তিন খান: একটি অফুরন্ত শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়

এবারের আলোচনা বলিউডের ‘খান’দের নিয়ে। আমির, শাহরুখ, সালমান। টানা তিন দশক বলিউডের সব থেকে বড় ব্র‍্যান্ড তারা। তবে এখানে একটা নোট দিয়ে রাখি। আলোচনা মূলত আমির এবং শাহরুখকে নিয়ে হবে। আমির শাহরুখের সাথে সালমানের ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করার মত কিছু নেই।

তার কারণ খুব সহজ। ‘ওয়ান্টেড’ থেকে নিয়ে সালমানের বক্স অফিস লাগাতার ভাল যায়(দুয়েকটা বাদে)। এরপর ওয়ান্টেডের মতই আরো কিছু গৎবাঁধা মাসালা মুভি। দাবাং, কিক, জায় হো, এক থা টাইগার, টাইগার জিন্দা হ্যায়, বডিগার্ড – এইতো। ‘বাজরাঙ্গি ভাইজান’ ছাড়া সবই প্রায় সিনেমাটিক মুভিই করেছে সে এই সময়ের মধ্যে।

আর ইন্ডিয়ান দর্শকের রুচিও এখনো মোটা দাগে এগুলা দেখার মতই আছে। তাই স্বাভাবিক, ওগুলা বক্স অফিসে হিট হয়েছে। ওয়ান্টেডের আগে সালমানের বলার মত কাজ তেরে নাম, হাম আপ কে হেয় কোন, মুঝছে শাদি কারোগি। বড়জোর আর দুয়েকটা। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে সালমান কেন প্রথম থেকেই খানদের এলিট ক্লাবে আছে? খান তো আরো আছে, জায়েদ খান, সাইফ আলী খান – তারা তো সেরা তিনে থাকতে পারলো না, সালমানই কেন থাকলো।

এই প্রশ্নের উত্তরে শাহরুখের একটা ঘটনার কথা বলি। কোন এক টক শোতে বা অনুষ্ঠানে শাহরুখকে প্রশ্ন করা হয় বলিউডে একটা ফিল্ম হিট করতে চাইলে কী কী লাগে? শাহরুখের অকপট উত্তর ছিলো একটা ফিল্মে যদি আপনার ডিরেকশন বাজে হয়, কাস্টিং সাধারণ হয়, আরো সব সবই খারাপ হয়। তবুও সেই মুভি হিট করবে যদি মুভিটাতে সালমান খান থাকে।

মানে এখানে সালমানকে অভিনেতার বাইরে আলাদা একটা ফ্যাক্ট হিসেবে দেখাতে চাচ্ছেন শাহরুখ। একজন অভিনেতা মানে অভিনয়ই তার প্রধান এবং মূল কাজ। ‘কফি উইথ করন’-এ বড় বড় পরিচালকদের র‍্যাপিড ফায়ার রাউন্ড নিশ্চয়ই দেখেছেন। একজন বড় পরিচালককেও পাবেন না যিনি সালমানকে অ্যাক্টিং অ্যাবিলিটিতে শাহরুখ, আমিরের উপরে রাখছেন। এমনতি রণবীর কাপুরেরও নিচে রাখছে অধিকাংশ ডিরেক্টর। কিন্তু তারপরও সালমানের মুভি হিট হয়, তারই ফ্যান ফলোয়ার ইন্ডিয়াতে সব থেকে বেশি। সো, তাকে আমির শাহরুখের সাথে আনবো না। তাঁর হিসাবটা অন্যরকম।

এবার আসেন আমির এবং শাহরুখের প্রসঙ্গে। আমিরের নিকনেম মিস্টার পারফেকশনিস্ট। এর থেকেই বোঝা যায় তার বাজে কাজ কম। তার কাজ অনেক গুছানো। তিনি কাজের মান নিয়ে কোন প্রকার অবহেলা করেন না। এসবই আমিরের প্রধান উপাদান। এজন্য তার মুভি একেকটা তারে জামিন পর, লাগান, গজনি, থ্রি ইডিয়টস, পিকে, দাঙ্গাল – এসব।

অন্যদিকে শাহরুখের নিকনেম বা তার নামের সাথে সব থেকে বড় ট্যাগ হলো কিং অব রোম্যান্স। স্বাভাবিক – দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, মোহাব্বাতে, দেবদাসের মত মুভি যার নামের সাথে আছে, তাকে তো কিং অব রোমান্স বলাটা শতভাগ যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এখানে যারা আমিরের ফ্যান, অথবা যারা তাদেরকে নিয়ে ক্রিটিকধর্মী কোন কিছু লেখেন, তখন মারাত্মক একটা ফাঁকিতে ফেলেন।

ফাঁকিটা এই যে, আমিরকে যখন ‘মি: পারফেকশনিস্ট’ বলা হয়, তখন নি:শব্দে অন্য সবাইকে( স্পেশালি শাহরুখকে, কারণ আমিরের সব থেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সে) অ-পারফেকশনিস্ট বলা হয়ে যায়। এই কারণে আমিরের ফ্যান বা অন্য কারো ফ্যানরা শাহরুখের কাজকে মনে করেন আমিরের তুলনায় স্বস্তা এবং তুলামূলক নিম্ন মানের কাজ।

একটা হিসেব দেখাই।

আমিরকে আলাদা কেন বলা হয় সেসব ছবির নাম একটু আগে বললাম। সেগুলোর সাথে একই বা কাছাকাছি মানের কাজ কিন্তু শাহরুখেরও আছে। আপনি যদি আমিরের লাগানের কথা বলেন, আমি বলবো শাহরুখের স্বদেশের কথা। যদি বলেন ‘তারে জামিন পার’, আমি বলবো ‘ডিয়ার জিন্দেগি’। আমাকে যদি আপনি ‘দাঙ্গাল’ দেখতে বলেন, আমি বলবো ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ দেখেন। যদি বলেন ‘গজনি’ দেখেন, আমি বলবো ‘ডন টু’ দেখেন। যদি বলেন ‘থ্রি ইডিয়টস’ দেখতে, আমি বলবো ‘মাই নেম ইজ খান’ দেখেন।

মানে কী দাঁড়ালো? আমিরের যেসব কাজের জন্য তাকে পার্ফেকশনিস্ট বলা হয়, তারা কাছাকাছি(কোন কোন ক্ষেত্রে ভাল বা একটু খারাপ) মানের কাজ শাহরুখের আছে। কিন্তু যেটা শাহরুখের প্লাস পয়েন্ট, আমিরের এসব কাজ বেশিরভাগ ২০০৬/৭ এর পরের। তাদের এর আগের ক্যারিয়ার যদি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে দেখবেন আমিরের থেকে শাহরুখ অনেক উপরে।

কিভাবে সেটা বলি। ২০০৭-এর আগ পর্যন্ত ক্যারিয়ারে শাহরুখের নামের সাথে বাজিগর, ডিডিএলজে, কুছ কুছ হোতা হে, মোহাব্বাতে, দেবদাস, কাল হো না হো, বীর জারা, কাভি আলবিদা না কেহনার মত মুভি আছে। একেকটা মাস্টারপিস। এই তালিকা আরো বড় করা যায়। দিল সে, দিল তো পাগল হে, কাভি হ্যা হাভি না, দিওয়ানা। এইগুলার সাথে কম্পেয়ার করার মত আমিরের মুভি কোথায়? কিয়ামত ছে কিয়ামত, আন্দাজ আপনা আপনা, রাজা হিন্দুস্থানি, দিল চাহতা হে। এছাড়া বড়জোর আর দুয়েকটা নাম পাওয়া যাবে।

লেখাটা আরো বড় করা যায়। কিন্তু অত বিস্তারিত আলাপে যাচ্ছি না। এমনিতেই লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। আর দুইটা বিষয় বলবো। ইমেজ এবং পার্সোনালিটি।

বলিউডের ১০০ বছর পূর্তিতে কোন এক ম্যাগাজিন (সম্ভবত ফিল্মফেয়ার) একটা প্রচ্ছদ করেছিলো দিলিপ কুমার, অমিতাভ এবং শাহরুখকে দিয়ে। এটা একটা রুপক ছবি ধরা যায়। মানে বলিউডের প্রথম কিং দিলিপ কুমার, তারপর অমিতাভ এবং এখন পর্যন্ত শাহরুখ। এমন একটা ব্যাপার খুঁজে পাওয়া যায় ছবিটাতে। বলা হয় বলিউডকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করা প্রথম অভিনেতা শাহরুখ।

ইউরোপ আমেরিকায় শাহরুখের জনপ্রিয়তা কেমন এর অনেক ভিডিও ইউটিউবে আছে, দেখে নিতে পারেন। এই কয়েকদিন আগেই দেখলাম টম ক্রুজের পর সব থেকে বেশি আয় করা অভিনেতা হয়েছে শাহরুখ। যে কয়টা উদাহরণ দিলাম তার কোন ক্ষেত্রেই আমিরকে শাহরুখের আশেপাশেও পাবেন না। এইসব থেকে বোঝা যায় শাহরুখ তার ইমেজকে একজন কিং হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছে।

পার্সোনালিটির ব্যাপারেও একই রকম কথা আসে। যেকোন এওয়ার্ড শো, টিভি শো, প্রেস কনফারেন্স সব জায়গায় শাহরুখ অকপট, সাবলীল। এর প্রধান কারন শাহরুখের মারাত্মক সেন্স অব হিউমার, যা তার পার্সোনালিটিকে এক্সট্রা সৌন্দর্য দেয়। এমন কোন প্রেস কনফারেন্স বা শো দেখিনি যেখানে শাহরুখকে প্রশ্ন করে বিব্রত করা গেছে।

কেউ যদি ভাবে আমি এই প্রশ্নটা করে শাহরুখকে বেকায়দায় ফেলবো, দেখা যায় তার চে এক লাইন সামনের চিন্তা শাহরুখ করে রেখেছে। এইসবেরও ভিডিও ইউটিউবে অনেক পাবেন। বিপরীতে আমিরকে দেখেন। কোনো অ্যাওয়ার্ড শোতে আসেন না। তার কারণ অনেকেই বলে সে এসব অপছন্দ করে। কিন্তু ‘কফি উইদ করন’-এর কোনো এক এপিসোডে আমি শুনেছি আমির এটা স্বীকার করেছে যে লাইভে কথাবার্তা বলা বা উপস্থাপনা এসব তার ধাঁচে নেই।

তিনি আন ইজি ফিল করেন। এবং এটা বাস্তবও। আপ কি আদালতের একশো এপিসোড পূর্তিতে আমির শাহরুখ সালমান এক সাথে মঞ্চে ছিলেন দশ পনেরো মিনিট। সেখানে কথা বলতে গিয়ে দেখা যায় সালমান শাহরুখের সাথে তাল মিলিয়ে আমির কথাই বলতে পারছেন না। শাহরুখের ফান সুলভ এক কথার উত্তরে আমির সিরিয়াস উত্তর দিয়ে বসে। কিন্তু সালমান সাথে সাথে কথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ায় অবস্থাটা ইজি হয়। এটাও ইউটিউবে পাবেন, পারলে দেখে নিয়েন। তো দেখা যায় এখানেও শাহরুখ এগিয়ে।

শেষকথা, আমার লেখা পড়ে অবশ্যই বুঝতেছেন আমার দৃষ্টিতে শাহরুখ সেরা। কিন্তু এর মানে অন্য দুইজন আমার কাছে অপছন্দ বা আমি তাদের হেট করি না। শাহরুখের মুভির জন্য যেমন আমি অপেক্ষায় থাকি তেমনি আমির সালমানের ছবির জন্যও থাকি।

আমাদের প্রজন্ম যেমন শচিন, লারা, পন্টিং, ক্যালিসদের খেলা দেখার কারনে ধন্য। যেমন আমরা মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশি রিয়াদের খেলা দেখতে পারার জন্য ধন্য। যেমন আমরা মেসি রোনালদোর দ্বৈরথ দেখে ধন্য। ঠিক একইভাবে আমির শাহরুখ সালমানের সময়টার জন্যও আমরা ধন্য। প্রত্যেকের আলাদা ফ্যানবেজ আছে, থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে আমার কাছে শাহরুখ সেরা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।