বাংলাদেশে হেভি মেটালের আগমন ও ‘রকস্টারটা’র সংগ্রাম

১৯৮৬ সাল। নটরডেম কলেজের মঞ্চে উঠলো সেই কলেজের ছাত্রদের নিয়ে গড়া একটা ব্যান্ড। মঞ্চে ওঠা বলতে উঠে কেবল জ্যামিংটা শুরু করেছে। ঠিক তখনই হুড়মুড় করে ছুটে এলেন কলেজের তখনকার অধ্যক্ষ জোসেফ এস পিশাতো। কোনোভাবেই তিনি এই ছেলেপুলেদের পারফরম করতে দেবেন না। দেবেনই বা কেন, এমন সঙ্গীত তিনি তখনকার বাংলাদেশে বাস কেউই সামনাসামনি শোনেনি।

হ্যা, ঠিক এভাবেই বাংলাদেশে হেভি মেটাল ঘরানার সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর কাণ্ডারী সেই ব্যান্ডটা হল রকস্টারটা। তখন ব্যান্ডটার বয়স মোটে এক বছর। ৮৬-তে নটরডেমের সেই শো-টা ভেস্তে গেলেও সেবছরই প্রথমবারের মত ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউইটে শো করেছিল রকস্টারটা।

আক্ষরিক অর্থেই আশির দশকে রকস্টারটা ছিল বৈপ্লবিক একটা ব্যাপার। আয়রন মেইডেন, ব্ল্যাক সাবাথ, পিংক ফ্লয়েড বা লেড জেপলিন ঘরানার গানবাজনা যে বাংলাদেশে হতে পারে – রকস্টারটার আগে ব্যাপারটা কেউ ভাবতেও পারেনি।

ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু করে ১৯৮৫ সালে। মইনুল ইসলাম আর ইমরান হোসেন – ঢাকার সেন্ট জোসেফ হাই স্কুলে পড়া দুই বন্ধু। দু’জনে এক সাথে গানবাজনা করতেন। মইনুল ছিলেন গিটারে, ইমরান ছিলেন বেজিস্ট, বাজাতেন গিটারও। তাদের সাথে ভোকাল যোগ হন আসিফ আলম বীরু। ড্রামসে আসিফ ইকবাল এবং কী-বোর্ডে শাফকাত জান চৌধুরী আসেন। পরে আসেন আরশাদ আমীন, তিনি বেজিস্ট। তখনও ঠিক ব্যান্ড ফর্মেশনে যাওয়া হয়নি তাদের।

প্রথম শো-এর ছবি

পারিবারিক কারণে ড্রামার আসিফ ইকবাল গানবাজনা ছেড়ে দেন। ড্রামার হিসেবে আসেন মাহবুবুর রশীদ। এই রশীদই ‘রকস্টারটা’নামটা পছন্দ করেন। তিনি নামটা নাকি পেয়েছিলেন ভুগোল বইয়ে। ব্যস! হয়ে গেল ব্যান্ড ফর্মেশন। সবাই পড়ে কলেজে ভর্তি হন নটরডেমে। স্বপ্ন পায় পূর্ণতা।

রকস্টারটার লোগো বানানোর গল্পটাও বেশ মজার। এই লোগোর জনক ইমরানের কাজিন শাহরিয়ার হোসেন। একদিন তিনি ইমরানের গিটারে নিজের মত ব্যান্ডটার নাম আঁকেন। আর সেটাই পছন্দ হয়ে যায় সবার।

প্রথম অ্যালবামের কভার

ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে তখন ব্যান্ডগুলো খুব পারফরম করতো। সবার জন্য স্বপ্নের একটা জায়গা ছিল সেটা। রকস্টারটা ঠিক করলো নিজেরাই শো-এর আয়োজন করবে। ভাড়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ২০ হাজার টাকা। সেই আমলে এটা বিশাল ব্যাপার।

ইমরানের বাবা আর্কিটেক্ট ছিলেন, সেই সূত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের সদস্য। তিনি ৫০ ভাগ ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করে দিলেন। সবাই নিজেদের হাত খরচ আর বাসা থেকে চেয়ে এনে মোট পাঁচ হাজার টাকা জমা করলো। আরশাদ নিজের কোন এক বন্ধুর বাবার কাছ থেকে আনলো পাঁচ হাজার। ব্যস, এবার আর শো ঠ্যাকায় কে!

সমস্যা আরেকটা ছিল, রশীদের তখন স্টেজে নিয়ে বাজানোর মত কোনো ড্রামস ছিল না। এগিয়ে আসেন ওয়ারফেজের ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইব্রাহীম আহমেদ কমল। কিন্তু, তখনও ওয়ারফেজের প্রতিষ্ঠাই হয়নি। কমল স্রেফ রকস্টারটাতে সাহায্য করার জন্যই হুট করে একটা ব্যান্ড গড়ে ফেললেন। ভোকালে ‘পেন্টাগন’ ব্যান্ডের মোহাম্মদ আলী সুমন, ‘উইনিং’-এর জামান আলী চন্দন, ড্রামসে ওয়ারফেজের শেখ মনিরুল আলম টিপু, কি-বোর্ডে ‘ফিডব্যাক’ এর ফুয়াদ নাসের বাবু, আর কমল মিলে গঠন করলেন ‘ফ্রেন্ডস’। শো-এর নাম হল ‘রকস্টারটা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’।

দুই ব্যান্ডের সদস্যইরাই শো’র টিকেট বানানো, শহরজুড়ে পোস্টার লাগানো ইত্যাদি কাজগুলো করেছিল। তাঁদের সেই পরিশ্রম স্বার্থক হয়েছিল। হলভর্তি মানুষের ভিড়ে প্রথম সফল শো করে রকস্টারটা। বাংলার সঙ্গীত ভূবনে মাথা তুলে দাঁড়ায় হেভি মেটাল।

শুরুতে এই ব্যান্ডটাকে দু’টো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমত, বাংলাদেশে তখনও হেভি মেটালের জনপ্রিয়তা ছিল না। বিদেশি হেভি মেটালও একটা শ্রেণি বাদে আর কেউ শুনতো না। আর দ্বিতীয়ত, এই ধরণের গানে প্রচুর শব্দ হত। ফলে, অনুশীলন করার জায়গা পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল রকস্টারটাকে।

সমকালীন কিছু ব্যান্ড ও সঙ্গীতকার হেভি মেটালের বিরোধী ছিলেন। ফলে, মূল ধারায় আসতেও বেগ পেতে হয়েছিল রকস্টারটাকে। যদিও, মাকসুদের বিপুল আগ্রহের কারণে তাঁরা বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক অ্যাসোসিয়েশেনের (বাম্বা) সদস্যপদ পায়। একই ধারাবাহীকতায় আসে ওয়ারফেজও। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো নয়।

প্রথম দফায় রকস্টারটার যাত্রা স্থায়ী হয় মাত্র সাত বছর। ১৯৮৫ থেকে শুরু করে ১৯৯২। ১৯৯২ সালেই আসে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘রকস্টারটা’। যদিও, দীর্ঘ ২৩ বছরের বিরতীর পর আবারো ২০১১ সালে একত্রিত হয়েছে ব্যান্ডটি। ২০১৪ সালে আসে ব্যান্ডটির দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘নতুন স্বাদের খোঁজে’। অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে আজো তাঁরা গান গেয়ে চলেছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।