খারাপ বা ভালো বলতে হবে। কারণ শিল্প কে শ্রদ্ধা করা আর শিল্পীকে শ্রদ্ধা করা দুটো আলাদা বিষয়। শিল্পীকে আপনার ভালো নাই লাগতে পারে। কিন্তু শিল্পের প্রতি আপনি শ্রদ্ধাশীল না হলে বুঝতে হবে আপনার বোধশক্তি বিলুপ্তপ্রায়!

হ্যাঁ, এটা আলাদা কথা যে ছবিটার ট্রেলার আমারও খুব একটা ভালো লাগেনি। সত্যি বলতে দেখার ইচ্ছাও তৈরি হয় নি। কিন্তু না দেখে আমি অন্তত ছবিটাকে খারাপ বলতে রাজি না। এই রাজি বলতে মনে হলো, আলিয়া ভাট এর ‘রাজি’ ছবিটিতে সে দুরন্ত অভিন়য় করেছিল! আমার বেশ পছন্দের একটি ছবি! ‘হাইওয়ে’ বা ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ও আলিয়ার প্রথম সারির ছবির মধ্যে থাকবে। ফলে, আপনার সাময়িক আবেগের চাপে পড়ে আর একটা ‘রাজি’ যেনো তৈরি হতে হতে না আটকে যায়, সেটা সিনেমা অনুরাগী হিসাবে আপনাকে ভাবতেই হবে!

এই ছবিটা দেখবেন কি দেখবেন না আপনার বিষয়। কিন্তু অযৌক্তিক আবেগের চক্করে পড়ে নেটিজেনদের গা ভাসানো ট্রেন্ড টা ফলো করাটা অন্তত বন্ধ করুন!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।