এস শঙ্কর: মাস্টার মেকার/মানি মেশিন

সিনেমার মূল উদ্দেশ্য আসলে কি? অবশ্যই দর্শকদের বিনোদন জোগানো। আর যত বেশি বিনোদন দেওয়া যায়, তত বেশি ব্যবসায়িক সাফল্যও আসে। একজন প্রযোজক তখনই কোনো ছবিতে টাকা ঢালেন, যখন বুঝতে পারেন যে ছবিটার বক্স অফিসে ভাল ব্যবসা করার সম্ভবনা আছে।

সিনেমা দিয়ে ব্যবসা করতে কেবল সিনেম্যাটিক মসলা হলেই চলে না, বুঝতে হয় দর্শকের পালস, বুঝতে হয় কোন অভিনয় শিল্পীর কাছ থেকে কোন কাজ বের করে আনা যাবে। একজন নির্মাতাকে তখনই ‘মাস্টার মেকার’ বলা যায়, যখন তাঁর মধ্যে এই সবরকম গুণই থাকি।

ব্যবসায়িক সাফল্য ও সিনেমার ‍গুণগত মান – দু’টোই ধরে রাখতে পারেন এমন হাতেগোনা কয়েকজন নির্মাতার জন্ম হয়েছে ভারতবর্ষে। তাদেরই একজন হলেন এস শঙ্কর। পুরো নাম শঙ্কর শানমুগাম।

পরিচালনা সহকারী থেকে পুরোদস্তর পরিচালক তিনি বনেছেন ১৯৯৩ সালে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সিনেমা বানিয়েছেন সব মিলিয়ে ১৪-১৫ টি। তাতেই তিনি দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো বটেই গোটা ভারতের ইতিহাসেরই অন্যতম ব্যবসায়িক সফল নির্মাতা।

এস শঙ্কর মূলত দক্ষিণী ছবির নির্মাতা। আরো নির্দিষ্ট করে বললে তামিল ছবির পরিচালক। তারপরও তিনি ভারতে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেওয়া পরিচালক। এটুকু বললেই বোঝা যায়, কত বড় ‘মানি মেশিন’ তিনি।

প্রথম সিনেমা ‘জেন্টেলম্যান’। নব্বইয়ের দশকে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এত বিশাল বাজেটের ছবি খুব কমই হয়েছে। আর ছবিটা শুরুতেই বিশাল ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দেয় শঙ্করের ক্যারিয়ারে। ব্লকবাস্টার তকমা পায় বক্স অফিসে। সেই থেকে শুরু করে টানা ছয়টি ছবিতে সঙ্গীত কিংবদন্তি এ আর রহমানের সাথে জুটি বাঁধেন শঙ্কর। প্রথম ছবি দিয়েই দক্ষিণের ফিল্ম ফেয়ার পান শঙ্কর। সব মিলিয়ে এ আর রহমানের সাথে তিনি ১০ টা ছবি করেন।

পরের ছবি ‘কাধালান’ মুক্তি পায় পরের বছরই। কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন প্রভু দেবা। অ্যাকশন-রোম্যান্টিক ঘরানার ছবিটি বলিউডে মুক্তি পায় ‘হামসে হ্যায় মুকাবেলা’ নামে। আরেকটি ব্লকবাস্টার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শঙ্করকে।

১৯৯৬ সালে আসে শঙ্করের ‘ইন্ডিয়ান’। জুটি বাঁধেন কমল হাসানের সাথে। দু’বছর বাদে আসে ‘জিন্স’। শঙ্করের ছবিতে এবার জিন্স। দু’টোই আলাদা ভাবে হিন্দি ভাষাতেও মুক্তি পায়। দু’টোই বক্স অফিসে বিরাট সাফল্য পায়। এর মধ্যে ‘ইন্ডিয়ান’ ওই সময়ে তামিল ছবির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হিট ছিল। এখানেই শেষ নয়, ‘ইন্ডিয়ান’ ও ‘জিন্স’ দু’টোকেই অস্কারে পাঠিয়েছিল ভারত।

শঙ্কর তখন থেকেই বিরাট একটা ব্যাপার। জিন্স ওই সময়ে গোটা ভারতের ইতিহাসেরই সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি ছিল। শঙ্কর হলেন বড় বাজেটের ছবি বানানোর সেরা কারিগর। বলা হয় এক্ষেত্রে তিনি ভারতের স্টিভেন স্পিলবার্গ।

রজনীকান্তের সাথে শঙ্কর জুটি বেঁধেছেন বেশিদিন হয়নি। তবে,  ‍দু’জন মিলে তিনটি ছবি করে তিনটিই দারুণ ব্যবসা সফল। ‘শিবাজি দ্য বস’, ‘রোবট (এনথিরাম) ও ২.০ – সবগুলোই বক্স অফিসে বাজিমাৎ করেছে। আর শেষ দু’টি ছবি দিয়ে তিনি বড় বাজেটের ছবি নির্মানের পুরনো সব রেকর্ডও ভেঙেছেন। মজার ব্যাপার হল, রজনীকান্ত ছবির মূল ভাবনাতে ছিলেন না। ছবির মূল চরিত্রের জন্য কমল হাসান ছিলেন প্রাথমিক ভাবনায়। এমনকি ছবির প্রস্তাব পেয়েছিলেন আরনল্ড শোয়ার্জনিগারও।

বক্স অফিসের ‘মানি মেশিন’ খ্যাত শঙ্করের ক্যারিয়ারে আক্ষেপ একটাই। আর সেটা হল ২০০১ সালে বলিউডের বানানো ‘নায়ক’। সেবারই প্রথমবারের মত শুধু বলিউডের জন্য ছবি বানিয়েছিলেন শঙ্কর। এটা মূলত ১৯৯৯ সালে তামিল ভাষায় বানানো ‘মুধালভান’-এর রিমেক। মূল ছবিটার পরিচালকও ছিলেন শঙ্করই।

কিন্তু, একই গল্প দিয়ে তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে টিকলেও বলিউডে ব্যর্থ হন শঙ্কর। যদিও, অনিল কাপুর, অমরেশ পুরি, রানী মুখার্জী ও পরেশ রাওয়াল অভিনীত এই ছবিটি বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাল্ট ক্লাসিক। বলা হয়, ওই সময়ে যথার্থ বিপনণের অভাবে ভাল ব্যবসা করতে পারেনি ছবিটি।

মজার ব্যাপার হল সিনেমাকে জীবন বানিয়ে ফেলা শঙ্কর মূলত একজন প্রকৌশলী। তামিল নাড়ুতে ১৯৬৩ সালের ১৭ আগস্ট জন্ম নেওয়া শঙ্কর সেন্ট্রাল পলিটেকনিক্যাল কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রী নিয়েছেন। বলিউডে কখনোই সেভাবে কাজ না করলেও তাঁর ফিল্ম ক্যারিয়ারের শুরুটা কিন্ত ‍মুম্বাইতেই হয়েছিল।

১৯৯০ সালে এসএ চন্দ্রশেখরের তারকাবহুল ছবি ‘জয় শিব শঙ্কর’-এ স্ক্রিনরাইটার হিসেবে কাজ করেন। যদিও, তার আগ পর্যন্ত অভিনেতাই হতে চাইতেন শঙ্কর। কিন্তু, একবার মঞ্চে শঙ্করের বানানো নাটক দেখে চন্দ্রশেখরের মনে হয়েছিল, এই ছোকড়ার পর্দার বাইরেই কাজ করা উচিৎ।

সেই একটা সিদ্ধান্তই পাল্টে দেয় শঙ্করের ক্যারিয়ারের পথ। আর বাকিটা তো স্রেফ ইতিহাস!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।