‘কণ্ঠম্যাগনেট’ রূপা গাঙ্গুলি

কলেজজীবনে, প্রায় ১৬-১৭বছর পূর্বে, ছুটিতে বাড়ি ফিরে চ্যানেল পাল্টানোর অমনোযোগীতায় হঠাৎ ইটিভি বাংলায় প্রচাররত ‘বাঙালি বাবু’ নামের কমার্শিয়াল সিনেমাটি যদি কিছুক্ষণ দেখবার ভাব তৈরি না হতো, তাতে কি বৃহৎ বিপর্যয় ঘটতো? একজন মানুষের জীবনরেখা তার নিজের কাজ বা আচরণ দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রতি হয়, পারিপার্শ্বিক if-else গুলোর প্রচ্ছন্ন অথচ প্রকট অবদান সম্ভবত তার চাইতে অনেকাংশে বেশি।

নইলে, যে ‘বাঙালি বাবু’ মিঠুন চক্রবর্তীর হম্বিতম্বিসর্বস্ব মসলাদার সিনেমাগুলোর একটিমাত্র হিসেবেই পরিচিতি পাওয়া উচিত, যেখানে অন্যান্য কলা-কুশলী কারা ছিল মনে রাখবার প্রয়োজন বোধ করিনি, তার আপাত অগুরুত্বপূর্ণ নায়িকার কণ্ঠস্বরে বন্দী হয়ে পড়বো, এবং পরবর্তীতে এতগুলো বছর ধরে – প্রায় প্রাত্যহিকতার মতো করে – আজীবনের চুক্তিতে সেই নায়িকার কণ্ঠবিশ্বে অক্লান্ত পরিভ্রমণ করে বেড়াবো- এ কেমনতর if-else!

মানুষের যে কোনো চিন্তা বা ভাবনাও আদতে শব্দ কিংবা আওয়াজ। চিন্তাগুলো সে শুনতে পায়। যেমন কেউ ভাবছে ‘কাল ধানমন্ডি স্টারে গিয়ে লেগরোস্ট খাবো’। ভাবনাটা সে শুনতে পাবে নিজের কণ্ঠে।

আমিও শুনি সকল ব্যক্তিগত ভাবনা, তবে ২০০৪-০৫ এর সেই সিনেমার পর কণ্ঠটা নিজের নেই, তার দায়িত্ব নিয়েছেন কমার্শিয়াল সিনেমার সেই নায়িকাটি, যার নাম রূপা গাঙ্গুুলি!

রূপা গাঙ্গুলীর কণ্ঠ যুগাধিককালব্যাপী আবেশিতা তৈরি করলো, একা থাকলে অথবা জনারণ্যে, যখনই আত্মসমালোচনামুখর বা প্রশ্নঋদ্ধ হই সেসব শুনতে পাচ্ছি তার কণ্ঠযোগে – একে কি হ্যালুসিনেশন বলা উচিত?

আদতে শুনি না, শুনছি কল্পনা করি বা ধরে নিই। কীভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য হতে পারে এই দুর্নিবার সংযুক্তি কিংবা একাত্মতা বোধ? বিভিন্ন উদ্ভট কারণেই নানা বৈশিষ্ট্যের মানুষের প্রতিই অব্যাখ্যাত সংযোগ বোধ করেছি জীবনভর।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতি নামের কারণে, নায়ক আলমগীরকে দেখলেই দোতলা বাসের ইমেজ তৈরি হওয়ার কারণে, ক্রিকেটার আশরাফুল এবং লিটন দাসের প্রতি ব্যাটিং সৌন্দর্যের কারণে, কাফকার প্রতি ট্রায়াল উপন্যাসের প্লটের কারণে, ‘কিন্তু’ গল্পের ‘ষৎকো’ নামের পিঁপড়ার প্রতি হেলানো দেয়াল বেয়ে উপরে উঠার কারণে, বুয়েটজীবনের সহপাঠী এক নারীর প্রতি তার রোল নম্বর 41 হওয়ার কারণে – তালিকাটি সুদীর্ঘ এবং ক্রমবর্ধমান।

তবে. কণ্ঠের প্রতি বেপরোয়া আসক্তির কারণে সংযোগ – এই একটি সুনির্দিষ্ট অনুষঙ্গের ভিত্তিতে আকৃষ্ট হওয়া মানুষদের সমাবেশ পৃথক এক জগত তৈরি হয়েছে, যেখানকার অবিসংবাদী চরিত্র রূপা গাঙ্গুলী নামের ৫৫ বয়সী এক বাঙালি নারী, যিনি অভিনয়সূত্রে পরিচিতি অর্জন করে এনক্যাশ করেছেন রাজনীতিতে প্রবেশ (অনুপ্রবেশও হতে পারে) এর মাধ্যমে।

স্রেফ কণ্ঠের প্রলোভনে ২০০৪ এর পরে যেখানে যত সিনেমা বা ভিজুয়াল কনটেন্ট পেয়েছি রূপা গাঙ্গুলি সংবলিত, সকল প্রায়োরিটি বিসর্জন দিয়ে হলেও তাতে সময় এবং মনন বিনিয়োগ করেছি। প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই তার চরিত্রের ধরন নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা- কিছুটা ম্যাসকিউলিন ন্যারেটিভের, বিচ্যুত বিধানের অথবা যৌনতার বিবিধ কননোটেশনমিশ্রিত – যে কারণে সিনেমা বা ভিডিওগুলোর প্রতি অনাসক্তি কাজ করতো, কখনো সখনো ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে শুধু রূপা গাঙ্গুলীর অংশগুলোই দেখা হয়েছে; মিস করা চলবে না কোনোক্রমেই।

এটুকু তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে ‘ডাই হার্ড রূপা গাঙ্গুলি ফ্যান’ ভেবে নিতে পারেন অনেকে।

গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, অতি সরলরৈখিক বিচ্ছিরি ভাবনা। শুধুমাত্র অভিনয়শিল্পীর নিক্তিতেই যদি বিচার করি অপর্ণা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় তার চাইতে বহুযোজন ব্যবধানে এগিয়ে। বাংলাদেশ, হলিউড, বলিউড, তামিল-তেলুগু সহ যেসব ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা দেখি যৎকিঞ্চিৎ সেখানকার অভিনেত্রীদের আমলে নিলে রূপা গাঙ্গুলির ক্রমিক নং ৩৫ পেরিয়ে যাবে। যে অভিনয়সূত্রে তার প্রতিষ্ঠা, সেখানে যার অবস্থান এত পিছনে তার ভক্ত বা ফ্যান, চিন্তাটা একটু জুলুম হয়ে গেল না?

অথচ রূপা গাঙ্গুলি আমার কল্পজগতে এক ইউনিক ক্যারেক্টার! বৈপরীত্যটা খোলাসা করা যাক। ব্যক্তির দৈহিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ একেবারেই নেই, জোরালো স্বরে উচ্চারণ করতে পারি; খুব ঘনিষ্ঠ মহলের কারো কারো কাছে মিনমিনে স্বরে বলেছি, এমনকি মানসিক সৌন্দর্যও অস্পষ্ট বা বায়বীয় লাগে।

কণ্ঠের সৌন্দর্যের প্রতি কেন তবে প্রলয়ঙ্করী আসক্তি, কারণ খুঁজে চলেছি এখনো। কণ্ঠশিল্পীদের প্রতি তো আসক্তি বোধ করি না। যাদের বাচনিক কণ্ঠে, অর্থাৎ সাধারণ কথা-বার্তা, সৌন্দর্য আবিষ্কার করি বা করতাম কেবলমাত্র তারাই থাকে তালিকায়, যার শুরু নবশৈশব থেকেই।

গোলাম মুস্তাফা, বিপাশা হায়াত, রাজিব, সিরাজুল মজিদ মামুন, আহমেদ রুবেল, সব্যসাচী চক্রবর্তী, চিরঞ্জিত, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চ্যাটার্জি, জেমস, আসিফ, সঞ্জীব চৌধুরী – উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গকে কেউ পছন্দ করে অভিনয়, গান কিংবা সংবাদ পাঠের কারণে।

আমার আসক্তির ক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠস্বরই ছিল একমাত্র কারণ। পর্যায়ক্রমে কাজের মূল্যায়ন পরম্পরাতে কারো প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, কেউ শুধু কণ্ঠতেই থেকেছে সীমায়িত।

এমনকি, শৈশবে ইংরেজি শুনলে যখন কিছুই বুঝতাম না তখনো ক্রিকেট ম্যাচ দেখাকালে উদ্বাহু থাকতাম টনি গ্রেগ আর মাইকেল হোল্ডিংয়ের কমেন্ট্রি শুনতে। এবং অবিশ্বাস্য হলেও, যতদিন রেসলিং দেখেছি তার প্রধানতম কারণ উপস্থাপিকা লিলিয়ান গার্সিয়ার কণ্ঠ শোনা।

এদের সঙ্গে সংযোগটা রূপা গাঙ্গুলির পূর্বে। তার-পরবর্তীকালে সংযুক্তির তালিকায় ঢুকেছে অমিতাভ বচ্চন, অপর্ণা সেন, অমরেশ পুরি, টাবু, মাহিমা চৌধুরী, গার্গী রায় চৌধুরী, অঞ্জনা বসু, অমিত হাসান, এলান উইকিন্স, ইয়ান বিশপ প্রমুখ।

তবে, অত্যাশ্চর্যনীয় হলো, পূর্বাপর মিলিয়েও কেউ রূপা গাঙ্গুলির স্তরের বা মানের আসক্তি তৈরিতে বা জিইয়ে রাখতে সমর্থ হয়নি৷ টাবু বা এলান উইকিন্সের কন্ঠস্বর ভীষণ পছন্দ করি, তবে শোনার জন্য সবকিছু বিস্মৃত হই না। রূপা গাঙ্গুলির ক্ষেত্রে কেন বিদঘুঁটে ব্যতিক্রমটা ঘটলো, সময়ে-বেসময়ে অনুধাবনের চেষ্টা করেছি।

হুট করেই অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি তার সম্পর্কে। ৫০% চিনতেই পারেনি, ৪০% তাকে চিনে পদ্মানদীর মাঝি সিনেমায় কপিলা চরিত্রে অভিনয়সূত্রে, বিশেষত ইউটিউবে এই সিনেমার একটি বিশেষ ক্লিপিং গরম ভিডিও ক্যাটেগরিতে উত্তাপ ছড়ায়- রাইসুল ইসলাম আসাদের সঙ্গে ভেজা শাড়িতে পানিতে দাঁড়িয়ে কথোপকথন।

অবশিষ্ট ১০% এর কেউ কেউ তাঁর অভিনয়শৈলী এবং বোল্ডনেস এর প্রশংসা করেছে, কেউ দৈহিক সৌন্দর্যেরও তারিফ করেছে; সঙ্গে বলেছে কণ্ঠটাও সুন্দর। অর্থাৎ প্রথমত সে সুশ্রী, গলার স্বরটা বাড়তি অনুষঙ্গ!

তখনো পর্যন্ত তার মুখশ্রী আলাদাভাবে খেয়ালই করিনি। সচেতনভাবে দেখতে গিয়ে নাকের গড়নটা আলাদা মনে হলো, ইমপ্রেসনটা স্থায়ি হলোও না বেশিক্ষণ!

মাত্র এক জন (বুয়েটের ব্যাচমেট শুক্লা) জানায় সে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, আছে নিজস্ব অ্যালবাম। তথ্যটা ছিল সম্পূর্ণ অজানা, গুগলে খুঁজে গানগুলো শুনি; একদমই স্পর্শ করে না। গড়েরও নিচের মানে গায়কি।

শুক্লার সঙ্গে আলাপকাল মে-জুন, ২০১৭। মধ্যবর্তী ১৩ বছরে ব্যক্তি রূপা গাঙ্গুলী সম্বন্ধে জানার বিন্দুমাত্র কৌতূহলই বোধ করিনি। টি আর চান্নু, মেরাজ হোসেন আন্না, সিথিমা এনাম, সাত্তার এর মতো অখ্যাত অভিনয়শিল্পীদেরও বায়োগ্রাফি খুঁজতে বা পড়তে গুগলে সময় দিয়েছি, না পেয়ে গুগলকে করেছি গালমন্দ। পরিচিত সেলিব্রিটি অথবা সামাজিক সফল মানুষদের বায়োগ্রাফি পড়া তো পুরনো অভ্যাস, অথচ যার কণ্ঠে নিমজ্জিত রয়েছি ১৩ বছর, গুগলে কস্মিনকালেও খুঁজিনি তাকে।

কেন খুঁজিনি বলতে পারবো না। সম্ভবত নিজস্ব কল্পনায় তার একটি প্রতিমূর্তি তৈরি করে নিয়েছিলাম, অনেক বেশি বাস্তব তথ্য যোগাড় হলে নির্মাণকাযে ব্যাঘাত ঘটতে পারতো। এটা ধারণা মাত্র, উপলব্ধি নয়।

সর্বশেষ ৩ বছর ধরে গুগল আর ইউটিউবসূত্রে পাওয়া তথ্যে তার ব্যক্তিসত্তা বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যদিও এখানকার তথ্যগুলো মেকআপ দিয়ে মূল চেহারা ঢেকে রাখার মতোই ফ্যাব্রিকেটেড। মেকআপশোভিত এসব তথ্যকে সাজালে যা যা পাই- তিনি পড়াশোনা করেছেন গণিত এবং অর্থনীতিতে। গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত অভিনয়ে আগ্রহ জাগেনি। ঘটনাক্রমে টিভিতে অভিনয়খড়ি ঘটে ৮০ এর দশকের মাঝামাঝিতে, সেই ধারাবাহিকতায় সুযোগ পেয়ে যান মহাভারত সিরিয়ালে। দ্রৌপদী চরিত্রটি পান। এটা তার ক্যারিয়ারের বৃহত্তম ব্রেকথ্রু, ২০১৮ পর্যন্ত জানতামই না।

ধ্রুব ঘোষ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে সংসারীভূত হন ১৯৯২ তে, ১৯৯৭ তে তাদের পুত্রসন্তান আকাশ পৃথিবী দেখে। সংসারে বনিবনা না হওয়ায় ৩ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে নিজে দাবি করেন। বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিব্যেন্দু মুখার্জি নামের এক জুনিয়র মিউশিয়ানের সঙ্গে লিভ টুগেদার করেন কয়েক বছর। এক পর্যায়ে সেই সম্পর্কটারও ইতি ঘটে।

২০১৫ তে অভিনয় ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন, এবং রাজ্যসভার সদস্য হন। ক্রিকেটার এবং ফিল্মস্টারদের, ইমেজ বা জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে, রাজনীতিতে নামা ভারত ভূখণ্ডে খুবই চলতি চর্চা। এক্ষেত্রে আমার অবশ্য ভিন্ন একটা মতামত রয়েছে। ২০১৫ তে যে অভিনেত্রীর বয়স ৫০, এবং যিনি শুরু করেছেন ২০-২২ এ, ৩০ বছর একটা কাজ করে কেউ একজন অবসর নিতেই পারে।

শচীন টেন্ডুলকারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার ২৪ বছর, রূপার অভিনয় ক্যারিয়ার তো তার চাইতেও বেশি। সৌমিত্র চ্যাটার্জির মতো আমৃত্যু অভিনয় করার ক্ষুধা কারো কারো না থাকলেই তার নিবেদনকে বক্রদৃষ্টিতে বীক্ষণ করা যায় কিনা সেই প্রশ্ন অমূলক নয়। দেব, নুসরাত কিংবা মিমি চক্রবর্তীর মতো সমকালীন আর্টিস্টদের ক্ষমতার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া আর ৫০ এ পৌঁছে, ৩০ বছর অভিনয় শেষে, অবসর নেয়া দুটো পৃথক ব্যাপার। তাছাড়া অস্থিরমতি ব্যক্তিসত্তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই উলম্ফন একটি ভ্যালিড সূচক।

বিতর্কিত মন্তব্য করে প্রায়শই শিরোনামে আসেন। এনআরসি ইস্যুতে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ থেকে বোরখা পরে পালিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন’। সুশান্ত রাজপুত এর আত্মহত্যাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেছেন। ধর্ষণ বিষয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে প্রখ্যাত গায়ক কবির সুমনের রোষানলে পড়েন। ২০১৬ তে প্রতিপক্ষের হাতে প্রহৃত হন, যে সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন- ১৯৮৮ তে দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম, তখনও কি জানতাম ২৮ বছর পরে দ্রৌপদীর ভাগ্য বরণ করতে হবে?- প্রতিবাদী এক তরুণীকে মারতে উদ্যত হওয়ার ভিডিও ইউটিউব খুললেই চোখে পড়বে। এছাড়া মমতা ব্যানার্জির প্রতি তীর্যক মন্তব্যে কমতি থাকে না। অর্থাৎ ৩০ বছর অভিনয় করে গুগলে যতটুকু জায়গা পেয়েছেন মাত্র ৫ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার বরাদ্দ বেশি।

‘অবশেষে’ সিনেমায় গান গাওয়ার জন্য পুরস্কারপ্রাপ্তি ঘটেছে। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তার পুত্রের গ্রেফতার হওয়াটাও শিরোনাম।

এসব কসমেটিকাল তথ্য পরিভ্রমণকালে হঠাৎ দুটো প্রশ্ন জাগে।

  • প্রশ্ন ১

প্যারালেল বা সমান্তরাল বলতে যেসব সিনেমা চলে সেখানে রূপা গাঙ্গুলীকে ছাঁচে ফেলা ক্ষ্যাপাটে ধরনের চরিত্রই কেন দেয়া হয়? ‘শূন্য এ বুকে’ নামে ইটিভিতে এক লেটনাইট টেলিছবি দেখেছিলাম, যেখানে নববধূর একটি স্তন না থাকায় স্বামী প্রত্যাখ্যান করে। এক দৃশ্যে রূপা গাঙ্গুলির সংলাপ- ‘মেয়েরা কি ছেলেদের জিপার খুলে দেখতে চায় সাইজটা চলবে কিনা।’

  • প্রশ্ন ২

নায়কের চাইতেও অধিকাংশ সিনেমায় তার চরিত্রের গুরুত্ব বেশি মনে হয়। এটা তার কণ্ঠের প্রতি ব্যক্তিগত নিখাদ অন্ধত্বের কারণে শুধু একা আমার মনে হওয়া, নাকি এটাই ফ্যাক্ট? হলে কেন? ‘এক মুঠো ছবি’ নামের কয়েকটি পৃথক শর্টফিল্মের একটিতে তার চরিত্রের সংলাপ ছিল বিক্রম ঘোষের প্রতি –‘আপনি কি ভেবেছেন আমার ইগো স্যাটিসফাই করে পার পেয়ে যাবেন?’-খুবই সরল-সাদামাটা সংলাপ, কিন্তু বলার ভঙ্গিমাটা চোখে আর কানে সমণ্বিত আলোড়ন জাগায়।

কিন্তু, প্রশ্ন দুটোর সম্ভাব্য অনুমান তৈরির কোনো কাঁচামাল পাচ্ছিলাম না। অবশেষে গত সপ্তাহে ইউটিউবে একটি সাক্ষাৎকার খুঁজে পেলাম। অঞ্জন দত্ত ট্রাভেল শো এর ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে আলাপ করেছেন। সেই আলাপের তাৎপর্যপূর্ণ কিছু বক্তব্য তুলে দেয়া যেতে পারে – ‘আমার জ্যাঠা সবসময় বলতেন তুমি একটা ছেলে। আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম, এবং সেভাবেই বড়ো হয়েছি।’

কলকাতায় আমার সবচাইতে ছোটবেলার স্মৃতি হলো 41/1/A নম্বর বাসে কয়েক কিলো দূরের নানীবাড়ি গিয়েছিলাম। তখন মাত্র ক্লাস থ্রিতে পড়ি। কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি। (বাসের নম্বরটা শোনার পর থেকেই মাথার ভেতরে স্ক্যানিং চলতে থাকে)

কোনো দৃশ্যে অভিনয় করতেই সমস্যা নেই যদি ডিরেক্টরের প্রতি বিশ্বাস থাকে। আমি রাস্তায় অনেকবার ড্রাইভারদের কলার চেপে ঠাস-ঠুস মেরে দিয়েছি উল্টোপাল্টা করলে। মেয়ে বলে যা ইচ্ছা করবে নাকি।

আমি অহংকারী নই, তবে আমাকে দেখতে অহংকারী লাগে। যা মনে আসে বলে দিই, অন্যায় একেবারেই সহ্য করতে পারি না, মন রক্ষা করে কথাও বলি না। আমি যে সবসময় ঠিক বলি তাও না, তবে যখন বুঝতে পারি ভুল বলেছি বা অন্যায় করেছি সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে নিই।

তিনি যেখানে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন, যাদের সঙ্গে মিশেছেন বা ছাত্রজীবনে কীভাবে চিন্তা করতেন – সেসব অনুসন্ধিৎসার যথার্থ জবাব খুঁজে পাবো না, সম্ভবত কখনোই নয়। কল্পনায় তৈরি করে নিতে হবে। তবে, এতগুলো বছর পেরিয়েও এখনো বুঝে উঠতে পারিনি রূপা গাঙ্গুলির কণ্ঠের মাদকতায় স্বতন্ত্র কোন উপকরণ রয়েছে যা পাইনি অন্যদের মাঝে। বেশ কয়েক বছর পূর্বে সহমানুষ আরিফাকে তার একটি ক্লিপিংস দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেমন কণ্ঠটা? তার উত্তরে উথলে উঠে নিরাসক্তি- ‘খুব ভারি আর কিছুটা কর্কশ। আহামরি কিছু তো মনে হচ্ছে না’।

মাঝে চিন্তা করেছিলাম তার ইমেইল সংগ্রহ করে নিজের কণ্ঠস্বর সম্বন্ধে ধারণা জানতে চেয়ে ইমেইল করবো, শুধুমাত্র কণ্ঠস্বর বিষয়েই ইমেইল ইন্টারভিউ নিব। চিন্তার মেরিটশূন্যতায় হতোদ্যম হয়ে পড়ি।

প্রথমত, তার ইমেইল পাবো কোথায়, যদি পাইও ইমেইল পড়ার আগ্রহ তিনি কেন বোধ করবেন? দ্বিতীয়ত, যদি পড়েনও লিখে লিখে উত্তর পাঠাবেন, এটা অনেক বেশি ফ্যান্টাসি ফিকশনের প্লট হয়ে যাচ্ছে না?

আমরা তো বসবাস করি পৃথক দুই বিশ্বে। হোয়াটসঅ্যাপ, জুম বা টুইটারের কারণে যে কারো সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাব্যতা বেড়ে গেছে আগের চাইতে। ৫৫ পেরুনো একজন প্রক্সি রাজনীতিবিদ নিজের কণ্ঠ বিষয়ে কী ভাবেন এ তো মাত্র ২ মিনিটেই বলে দিতে পারবেন, একটিমাত্র বিষয়ে ২ হাজার মিনিট আলাপ হতে পারে – সেই উজবুকি চিন্তার পার্থিব মূল্য যদি কোনো মুদ্রা দিয়ে পরিশোধ করতে হয় তার নাম হবে ‘অপ্রকৃতিস্থতা’!

এবং কল্পনার কৃপা কিংবা মন্ত্রমুগ্ধতার ক্ষমতাটাও এখানেই। কণ্ঠকেন্দ্রিক যে গভীর এবং অনিয়ন্ত্রিত অবসেসন, একে ক্রমাগত পরিশীলিত করতে থাকলে জন্ম নিতেই পারে অ্যাবসার্ড কোনো ফিকশন!

একজন ছদ্মচিন্তক, ভঙ্গুরমনা প্রক্সি লেখক এবং একরৈখিক মানুষের কণ্ঠ সংক্রান্ত ভ্রমের শ্রেষ্ঠ উপযোগ নিঃসরণ উপায় কী আর হতে পারে! এবং সে কারণেই ৫০-পূর্ব রূপা গাঙ্গুলি বিষয়ে অন্তত ১০০ জন মানুষের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন শোনার তাড়না বোধ করছি। কোথায় পাবো? -‌ ‘ঢ্যামনাগিরি রেখে খুঁজতে থাকো!’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।