আমি পাল্টাইনি, পাল্টেছে শুধু আমাকে ঘিরে মানুষের ধারণা: রজার মিলা

অবসরে চলে যাওয়া একজন খেলোয়াড়, দেশের প্রেসিডেন্টের ফোনকলে সাড়া দিয়ে, বিশ্বকাপ একাদশে নাম লিখিয়ে, বেঞ্চে থেকে মাঠে নেমে দলকে জিতিয়ে ফিরলেন। এমন দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসে  নেই বললেই চলে। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। বলছি ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন জাতীয় ফুটবল দলের রজার মিলার কথা।

বিশ্বকাপ দল নির্বাচনের আগে তখন রিইউনিয়ন দ্বীপে শান্তিতে অবসর কাটাচ্ছেন সমপ্রতি জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়া রজার মিলা। হঠাৎ স্বয়ং রাষ্ট্রপতির ফোন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে অবসরে থাকা মিলাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে দেখতে চান তিনি। রাষ্ট্রপতির অনুরোধ কি আর ফেরানো যায়!

বিশ্বকাপের মাঠে যেন নতুন করে নিজেকে ফিরে পেলেন রজার। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে তাকে মাঠে নামানো হলে দুই গোল করে নিজেদের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ করে নিলো এবং তার কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের জোড়া গোল দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে।

কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে বাড়ি ফিরতে হয়। সেবার টুর্নামেন্ট জুড়েই নজর কেড়েছিলেন রজার। বিশেষ করে গোল করার পর নেচে নেচে তার উদযাপনটাও ছিল বেশ আকর্ষণীয়। ফুটবল বিষয়ক গণমাধ্যম ফোরফোরটু-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রজার মিলার স্মৃতিচারণা করেছেন সেই বিশ্বকাপের।

৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপের আগে তো আপনি লম্বা ছুটিতে চলে গিয়েছিলেন রিইউনিয়ন দ্বীপে…

আসলে আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমি ফ্রান্সে পেশাদার ফুটবল খেলতে খেলতে তখন হাঁপিয়ে উঠছিলাম। রিইউনিয়ন দ্বীপে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতে চলে গিয়েছিলাম। শেষ নয় মাসে কেবল একটা স্থানীয় ফুটবল দলের সাথে একটা ম্যাচ খেলা হয়েছিল।

সেখান থেকে ক্যামেরুনের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ মিললো কি করে?

বিশ্বকাপের মাস ছয়েক আগে ক্যামেরুন গিয়েছিলাম। থিওপাইল আবেগার সাথে আমার কথা হয় (১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে মিলার সতীর্থ)। মানুষ তখন আমাকে প্রশ্ন করতো, কেন এত আগে-ভাগে অবসর নিয়ে ফেললাম। এরপর রাষ্ট্রপতিও অনুরোধ করলো।

আপনার পা কি বিশ্বকাপে খেলার জন্য প্রস্তুত ছিল?

সত্যি কথা বলতে, প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু, ফুটবল তো আর পুরোটাই শরীরের খেলা হয়। আমি সবসময়ই খুব বুদ্ধিদীপ্ত একজন ফুটবলার ছিলাম। তাই আমার ধারণা ছিল একবার শরীরটা ফিরে পেলেই আমার ভালো করার সুযোগ থাকবে। প্রথমে ফিট হওয়ার লক্ষ্যে নিয়ে এগিয়েছি, বাকি সিদ্ধান্তটা ছেড়ে দিয়েছিলাম কোচের ওপর।

তৎকালীন কোচ ভ্যালেরি নেপোমনিয়াচির ওপর কি আপনাকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের কোনো চাপ ছিল?

তা তো ছিলই। আমি তো তখন খেলাই ছেড়ে দিয়েছি। আমাকে ফিটনেস ফিরে পেতে অনেক কষ্টদায়ক আর কঠিন অনুশীলনের মধ্য দিয়েছে। ভাগ্য ভালো যে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রীতি ম্যাচগুলোতে আমি সেরা খেলোয়াড় ছিলাম। ফলে কোচের মন জিতে নেওয়াটা সহজ হয়েছে।

প্রথম ম্যাচেই আপনারা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা কি ফ্লুক ছিল, নাকি ম্যাচ শুরুর আগেই আশা করেছিলেন যে জিততে পারেন?

হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা আশাবাদী ছিলাম। আমরা জানতাম বিশ্বকাপটা ভালো কাটাতে হলে একটা ভালো সূচনা খুবই জরুরি। আমাদের মূল পরিকল্পনা ছিল, ম্যারাডোনাকে আটকানো। আমরা জানতাম, ওকে আটকাতে পারলেই কেবল আমাদের সুযোগ থাকবে।

জয়ের পর পার্টিটা কেমন জমেছিল?

না না, কোনো পার্টি হয়নি। আমরা দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য নিজেদের মনোযোগ ঘুরিয়ে নেই।  আমরা জানতাম রোমানিয়াকে হারাতে পারলেই আমরা দ্বিতীয় পর্বে চলে যাবো।

রোমানিয়ার বিপক্ষে দু’টো গোলই করেন আপনি। যদিও আপনি অনেক পরিশ্রম করেছিলেন, তারপরও কি ৩৮ বছর বয়সে এমন পারফরম্যান্স কি আপনার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিল ?

একটু বিস্ময়কর তো বটেই। যোগ্যতা বা টেকনিক্যালি কতটা ভালো আমি ছিলাম, সেটা জানি। তবে শারীরিকভাবে অবশ্যই এটা বড় বিস্ময় ছিল।

রোমানিয়ার বিপক্ষে গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে নেচে নেচে উদযাপন করেছিলেন। বিষয়টা পূর্বপরিকল্পিত ছিল?

না, ওটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত একটা উদযাপন। আগে কখনো ওটা করিনি, অনুশীলনেও নয়।

দ্বিতীয় পর্বে আপনি কলম্বিয়ার গোলরক্ষক রেনে হিগুইতার কাছ থেকে বলটা অনেকটা ছিনিয়ে নিয়ে গোল করেন। এটা কি পূর্বপরিকল্পিত?

আমি খুবই ভাগ্যবান যে আমি কলম্বিয়ার অধিনায়ক কার্লোস ভালদেরামার সাথে মন্তপেলিয়ারে খেলেছি। আমাদের দলটা দারুণ ছিল। দলে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জুলিও সিজার, তরুণ লরেন্ত ব্ল্যাঙ্করা ছিল। ভালদেরামার সৌজন্যে আমার হিগুইতার ভিডিও দেখার সুযোগ হয়। আমি দেখেছিলাম, ও জায়গা ছেড়ে দিয়ে ড্রিবলিং করে। আমি জানতাম, যদি ক্ষিপ্রতার সাথে কিছু করতে পারি তাহলে ওর ভুলের সুযোগটা নিতে পারবো। বিষয়টা কাজ করে যায়।

তাহলে ভালদেরামা আপনাকে ভিডিও দেখিয়ে ভুলই করেছিলেন?

হা হা… নিঃসন্দেহে!

কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আপনার ৩-২ ব্যবধানে হেরে যান। যদিও একটা সময় ২-১ গোলে এগিয়ে ছিলেন। আপনি কি মনে করেন, বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল?

এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেখলে তাই মনে হয়। আমরা ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিলাম। এরপর ডি বক্সে পল গ্যাসকোয়েন একটা ফাউল করেন। ইমানুয়েল কুন্ডে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। এরপর ইউজেনে একেকে  আমাদেরন ২-১ গোলে এগিয়ে নেন। আমরা এগিয়ে গিয়ে খেলছিলাম, দর্শকরাও আমাদের উত্সাহ যোগাচ্ছিল। ফুটবল ছিল আমাদের বড় বিনোদন, অবশ্যই আমরা জয়ই চাইছিলাম। কিন্তু সেটা হয়নি।

হারের পর ক্যামেরুনের ড্রেসিংরুমের চেহারাটা কেমন ছিল?

আমরা আনন্দিতই ছিলাম। হ্যাঁ, ইংল্যান্ডের কাছে আমরা হেরেছিলাম, তবুও এটা ভেবে গর্বিত ছিলাম যে আমরা দারুণ একটা টুর্নামেন্ট কাটিয়েছি। ১৯৯০ বিশ্বকাপটা আমাদের জীবনের চিরস্মরণীয় এক অধ্যায়। এই স্মৃতি কখনোই ভুলবো না।

বিশ্বকাপের পর তো নিশ্চয়ই পার্টি হয়েছিল। দেশে ফিরে কেমন উদযাপন হয়েছিল?

সামরিক বাহিনীর বাহনে করে ইয়াওন্ডেতে আমাদের নিয়ে আসা হয়। হাজার হাজার মানুষ আমাদের বরণ করে নেয়। এটা ছিল দারুণ একটা অভিজ্ঞতা।

আপনি তো ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও খেলেছিলেন। ৪২ বছর বয়সে গোলও করেন। ওই বয়সে কেন খেললেন?

ওটা ছিল ক্যামেরুনের জনগণের দাবি। ওরাই আমাকে খেলতে বাধ্য করে। ওরা ভেবেছিল, একমাত্র আমিই গোল করতে জানি। ওদের অন্য কোনো খেলোয়াড়ের ওপর ভরসা ছিল না। তখন আমি টোন্নেরে ইয়াওন্ডের হয়ে খেলি। ফলে ফিটনেসের কোনো সমস্যা ছিল না। আর আত্মবিশ্বাস? সে আর বলতে!

১৯৯০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচ নিয়ে কি পরে কোনো ইংলিশ খেলোয়াড়ের সাথে কথা হয়েছে?

শুধু পল গ্যাসকোয়েনের সাথে হয়েছে। একটা প্রদর্শনী ম্যাচে ওর সাথে গ্রিসে দেখা হয়েছিল। ওই সময়ই অল্প সময়ের জন্য ওর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়।

১৯৯০ বিশ্বকাপের পর কি আপনার জীবনটা একদম পাল্টে গেছে?

না, একদমই না। বিশ্বকাপ খেলার পর বুঝতে পেরেছিলাম, সমর্থকদের ওপর আমরা কতটা প্রভাব রাখতে পারি। তবে, আমি পাল্টাইনি, পাল্টেছে শুধু আমাকে ঘিরে মানুষের ধারণা। আমি একই আছে, এখনো সাদামাটা জীবন যাপনই করছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।