রুদালি: মরা বাড়িতে কান্নাই যাদের চাকরি!

বাড়িতে কেউ মারা গেল, স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সবাই কাঁদবে, বিলাপ করবে। খুবই স্বাভাবিক একটা দৃশ্য! কিন্তু, একদল কালো কাপড় পরিহিত নারী এসে যদি আপনার পরিবর্তে মরা কান্না কেঁদে দিয়ে যায়- তাহলে কেমন হবে – ভাবুন তো!

সেটাই চলে আসছে ভারতের রাজস্থান রাজ্যে, শত শত বছর ধরে! কালো পোশাক পরিহিত একঝাঁক নারী ঘুরে বেড়াত রাজস্থানময়। কোথাও কেউ মারা গেলে বা মারা যাবে এমন সম্ভাবনা থাকলে আগে থেকে ভাড়া করে রাখা হতো তাঁদের।

তাঁদের প্রধান কাজ মরা বাড়িতে গিয়ে মাতম করা, বুক চাপড়ে কাঁদা, গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে দেয়া। ভুল করেও সে চোখের পানির একটি কণাও মুছত না তারা, এই প্রথম কারো মৃত্যুতে কাঁদছে না তারা, শেষ কান্নাও নয় এটি।

গোটা বাড়িতে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করতেই তো তাদের ভাড়া করে আনা! এই প্রথা চলেছে শত শত বছর, এখনো চলছে রাজস্থানের বিভিন্ন অজপাড়াগাঁয়ে।

মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে শোকের মাতম করা এই নারীরা সাধারণভাবে পরিচিত ‘রুদালি’ নামে।  তাদেরকে বলা হয় ‘প্রফেশনাল মৌনার’ বা পেশাদার বিলাপকারী। বিলাপ করেই জীবিকা নির্বাহ করে তারা। কী অদ্ভুত এক জীবন!

পরনে থাকে কালো পোশাক, যমের পছন্দের রঙ নাকি কালো। তাই মৃত্যুদূতকে খুশি করতে তাঁর পছন্দের সাজেই নিজেদের সজ্জিত করেন রুদালিরা।

সমাজের একেবারে নিচু জাত থেকে তুলে আনা এই রুদালিদের বেশ কিছু সমাজে বিয়ে করারও নিয়ম নেই। নিজের পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে লোকের মৃত্যুতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাঁদবে কে?

চেনা নেই, জানা নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই; কেবল অর্থের বিনিময়ে মানুষের বাড়িতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থে লোক দেখিয়ে কাঁদার জন্যই যেন জন্ম হয়েছে তাঁদের। নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে, আবেগ-অনুভূতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষের চাহিদামতো চোখের পানি ঝরানো এই নারীদের সমাজে কিন্তু তেমন কোনো দাম নেই।

সবচেয়ে দু:খজনক বিষয় – অনেক সময়, অন্নদাতার জবরদস্তিতে অবৈধ সন্তানের জন্ম দিতে হয় তাদের। তাই হাভেলিতে প্রবেশ করা রুদালিদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে কার্পণ্যবোধ করে না সে সমাজ। আর সেই সন্তান যদি হয় মেয়ে, তাহলে বন্ধ হয়ে যায় তাদের সামান্য আয়-রোজগারের পথটুকুও।

কেননা রাজস্থানের মানুষের অন্ধবিশ্বাস অনুযায়ী, মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয়া রুদালি পরিবার আর সমাজের জন্য অভিশাপ বয়ে আনে। তাই রুদালিদের মধ্যে বেশ বিখ্যাত একটি প্রবচন প্রচলিত আছে- ‘পান্দো ভালো না কসকো, বেটি ভালি নায়েক!’

কথাটির বাংলা করলে দাঁড়াবে – ‘খালি পায়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে বললেও কষ্ট পাব না, কিন্তু একটি মেয়েসন্তানও যেন ঘরে না আসে।’ এই আধুনিক যুগে এসে এটা ভাবা যায়!

পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেও সেই সন্তান কখনো বাবার নাম ব্যবহার করতে পারে না। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে না চিনেও তার জন্য অঝোরে অশ্রু ঝরাচ্ছে- এই কঠিন কাজের বিনিময়ে তাদের যে অর্থ প্রদান করা হয়, তাকে নামমাত্র মূল্য বললেও কম বলা হবে।

আজ থেকে ৩০ বছর পূর্বেও মরা বাড়িতে গিয়ে কাঁদার জন্য ৫-৬ রূপি করে পেত তারা। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়া, বুক চাপড়ানো, শ্মশান ঘাটে গিয়ে আছড়ে পড়া- এমনি যত কলাকৌশল সেই কান্নার সাথে যুক্ত হতো, ততই তাদের অর্থের পরিমাণ বেড়ে যেত। টাকার সাথে পুরনো কাপড়, ভাত, রুটিও দিত কোনো কোনো দিলদার অন্নদাতা।

তবে খাবারের মধ্যে কাঁচা পেঁয়াজ আর বাসি রুটিই বেশি দেয়া হতো তাঁদের। কখনো কখনো রুদালিদের টানা বারোদিনও কাঁদতে হয়। যত দীর্ঘদিনব্যাপী শোকের মাতম চলবে, ততই লোকজন ওই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিয়ে কানাঘুষা করবে।

পারফরম্যান্স ভালো করতে তাই পেশাদার রুদালিরা নিজেদের জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা মনে করার চেষ্টা করে। সবসময় কিন্তু চাইলেই চোখের পানি পড়ে না, তখন শুধু মুখের বিলাপই ভরসা।

রুদালি ছবির একটি দৃশ্য

তবে যারা পুরোপুরি পেশাদার, তাদের নিজস্ব কিছু কৌশল আছে চোখে পানি আনার।  কেউ কেউ থুতু লাগিয়ে মুখে পানির রেখা তৈরি করেন, কেউবা এক ধরনের গাছের শেকড় ব্যবহার করেন যা অনেকটা গ্লিসারিনের মতো কাজ করে।

কাজলের মতো এক ধরনের কালিও পাওয়া যায়, যা চোখে লাগানোর সাথে সাথে তীব্র জ্বলুনি শুরু হয় আর চোখের পানি পড়তে থাকে। ভাবা যায়- ভালভাবে কাঁদতে পারাটা সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, যে যত বেশি কাঁদতে পারবে তার তত বেশি টাকা!

এই সম্প্রদায়ের জীবনের কঠিন সত্য অবলম্বনে রুপালি পর্দায় চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে ১৯৯৩ সালে। ছবিটির পরিচালনা করেন কল্পনা লাজমী।  ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে ডিম্পল কাপাডিয়া যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। ছবির নামও ‘রুদালি’ চাইলে দেখতে পারেন!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।