‘রূপনগর’ ও সোনালী দিনের টিভি নাটক

‘ছি..ছি..ছি.. তুমি এত খারাপ?’

এটি নব্বই দশকের একটি নাটকের সংলাপ ! শুধুমাত্র এ সংলাপটি শোনার জন্যই মানুষ ভীড় করতো বাজারে, দোকানে, রাস্তায়, টিভি আছে যেখানে ঠিক সেখানটায়। তখনকার সময়ে টেলিভিশন এত ছিল না, ছিল না বিদ্যুৎ!

পাড়ায়, মহল্লায় যেখানে টিভি আছে সেখানে ব্যাটারি দিয়ে চালানো হতো চেলিভিশন। নাটক শুরু হলে মানুষ থেমে যেতো, রাস্তায় পরিপূর্ণ থাকতো মানুষ! তখনকার সময়ে বিজ্ঞাপনগুলো ও ভাল লাগতো, অনেকটা মুখস্থ ছিল!

আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না; আমি আর আমার ইমেডিয়েট বড় ভাই দু’জন মিলে রাতের বেলা বাজারে চলে যেতাম শুধুমাত্র ‘রুপনগর’ নাটক দেখার জন্য।

শুধু আমরা নই, নাটকটি প্রচারের সময় বাজারে লোকে ভরে যেতো; সবাই রুপনগর দেখতে চায়। এমন অনেকবার হয়েছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক দেখছি, পাশের লোক বলছে- ‘হেলালল্যা কই, হেলালল্যারে না দেখালে ভাল্লাগে না!’

রুপনগর নাটকের হেলাল চরিত্রটির প্রতি মানুষের ভালবাসা এমনি ছিল! ভিলেন চরিত্রের প্রতি মানুষের ভালবাসা মনে হয় এদেশে হেলাল চরিত্র দিয়েই শুরু, এক্ষেত্রে অবশ্যই বাহবা দিতে হবে খালেদ খান নামের অভিনেতাকে!

মনে আছে ‘এইসব দিনরাত্রী’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের কথা! ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের শফিক চরিত্রে বুলবুল আহমেদ, রফিক চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর আর নীলু ভাবী চরিত্রে ডলি জহুর তখন সবার কাছে ভীষণ জনপ্রিয়।

ছোট্ট টুনির মৃত্যুর মাধ্যমে ধারাবাহিকটি শেষ করেন হুমায়ূন আহমেদ। পরদিনই প্রেসক্লাবের সামনে টানানো হলো ব্যানার – ’টুনির কেন মৃত্যু হলো, হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই’!

কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাইয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে মিছিল হলো- ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’, ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, কুত্তাওয়ালী জবাব দে’!

নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশ টেলিভিশনের তখন স্বর্ণ যুগ চলছে। তখনকার সময়ে সন্ধ্যার আগেই সবাই যে যার কাজ শেষ করে ফেলতো শুধুমাত্র টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার জন্য।

এমনি অবস্থাতে শুরু হত ইমদাদুল হক মিলনের ’রুপনগর’ নামক একটি ধারাবাহিক নাটক। নাটকটিতে নায়ক তৌকির আহমেদ, নায়িকা বিপাশা হায়াত আর ভিলেন ছিলেন খালেদ খান। চরিত্রের নাম ছিলো হেলাল।

নাটকটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল অসাধারণ। হৃদয়ে কম্পন উঠানো, ভয়ংকর অবস্থা সৃষ্টিকারী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যখন বেজে উঠতো তখন সবাই নড়েচড়ে বসতো, আর ভাবতো এই বুঝি ভিলেন হেলাল আসবে এবং নায়কের জীবননাশ করবে।

সবার ধারণাকে সত্যি করে ভয়ংকর সেই মিউজিককে ভেদ করে যখন ভিলেন প্রবেশ করতো এবং কালজয়ী সংলাপ, ’ছি..ছি..ছি.. তুমি এত খারাপ?’ ডেলিভারি দিতো, সত্যিই দর্শকেরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসতো।

মানুষটির কি অদ্ভুত সুন্দর প্রতিটি পদক্ষেপ, চাহনি আর সংলাপ ডেলিভারির ধরণ, মনে হতো শিকার যেখানেই থাকুক না কেনো সে ঠিকই গন্ধ পায় এবং সেখানে উপস্থিত হয়। সাধারণ মানুষের ঘৃণা ও ক্ষোভ, ভয়ের পাত্র হয়েছিল হেলাল নামের এই ভিলেন।

ইমদাদুল হক মিলনের লেখা ‘রূপনগর’ টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে আরও একটি সফল, আলোচিত এবং জনপ্রিয় নাটক। নাটকের এই সংলাপটি সেসময় ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো।

এখানে অভিনয় করে অনেক শিল্পীই তারকা বনে যান। খালেদ খান নতুনভাবে দর্শকদের সামনে আসেন ‘রূপনগর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তৌকীর আহমেদ তখন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।

শেষে একটাই কথা বলতে হয়। এইসব চরিত্র সৃষ্টি কোথায়? যে চরিত্র দীর্ঘদিন মানুষ মনে রাখবে? মূল চরিত্রে অভিনয় করলেই যে অভিনয়শিল্পীরা খ্যাতি পায় এমন কথা ভুল বারবার প্রমান হয়েছে।

পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদের এটা ভাবনায় কী আসে না? কোন একটি চরিত্র নাটক সিনেমা হিটের অন্যতম মূল উপাদেয় হতে পারে- এটা কিন্তু বারবার প্রমানিত!

আহা! সোনালি দিনের টিভি নাটকের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।