‘একদিন হয়তো পাকিস্তানের সরকার আমার কফিনে মেডেলও পরাবে’

মান্টো, জীবদ্দশায় ভারতে তিনবার ও পাকিস্তানে তিনবার গল্প লেখার জন্য অশ্লীলতার অভিযোগে আটক হন। আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমার গল্প যদি নোংরা মনে হয় তাহলে এই সমাজও নোংরা। আমি আমার গল্পগুলোতে শুধু সত্যটাই বলতে চাই।’

অনেক বিজ্ঞজনেরা তাঁকে লরেন্স, মোঁফাসা বা বালঝাঁকের সাথে তুলনা করলেও মান্টো ঘটনা ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে গিয়ে মানুষের মূল্যবোধের যে সম্প্রসারণ করেন তাতে, তাকে তার অবস্থান অন্য কোন জায়গায় তুলে ধরে।

মান্টো? সাদাত হাসান মান্টো? সাদাত হাসান মান্টো টা আবার কে?

চোখের উপড়ের ভ্রু জোড়া কুঁচকে যেতেই পারে। সাদাত হাসান মান্টো-কে উপমহাদেশের দাঙ্গা ও দেশভাগের শ্রেষ্ঠ কথাকার বললে এত দিনে মনে হয় কেউ আর আপত্তি করবে না। দেশভাগের যন্ত্রণা, ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, দাঙ্গার আতঙ্ক, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বিদ্বেষ এত নিপুণ দরদে আর কে-ই বা চিত্রিত করেছেন?

চূড়ান্ত বাস্তবতা ছাড়াও কালো কৌতুকময়, রম্যগল্প, মেলো ড্রামা, পট-পরিবর্তনসহ বিচিত্র চিত্র ও ঘটনার সন্মুখীন হয়ে মানুষকে অন্য এক দিক উন্মোচনের নিশানা দেন সাদাত হাসান মান্টো। যুদ্ধ, বিভাজন, ভাঙ্গা-গড়ার পৃথিবীতে জীবনকে লেখার মধ্য দিয়ে দেখে ও রেখে যাবার পন্থা অবলম্বন করে গেছেন সারা জীবন।

দুই একটা উদাহরণ দেই।

একটা গল্পে বলেন, ‘মুসলমানরা স্যার গঙ্গারামের পাথরের মূর্তিতে জুতার মালা দিয়ে হিন্দু এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালানোর সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে আহত হয়ে স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালেই ভর্তি হয়।’

‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ গল্পে দেখি, দেশভাগের সময়কার দাঙ্গায় মুসলমানের রক্তে হাত রাঙানো শিখ যুবক ঈশ্বর সিং ঘরে ফিরে কিছুতেই প্রেমিকার সঙ্গে সঙ্গম করতে পারছে না। প্রেমিকার সন্দেহ, তার মানুষটি নিশ্চয়ই অন্য কোন নারীসঙ্গে মজেছে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে প্রেমিকা ঈশ্বর সিংকে ছুড়ি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। মুমূর্ষু ঈশ্বর স্বীকার করে, সে এক অচেতন মুসলিম বালিকাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারে আসলে সে বালিকাটির মৃতদেহের সঙ্গে…’

‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’র মতো গল্প, যাতে প্রতিবেশী হিন্দু বালিকা শারদার প্রেমে পড়া মুসলিম কিশোর মুখতার ‘প্রেমের ধর্মের কাছে আর সব ধর্মই তুচ্ছ’ ঘোষণা করেও বিয়ের জন্য প্রেমিকাকে ইসলাম গ্রহণে চাপ দেয়। শারদা যখন পাল্টা তাঁকে হিন্দু হতে বলে, তখনই মুখতার ইসলামের উৎকর্ষ আর হিন্দুত্বের অপকর্ষ নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ‘বুকের মধ্যে ইসলাম গুঁজে নিয়ে’ শারদার বন্ধ দরজা থেকে ফিরে আসে।’

গল্প ‘ফিরে আসা’, যাতে দাঙ্গায় স্ত্রী-হারানো সিরাজুদ্দিন তার মেয়ে সাকিনাকে উদ্ধার করতে মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োগ করেন। কিছু দিন পর স্ট্রেচারে-শোয়া অর্ধচেতন মেয়েকে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যেতে দেখে ফিরে-পাওয়ার আনন্দে সিরাজুদ্দিন পিছু-পিছু ঢোকেন। ডাক্তার তাঁকে ঘরে আলো আসার জানলা দেখিয়ে বলেন, ‘খুলে দাও’। অর্ধচেতন সাকিনা তৎক্ষণাৎ নিজের সালোয়ারের দড়ি আলগা করে নামিয়ে দু’পা ফাঁক করে দেয়। এত অসংখ্য বার সে বিধর্মী হিন্দু ও স্বধর্মী মুসলিমদের দ্বারা ধর্ষিত, যে ‘খুলে দাও’ উচ্চারণে সঙ্গে সঙ্গে অবলীলায় আপনা আপনিই তার হাত সালোয়ারের দড়িতে চলে যায়।’

এমন গল্পকারকে পাকিস্তানই বা কী করে হজম করবে? ১৯৫০ সালে মান্টো স্বভাবসিদ্ধ বিদ্রুপে লেখেন, ‘একদিন হয়তো পাকিস্তানের সরকার আমার কফিনে একটা মেডেলও পরিয়ে দেবে। সেটাই হবে আমার চরম অপমান।’

পাকিস্তানের জন্মের ৬৫ বছর উপলক্ষে গত অগস্টে পাক সরকার ঠিক সেটাই করেছে। সাদাত হাসান মান্টোকে তারা ‘নিশান-এ-ইমতিয়াজ’ উপাধিতে ভূষিত করেছে, যিনি তাঁর ‘এপিটাফ’-এ লিখে গিয়েছিলেন, ‘এই সমাধিতে টন-টন মাটির তলায় শুয়ে আছে সেই ছোটগল্পকার, যে ভাবছে, খোদা, নাকি সে নিজে, কে বেশি ভাল গল্পকার!’ মৌলবাদীদের হামলার ভয়ে মান্টোর পরিবার তাঁর সমাধিতে এটা খোদাই করার সাহস পায়নি।

এবার একটু গোড়ায় ফিরি। ১৯১২ সালের ১১ মে ভারতের অমৃতসরে মান্টোর জন্ম এক কাশ্মীরি পরিবারে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর কর্মজীবনে রেডিওতে নাটক লেখা, ফিল্মের জন্য বিবিধ লেখা ও গল্প লেখার কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে সপরিবারে পাকিস্তানে পত্তনের পর সাত বছরের মাথায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মারা যান।

এই সাদাত হাসান মান্টোর জীবনী নিয়ে পরিচালক নন্দিতা দাস তৈরি করেছেন সিনেমা ‘মান্টো’ আর মান্টোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী। মুক্তি পাবে এই ২১ সেপ্টেম্বর।

মান্টোর চরিত্রে নওয়াজ কে নেয়ার প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওর ডেপথ, ওর রেঞ্জ, ও এত ভাল একজন অভিনেতা।কেন ওর কথা ভাবব না বলুন তো? নওয়াজের জীবনের স্ট্রাগল তো ওর চোখে ধরা পড়ে। সেই স্ট্রাগলটা আমার ছবিতেও দরকার ছিল। মাত্র দু’ঘন্টায় এত কনট্রাডিকশন, এত শেডস দেখানোটা সহজ ছিল না। ফলে একজন ভাল অভিনেতা, তার থেকে একজন ভাল মানুষ আমার দরকার ছিল।’

এখন দেখা যাক পর্দায় মান্টো ও সমকালীন অস্থিরতা কতটুকু ফুটে ওঠে? তবে পরিচালকের জায়গায় নন্দিতা দাস আর মান্টোর চরিত্রে নওয়াজ অনেকখানি আশার বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছে বাকিটা বেলুন স্বমহিমায় উড়বে নাকি চুপসে যাবে তা দেখার পরই বোঝা যাবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।