‘রসগোল্লা’য় মনের বাসনা তৃপ্তি

শহুরে গ্ল্যামার, ড্রয়িং রুমে মদ, কথায় কথায় ইংলিশ, তুই তোকারি প্রেম, ঝকঝকে স্মার্টনেস আর চোখে মুখে কথা বলা ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মডার্ন ছেলে মেয়ে – এসব কিসসু নেই। যা আছে তা হোল সেকেলে কড়িবরগা, উত্তর কলকাতা, ফতুয়া, মোচার ঘন্ট আর রসগোল্লা। সিনেমাটা দেখে ফেলুন

গল্প শুরু হয় একটা বাচ্ছা ছেলে কে দিয়ে। সে গ্রামের মেঠো পথ (১৮০০ শতাব্দীর কলকাতা গ্রামই বলা চলে) ধরে ছুটছে কিছু ফকিরদের পিছু পিছু যারা গান গাইতে গাইতে চলেছে। গান শেষে বাচ্ছা বায়না করে আরও গান শুনবে। ফকির হেসে বলে গান শোনাবে, কিন্তু বদলে কি পাবে? বাচ্ছা অনেক ভেবে নদীর ধারের থেকে কিছু মাটির তাল তুলে নিয়ে এসে গোল্লা পাকিয়ে বলে এই নাও মন্ডা। ফকির হেসে বাচ্চাকে আশীর্বাদ করে বলে সে অনেক বড় হবে আর সবাইকে খাওয়াবে। স্ক্রিন কালো হয়ে যায়। রসগোল্লা নাম ফুটে ওঠে। সিনেমা শুরু হয়।

বলার অপেক্ষ্যা রাখে না যে এই বাচ্ছাই নবিন চন্দ্র দাস। সে আস্তে আস্তে বড় হয়। অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যায়। বাপ মরা দামাল ছেলেকে নিয়ে তার মায়ের চিন্তার অন্ত থাকেনা। ছেলে ময়রা হবে বলে গোঁ ধরে। অনেক বাধা আসে। প্রতিকূলতা আসে। প্রেমও আসে। দেখা হয় ভোলা ময়রার নাতনির সাথে। ক্ষীরদা। সে নবীনকে বলে এমন একটা মিষ্টি বানাতে যেটা রসে হবে তুলতুলে, দেখতে হবে চাঁদপানা, সাদা ধবধবে। যেন ‘রসের গোল্লা’।

ক্ষীরদার সেই মিষ্টি আবদার – ‘যেমন মিষ্টি ভূ ভারতে নাই; নবীন ময়রা, তেমন মিষ্টি চাই’ – নবীন জীবনের মানে যেন খুঁজে পায় ক্ষীরদা আর তার সেই আবদারের “রসের গোল্লা” মিষ্টির মধ্য দিয়ে। মিষ্টি সেই প্রেম পূর্নতা পায় সাত পাকে। এক রাতে বিপ্লব ঘটে। জন্ম নেয় আপামর বাঙ্গালীর স্বাদ কোরকের অব্যর্থ ওষুধ, রসগোল্লা। গল্প শেষ হয়।

বাংলা সিনেমায় খালি ওভারস্মার্ট চোখা চোখা ডায়ালগ শুনতে শুনতে কানটা ভুলে গেছিলো সে বাঙ্গালির কান। আজ আবার হৃত গৌরব ফেরত পেলো যেন। ছবির মধ্যে বাংলা ও বাঙ্গালির সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান গুলো সুন্দর ভাবে পরিচালক পাভেল ঢুকিয়েছেন। ভালো মন্দ বলার আগে একটা কথা বলতে চাই। এটা একটা ফিকশানাল বায়োগ্রাফি। পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার আপন মনের মাধুরী মিশিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনও ভুল নেই। ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট ঘেঁটে এই ছবির সাথে তুলনা করবেন না। আগেও বলেছি, সেটা করা উচিত না।

  • ভালো কিছু দিক

ছবির গল্পটাই খুব সুন্দর। রসগোল্লার উদ্ভাবন নবীন চন্দ্র দাসের হাত ধরে, সেটা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু তার পেছনের গল্পের সাথে একটা মিষ্টি প্রেম মিলিয়ে দিয়ে যে সুন্দর চিত্রায়ন তা বাস্তবিকই সুখকর।

ছবির গান গুলো বেশ ভালো লাগলো। ‘টাপুর টুপুর’ আমার সবচেয়ে পছন্দের লেগেছে। গানটা মিরচির লিস্টে টপেও আছে। থাকবেও বেশ কিছু দিন আশা করা যায়। তবে একটা গান কম হলে আরও জমত হয়তো। সিনেমার দৈর্ঘ্য যেন আরো একটু কম হলে ভালো হত, মূলত গানের জন্য।

অভিনয় মারাত্মক না হলেও অত্যন্ত সাবলীল। নতুন নায়ক নায়িকারা বেশ দৃষ্টি নন্দন। তবে অল্প হলেও পর্দায় যতক্ষণ ছিলেন অপরাজিতা, রজতাভ বা শান্তিলাল দেখিয়ে দিয়েছেন বুড়ো হাড়ের ভেল্কি। খরাজ আরও একজন যে শুরু থেকে একনিষ্ঠ সহচর নবীনের এবং যোগ্য সঙ্গদ দিয়েছেন।

  • খারাপ কিছু দিক

সেট বানানো হয়েছে সেটা বোঝা গেছে। পুরোনো কলকাতা ধরতে গিয়ে পয়সার অভাব চোখে পড়েছে। শুভশ্রীর পার্টটা কোনও এক্সট্রা ভ্যালু দেয়নি বলে মনে হোল আমার। হিন্দুস্তানি বাইজির হিন্দি উচ্চারণ আরও পরিশীলিত হওয়া দরকার ছিলো। শুভশ্রী পারেননি সেটা।

ক্যামেরার কাজ আরও কিছুটা উন্নত হওয়া বোধ হয় দরকার ছিল। অনেক জার্ক লেগেছে চোখে। তিমির বিশ্বাসের আধুনিক টোনে একটা মোটিভাশানাল গান ঠিক মানায়নি ১৮০০ শতাব্দীর পটভুমিতে।

এই সব ভুল থাকা সত্ত্বেও রসগোল্লা দেখতে বলছি, কারণ ছবিটা ফ্যামিলি মুভি। সবাই বসে দেখতে পারেন আর নির্মল আনন্দ পেতে পারেন। শিবু নন্দিতাদের ছবি বরাবরই টিপিকাল বাংলার গল্প বলে। কোনও অযথা আড়ম্বর থাকেনা। সহজ সরল নিটোল গল্প। ড্রামা আছে। মেলোড্রামা অল্প থাকলেও খুব একটা বোরিং লাগবেনা হয়তো। রসনা তৃপ্তির ছবি মনের বাসনা তৃপ্তি করবে আশা করবো। দশে মিষ্টি করে সাড়ে ছয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।