রোনালদিনহোর পাগলাটে ১২ মিনিট

১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম আসর। এরপর আরো উনিশবার দেখা হয়েছে ফুটবলের মহা আসর। এই বিশ আসরে মোট ম্যাচ হয়েছে ৮৩৬ টি। এই ম্যাচগুলোর মধ্যে কিছু বিশেষ ম্যাচ আছে যেগুলো গুরুত্ব, ম্যাচেত ফলাফল এবং মাঠে দুইদলের অসাধারণ ফুটবলের জন্য এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে। এগুলাকে বিশ্বকাপ ফুটবলের ক্ল্যাসিক ম্যাচ বলা হয়। এখানে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের কিছু উল্লেখযোগ্য ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করবো। আপনাদের সামনে তোলে ধরব কিছু অমর ম্যাচের গল্প।

বিশ্বকাপ ক্ল্যাসিক ম্যাচ (২০০২) – ব্রাজিল বনাম ইংল্যান্ড

তার ফ্রিকিকটা কি সত্যিকারভাবেই গোলের উদ্দেশ্যেই ছিল? নাকি ক্রস করতে গিয়ে সৌভাগ্যবশত গোল হয়েছে। সেই ফ্রিকিক গোলটা নিয়ে আজো প্রশ্ন করে থাকেন অনেক ফুটবল সমালোচক কিন্তু সব অমর কৃতিত্বই কি এমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়না? সেটা যাইহোক, আপনি গোলটা যে কোণ থেকেই দেখেননা কেন আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেননা রোনালদিনহো গোল করার উদ্দেশ্যে বলটি বাতাসে ভাসাননি। আরো কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায় এই ম্যাচ নিয়ে, অসাধারণ এই ফ্রিকিক গোলটা না হলে কি হতো? কিংবা গোলকিপার সিমেন যদি আরেকটু পিছনে থাকতেন?

যে যেটাই ভাবুক, ২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে একজন উদীয়মান তারকার জন্ম হয়েছিল বিশ্বমঞ্চে যে কিনা ঠিক করে দিয়েছিল একটি বিশ্বকাপ ক্ল্যাসিক ম্যাচের গতিপথ। দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াইয়ে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ছিল পিছিয়ে পড়েও ফিরে আসার গল্প এবং অনেকগুলো ‘যদি, কিন্তু’ প্রশ্ন।

  • পেছনের গল্প

১৯৭০ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম মুখোমুখি ব্রাজিল আর ইংল্যান্ড। একদিকে আছে ফুটবলের উদ্ভাবক, আরেকদিকে ফুটবলকে যারা ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ তকমা এনে দিয়েছে। এমন দুই দলের মাঠের যুদ্ধ ঐতিকাসিক কিছু নিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক, ১৯৭০ এর মতো ২০০২ ও উপহার দেয় জমজমাট একটি লড়াই। যে হারবে তাকে ধরতে এয়ারপোর্টের বাস, আর বাকি দল যাবে সেমিফাইনালের টিকেট।

আগের নকাউট ম্যাচে স্কলারির ব্রাজিল হারিয়ে এসেছে পরিশ্রমী দল হিসেবে পরিচিত বেলজিয়ামকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল ডেনমার্ক। পরাশক্তি না হলেও ইউরোপের যেকোন মধ্যম সারীর দলই বড় দলের জন্য ভুগান্তির কারণ, তবে দুই দলই সেই বাধা পেরিয়ে এসেছে বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে।

  • ম্যাচের গল্প

৪৭০০০ এর বেশি সৌভাগ্যবান দর্শকে ঠাসা জাপানের সিজুকা স্টেডিয়াম। অপেক্ষা রোনালদো ব্যাকহামদের ফুটবল দর্শনের।

দুইদলই বিপদ এড়িয়ে খেলার চেষ্টাই ছিল, ব্রাজিল ডমিনেট করছিল। এর মধ্যেই ২৩ মিনিটের মাথায় গোল হজম করে ব্রাজিল। এমিল হেস্কি মাঝমাঠে হঠাত ফাঁকায় বল পেলে থ্রু বল বাড়িয়ে দেয় ওয়েন উদ্দেশ্যে। সেখানে তাকে মার্ক করছিল লুসিও, কিন্তু বলের এঙ্গেল ধরতে ভুল করায় তার পা থেকে বল চলে যায় ওয়েনের কাছে। লিভারপুল তারকার সামনে শুধু গোলকিপার। লুসিও প্রার্থনারত, ওয়েন যদি কোন ভুল করে বসে। কিন্তু বড় মঞ্চে ওয়েন যে ভুল করার পাত্র না।

ইংল্যান্ড ১-০ ব্রাজিল। খেলা জমে গেল। ইংল্যান্ডের প্রথম ছুবলের জবাব কিভাবে দিবে ব্রাজিল, কিংবা আদৌ কি পারবে?

ব্রাজিলের সমতাসূচক গোল আসে শক্তিশালী একটা কাউন্টার এটাক থেকে – প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে। বাম প্রান্তে ব্যাকহামের কাছ থেকে বল নিতে সক্ষম হোন রকি জুনিয়র, বল বাড়িয়ে দেন মাঝমাঠে যেখানে পউল স্কোলসকে পরাস্ত করেন ক্লেবারসন। বল চলে যায় রোনালদিনহোর পায়ে। দুরন্ত গতিতে ছটলেন ২২ বছর বয়সি রোনালদিনহো। দুইবার স্টেপওভারে ছিটকে ফেলে দিলেন এশলে কোলকে। সামনে দুই সেন্টারব্যাক, বামে রোনালদো, ডানে রিভালদো। রোনালদিমহো বেছে নেনে রিভালদোকে, আর আস্থার প্রতিদান দিতেও ভুল করেন নি বার্সা তারকা। তার বাম পায়ের দুর্দান্ত ফিনিশ সমতায় এসে দেয় ব্রাজিলকে।

ইংল্যান্ড ১-১ ব্রাজিলে, এই স্কোরলাইন নিয়ে হাফটাইমে যায় দুইদল। সমতা নিয়ে খেলা শুরু হলেও আগের হাফের শেষ মিনিটে গোল দিয়ে যেন ব্রাজিল একটু বেশি উজ্জীবিত। অন্যদিকে ইংলিশ মিডফিল্ডকে ক্লান্ত মনে হচ্ছিল, অন্তত ইংল্যান্ড বস এরিকসেন এর তাই মনে হয়েছে।

মাঝমাঠে বল ধরে রাখতে না পারার ফলস্বরুপ গোলপোস্টের প্রায় ৩৫ গজ দূরে স্কোলস ফাউল করেন ক্লেবারসনকে। ফ্রিকিকে আসেন রোনালদিনহো, তার পাশে ছিলেন অধিনায়ক কাফু। ইংল্যান্ড গোলের সামনে প্লেয়ারদের জটলা। গোলকিপার সিমেনও একটু সামনে আসেন, তারও অপেক্ষা রোনালদিনহোর ক্রসের। কিন্তু সবাইকে বোকা বানিয়ে বলটি সবার মাথার উপর দিয়ে চলে যায় টপ কর্ণার দিয়ে জালে। রোনালদিনহোর ভাসানো বলটার হাইট এমন ছিল যে সেটা ঠেকানোর কোন বুদ্ধি ইংল্যান্ড গোলকিপারের ছিলনা। ফলাফল ব্রাজিল ২-১ এ এগিয়ে গেল ম্যাচে।

এরপর ইংল্যান্ড অনেক চেষ্টা করেও ম্যাচে ফিরতে পারেনি। ওই গোলের সাত মিনিট পর রোনালদিনহো বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। কিন্তু দশজনের ব্রাজিল পেয়েও সেটার সুবিধা নিতে পারেনি ইংল্যান্ড। অনেকের মতে বল ধরে রাখতে না পারার জন্য ইংল্যান্ড ম্যাচটিতে ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে অনবদ্য ফুটবল প্রদর্শনী উপহার দিয়ে নায়ক বনে যান রোনালদিনহো। এই জয়ের হাত ধরে ব্রাজিল পরবর্তিতে ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

  • প্রতিক্রিয়া

‘আমি কতবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি তা গুনে শেষ কররে পারবোনা। কিন্তু আমার উত্তর একটাই – আমি গোল করার জন্যই শট নিয়েছিলাম। ফ্রিকিক নেয়ার আগে আমি আর কাফু ওদের গোলকিপারের সামনে এগিয়ে আসা নিয়ে কথা বলেছি। এটা ঠিক যে, আমি অতোটা সূক্ষ্মভাবে হিসেব করে শট নি নাই, কিন্তু অবশ্যই আমি গোল করার উদ্দেশ্যেই শট নিয়েছি।’

– ম্যাচের নায়ক রোনালদিনহো।

‘সিমেন একটু বেশি হতাশ হয়ে পড়েছিল। আমি ওর সাথে ড্রেসিংরুমে কথা বলেছি, অন্তত চেষ্টা করেছি, কিন্তু মনে হয়না সে কিছু শুনেছে। আমি হোটেলেও তাকে বলতে চেয়েছি – তুমি যদি সেই গোলটা মাথা থেকে ঝাড়তে না পারো তাহলে তুমি শেষ হয়ে যাবে, তুমি আমাদের অনেক ম্যাচই জিতিয়েছো।’

– সেভেন গোরান এরিকসন, ইংল্যান্ড কোচ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।