সব্যসাচী চক্রবর্তী: দ্য অরিজিনাল ফেলুদা

সময়টা সম্ভবত আশির দশকের শেষের দিকে। ছিপছিপে গড়নের এক লম্বা যুবক ‘ফেলুদা’ চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি হাজির সত্যজিৎ রায়ের কাছে। কিন্তু পরিচালক সত্যজিৎ মোটেও আস্থা রাখতে পারেননি তার ওপর। অথচ, আজকাল ‘ফেলুদা’ নামটি শোনা মাত্রই যে অবয়বটি চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে তিনি ভরাট ও গম্ভীর কণ্ঠের ওই প্রত্যাখ্যাত যুবক— সব্যসাচী চক্রবর্তী!

নব্বইয়ের দশক অবধি ফেলুদা বলতে বাঙালি কেবল ওই সময়ের ডাকসাইটে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেই বুঝতো। কারণ, সত্যজিৎ রায় ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র, তপেশ চরিত্রে সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জি এবং জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্তকে নিয়ে পুরো কলকাতাজুড়ে বেশ ভালো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। সেই সাথে পেয়েছিলেন সমালোচকদের প্রশংসা ও অনেক পুরস্কার।

পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায় ফেলুদাকে ছোট পর্দায় অভিষেকের সিদ্ধান্ত নিলে অকস্মাৎ ডাক পড়ে আজকের এ সব্যসাচী চক্রবর্তীর। বাকিটা আর না বললেও হবে। বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, একপেশে হাসি একই সাথে দুর্দান্ত সাহস ও অসামান্য দক্ষতায় সৌমিত্র-বলয় থেকে বেরিয়ে ফেলুদাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে তুললেন তিনি। ‘বাক্স রহস্য’ টেলিফিল্ম এবং ফেলুদার উপর ‘টেলিফিল্ম সিরিজে’র পর তিনি ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ সিনেমায় ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করেন। সবমিলিয়ে আধ ডজনেরও বেশি ছবিতে ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৫৬ সালের আট সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি অভিনেতার নামটাই সব্যসাচী। সিনেমা, নাটক, সিরিয়াল, ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি— সব মিলিয়ে কাজের বেলায়ও তিনি সব্যসাচীর চেয়ে কোনো অংশে কম নন। অবশ্য বাবা জগদীশ চন্দ্র চক্রবর্তী এবং মা মনিকা চক্রবর্তী ছেলেকে আদর করে ‘বেনু’ বলে ডাকতেন।

১৯৭৫ সালে দিল্লীর অ্যান্ড্রু কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর বিখ্যাত হংস রাজ কলেজ থেকে তিনি বিএসসি ডিগ্রী নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি দিল্লিতে এএমআই পরীক্ষায় উত্তীর্ন হন। লেখাপড়া শেষ করেই মূলত তিনি মেইনস্ট্রিম অভিনয়ে আসেন।

গ্রুপ থিয়েটার দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু তাঁর। সেখানেও অবশ্য যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বাবা নাটক লিখতেন। মা নাটকে অভিনয় করতেন। বাড়িতে রাতদিন শুধু নাটকের রিহার্সাল চলত। তার পিসেমশাই জোছন দস্তিদার নির্দেশনা দিতেন। বোঝাই যাচ্ছে বাড়ির পরিবেশটা কেমন ছিল।

 

‘চর্বাক’ নামে তাদের একটা নাট্যদল ছিল। দিল্লিতে থাকতে অসংখ্য নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। মঞ্চের লাইটিং দেখেছেন, ডিজাইন করেছেন, এমনকি প্রয়োজনে মঞ্চ ঝাড়ুও দিয়েছেন। পাড়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, দিল্লির চিত্যরঞ্জন পার্ক ছাড়াও বিভিন্ন কল শো করতেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল। এই ১৭ বছর ধরে তিনি শুধু মঞ্চেই নাটক করে গেছেন। সেজন্যই তো অভিনয়ে তিনি এতটা পাঁকা।

প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান ১৯৮৫ সালে ‘বাংলা গল্প বিচিত্রা’ নামের একটি সিরিয়ালে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে। এরপর ১৯৮৭ সালে পিসেমশাই জোছন দস্তিদারের ‘তেরো পার্বন’ সিরিয়াল থেকেই তিনি পশ্চিমবঙ্গের ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৯২ সালে তপন সিনহার ‘অন্তর্ধান’ সিনেমা দিয়ে বড় পর্দায় নাম লেখান।

ফেলুদার বাইরে সব্যসাচীর অভিনয় করা প্রায় সব চরিত্রই গোয়েন্দা টাইপের। অঞ্জন দত্ত’র ‘রুদ্র সেনের ডায়েরি’ টেলি-সিরিয়ালে থেকে শুরু করে কতো শতো বাংলা হিন্দি মেইনস্ট্রিম ছবিতে যে অভিনয় করেছেন, তার হিসেব নেই। একটা সময় রহস্য রোমাঞ্চ ছবি মানেই ছিলেন সব্যসাচী।

বাঙালির সেরা প্রায় সবগুলো গোয়েন্দা চরিত্রই তিনি করেছেন। কাকাবাবু হয়ে ক্রাচ হাতে হেঁটেছেন। ব্যোমকেশ হয়েছেন। কখনো ভিলেন হয়েছেন বলিউডি সিনেমায়, কখনো হয়েছেন নায়ক। যাই করেছেন নিজের সেরাটা করেছেন। আজো তাই, বাধ্য হয়ে তাকেই ফেলুদার রোল করতে হয়, এই ষাটোর্ধ্ব বয়সেও!

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বাংলা টিভি ও সিনেমা জগতে জনপ্রিয় মুখ মিঠু চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন ১৯৭৫ সালে। তাঁদের দুই ছেলে গৌরব ও অর্জুন। দু’জনই পর্দার জীবনের সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, এই পরিবারটা পারিবারিক ঐতিহ্যটা ধরে রাখতে জানে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।