মেসি উত্তম বলিয়া রোনালদো অধম হইবেন কেন!

ফুটবলার হিসেবে রোনালদোর মাহাত্ম্য নিয়ে সামান্য প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। আপনার অন্য খেলোয়াড় পছন্দ হতে পারে, অন্য স্টাইলের ফুটবল ভাল লাগতে পারে, কিন্তু রোনালদো আপনাকে নিশ্চিতভাবে অবাক করবে, তার ফুটবল কারিশমা আপনাকে আনন্দ দেবে। এটা এখন আর গোপন কিছু না যে রোনালদো নিজেকে সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের ছোট তালিকার একজন হিসেবে প্রমাণ করে ফেলেছেন।

মাঠে আপনি একজন ফুটবলারের কাছ থেকে কি চান? গোল নাকি অ্যাসিস্ট, নাকি রক্ষণ সামলানো । আসলে আপনি এর সবই চান কারণ এর সবই প্রয়োজন জয়ের জন্য, অন্য কিছুর জন্য না। কে সেরা ফুটবলার সেটা তার স্কিল, মাঠে স্কিলের সঠিক ব্যাবহার, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেটা ব্যাবহারে তিনি কতটুকু সফল, দলের জয়ে সেটার কতটা ভূমিকা আছে এবং সে কাজে তিনি কতটা ধারাবাহিক – এই কয়টা ব্যাপারের উপর নির্ভর করে। এর কোনটা থেকে আপনি বিচ্যুত হবেন, আপনাকে পিছিয়ে পড়তে হবে।

রোনালদো পিছিয়ে পড়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার প্রথম চার বছর রোনালদোর স্কিলের সঠিক ব্যবহার হলেও সেটা সঠিক সময়ে কাজে আসেনি কিংবা জয় এনে দেয় নি । কিন্তু যখনই তার স্কিলগুলা দলের গুরুত্বপূর্ণ জয়ে অবদান রাখা শুরু করলো তখনই রোনালদো ‘ব্যাক ইন বিজনেস’, কারণ রোনালদো ধারাবাহিকভাবে সেটা করছেন।

রোনালদোকে নিয়ে সংশয়ই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কারণ, তিনি প্রতিটা সন্দেহের জবাব এক-এক করে দিচ্ছেন। তুরিনের দর্শকরা এসেছিল তাদের দলের জয় দেখতে, তাঁরা ভেবেছিল মাদ্রিদের দলকে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের প্রতিশোধ নিবে। ঠিক এক বছর আগে নিজেদের মাঠে তারা আরেক স্প্যানিশ জায়ান্টকে পাত্তাই দেয়নি , এবারো তেমন কিছু হবে।

ঘরের মাঠে তারা কত ম্যাচ অপরাজিত সেটা গুনতে ক্যালকুলেটর লাগবে। সুতরাং তারা জিতবে। রোনালদোর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের গোলগুলা ফ্লুক হিসেবে প্রমাণ হবে, তারা ফাইনাল হারার ব্যাথাটা ভুলে তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে মিছিল করতে করতে। কারণ, তাঁরা জানে যেখানে মেসির মতো খেলোয়াড় যেখানে কোন স্পেস পায়নি তাদের দলের সামনে , এতো রোনালদো!

খেলা শুরু হতে না হতেই তাদের সংশয় সত্য হলো, ট্যাপ-ইন করেই গোল দিলেন রোনালদো। কিন্তু টেলিভিশন রিপ্লেতে বুঝা গেল গোলটা যদি শুধু ট্যাপ-ইন এরই ব্যাপার হতো তাহলে ওই গোলটা ছিল বেনজেমার। ব্যাপারটা যদি শুধু ট্যাপ-ইন ই হতো তাহলে প্রথমার্ধে দিবালা কিংবা হিগুয়েনও স্কোরশিটে থাকতো। প্রথমার্ধে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পায়নি জুভেন্টাস। সময়ের সাথে সাথে দর্শকরা হয়তো উপলব্ধি করে যে তাদের একটা রোনালদো থাকলে অন্তত একটা গোল হতো।

দ্বিতীয়ার্ধে যখন তুরিনবাসী একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় ঠিক তখনই রোনালদোর তীর এসে বিধলো আবারো। এমন কিছু দেখার জন্য স্টেডিয়ামের কেউ প্রস্তুত ছিলনা। এমন কি রোনালদোও না। বাইসাইকেল কিকটা নেয়ার পরও মাটিতে পড়ে পিছন ফিরে দেখলেন গোল হয়েছে কিনা। এরপর উঠলেন, কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে গেলেন উদযাপন করবেন বলে, সতীর্থরাও ভ্রম কাটিয়ে আসলেন পিছনে।

কিন্তু, রোনালদো গ্যালারির দিকে তাকানোর পর অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর গোলটা এতটাই অনাকাঙ্খিত ছিল যে জুভেন্তাস ফ্যানদের রোনালদোর উপর সংশয় মুহুর্তেই কেটে গেল। আরে, এটাইতো খেলোয়াড়! দলের যখন প্রয়োজন তখন এসে হাজির হোন বিশৃঙ্খল জটলার মধ্য থেকে ত্রাতার ভূমিকায়। জুভেন্টাস ফ্যানরা যাকে খুঁজছিল সারা মাঠ জুড়ে তিনি দুর্ভাগ্যক্রমে প্রতিপক্ষের জার্সি গায়ে খেলছেন। কিন্তু তাতে কি ? যোগ্য লোককে সম্মান দিতে হবে। কারণ সেই সম্মানটা রোনালদোর প্রাপ্য।

তাঁদের করতালি রোনালদোর উদযাপনের মাত্রা কমিয়ে দিল। প্রচণ্ড দাবদাহে যেন বৃষ্টির ছোঁয়ার মতো করে শান্ত করে দিল রোনালদোকে। খেলোয়াড় হিসেবে এর চেয়ে বেশি কিছু কি চাওয়ার আছে রোনালদোর? প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে এরকম সম্মান খুব কম খেলোয়াড়ই পেয়েছেন। যারা পেয়েছেন তারাও সাধারণ কেউ নন। তবে কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে – তিনি তৃতীয় রোনালদো যিনি প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে এমন সম্মান কুড়িয়েছেন । আসলে সব রোনালদো নামটার সাথে ‘গ্রেটেস্ট’ শব্দতা আসতেই হবে ।

রোনালদো বুঝলেন সম্মানটা ফেরত দিতে হবে । নম্রতার সাথে দু’হাত একসাথে করে ক্ষমা চাইলেন। বুকে হাত রেখে বুঝালেন – তোমাদের হৃদস্পন্দন আর আমার হৃদস্পন্দন এক। দর্শকদের হাততালি দীর্ঘ হল। তারা আবারো উপলব্ধি করলো – ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো শুধু মহান একজন খেলোয়াড়ই নন, একজন মহৎ মানুষও বটে। ধন্যবাদ সিআর সেভেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।