২.০: টাইম পাস, মাস্ট ওয়াচ নয়

২০০৯ সালে যখন জানতে পারি ২০১০ সালে রোবট নামক বিগ বাজেটের সায়েন্স ফিকশন মুভি ভারতে তৈরি হবে তখন কিছুটা উত্তেজিত ছিলাম এই ভেবে যে ভারতে এবার হলিউডের আই রোবটের মত অত্যাধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি নির্ভর ভিন্নধর্মী মুভি মুক্তি পাবে। ছবির ফাস্টলুক হিসেবে ‘ন্যায়না মিলে’ গানটাতে অনেক রোবটের অংশগ্রহন এবং রোবটদের কিছু অ্যাকটিভিটিস এর চিত্র দেখে তো মনে হল ভবিষ্যতে রোবট দ্বারা পরিচালিত বিশ্ব নিয়ে ছবিটা নির্মিত হয়েছে।

যদিও শাহরুখ খান ছবিটা ছেড়ে দেয়ায় আর তখন বৃদ্ধ তামিল হিরো রজনীকান্তকে ওভাবে চিনতাম না বলে ছবিটা নিয়ে কিছুটা আশাহত ছিলাম। আরও আশাহত হলাম ১৮০ কোটি টাকা বাজেটের রোবট ছবিটি শিবাজি দ্য বস, নায়ক, অপরিচিত খ্যাত পরিচালক শঙ্কর যখন বাংলা সিনেমার মত নায়িকাকে নিয়ে রোবট আর রোবটের মালিকের ঝগড়া, বস্তি এলাকায় গুণ্ডার হাত থেকে নায়িকাকে রোবটের বাঁচানোর দৃশ্য, রোবট নায়িকাকে অপহরন করার মত নিম্নমানের দৃশ্য ও কাহিনি দিয়ে সাজালেন। ছবির শেষে জাদুঘরে রোবটকে ভেঙ্গে সাজিয়ে রাখার করুণ পরিণতি দেখে চিট্টির জন্য খুব মায়া হয়।

রোবট ২ নির্মিত হচ্ছে জেনে অতটা আগ্রহ না থাকলেও আমার প্রিয় নায়ক অক্ষয় কুমারের ভিলেন হবার খবর আর তার লুক দেখে আগ্রহ আসল। চিট্টিকে জাদুঘরের বাইরে এনে তাকে পুনর্নির্মাণ করে অক্ষয়ের বিরুদ্ধে দাড় করিয়ে বিশ্বকে অক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচান হবে ভেবে আগ্রহ দিগুণ বেড়ে যায়।

এবার আসি মূল রিভিউয়ে – কেমন হল রোবট ২.০?

ছবিটা আগের মত আশা নিয়ে বসে দেখিনি বলে এবার পরিচালক শঙ্কারের নায়ক, শিবাজি দা বস, অপরিচিত আর আই মুভির মত ২.০ কাহিনি নির্ভর মুভি না হলেও মুভিটি হলিউড স্ট্যান্ডার্ড অ্যাকশনে ভরপুর থাকায় বিশেষ করে অনেকগুলো মোবাইলের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া কখনো পাখি বা কখনো রোবটরুপী ভিলেন অক্ষয়ের সাথে অনেকগুলো রোবটের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া রজনীকান্তের যুদ্ধের দৃশ্য, ভিন্নধর্মী আইটেম গান ও তার তালে তালে ভিন্নধর্মী রবোটিক নাচ, একটি দৃশ্যের সাথে আরেকটি দৃশ্যের লিঙ্ক মেন্টেন করা, ভারতের সুন্দর সুন্দর লোকেশনে শুটিং, অক্ষয় ও রাজনিকান্তের ভিন্ন ভিন্ন লুকের সাথে ভিন্ন ধর্মী অভিনয়ের সামঞ্জস্য সব মিলে মনে হল টাইম পাসের জন্য ছবিটা ভালই ছিল ।

যদিও ছবিটিতে বেশ কিছু অ্যাকশন দৃশ্য ও কাহিনীর অংশ হলিউডের কিছু ছবি থেকে ধার নেয়া। আর রোবট মুভির প্রথম পার্টের কিছু কিছু অ্যাকশন সিন রিপিট করা হয়েছে ২.০ তে বিশেষ করে অনেকগুলো রোবটের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া রজনীকান্তের যুদ্ধের দৃশ্য ছবির প্রথম পার্টের মত অনেকক্ষণ ধরে জুড়ে ছিল যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছবির সময় নষ্ট করা হয়েছে আমার মনে হল । প্রত্যেকটি দৃশ্যের সাথে একেকটি আবহ সঙ্গীতের সামঞ্জস্য ছিল মনে হল। কিন্তু থ্রিডি নির্ভর ছবির হল প্রিন্ট দেখায় তরকারি ছাড়া ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল।

অক্ষয় কুমারের ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ হল এই ছবিতে অক্ষয় কুমারের অভিনয় করার জায়গা কম ছিল আর সুসংবাদ হল দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য ভিএফএক্স দিয়ে তৈরি করা অক্ষয়ের ভিন্ন ভিন্নলুক আর অ্যাকশন ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল।

রজনীকান্তের ভক্তরা এই ছবি দেখে মজা পাবেন কারণ তার অন্যান্য ছবির মত এই ছবিটিও ছিল তাঁর বড় বড় ডায়লগ, অসাধারণ অ্যাকশন, আর চারটি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের ভিন্নধর্মী অভিনয়ে ভরপুর। তবে ছবিটি দেখার সময় আমি কখনো ভাবিনি রোবটে প্রথম পার্টের ভিলেনরুপী রজনীকান্ত এবার ২.০ তে আবার ভিলেনরূপে ফিরে আসবে।

কারণ অক্ষয় তো ভিলেন হিসেবে আছেই তো কেউই চিন্তা করার কথা না যে ধ্বংসাত্তক অক্ষয়কে ধ্বংস করার জন্য ভাল রোবট চিটটি যখন ব্যর্থ হবে তখন রোবটের প্রথম পার্টের মত চিটটির মধ্যে আবারো রেড চিপ ঢোকানোর মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক ভিলেনরুপী রোবট চিট্টিকে আবার ফিরিয়ে আনা হবে। আর চিট্টির মধ্যে আবারো রেড চিপ ঢোকানোর মহৎ কাজটি এবার করবেন ছবির সুন্দরী রোবট অ্যামি জ্যাকশন। যদিও ধ্বংসাত্মক অক্ষয়কে ধ্বংস করার জন্য ধ্বংসাত্মক ভিলেনরুপী রোবট চিট্টিকে আনার কনসেপ্টটি হলিউডের একটি অ্যানিমেটেড অ্যাকশন মুভি থেকে নেয়া হয়েছে।

এবার আসা যাক ছবির সুন্দরী অ্যামি জ্যাকসনের কথায়। তার ভক্তরা জেনে দুঃখ পাবেন যে ২.০ মুভিতে তাঁকে স্রেফ শো পিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানী রাজনিকান্তের পিএস হিসেবে কাজ করা, মুভির আইটেম গান, চিটটির মধ্যে রেড চিপ ঢোকানোর দৃশ্য ছাড়া তাঁকে মুভিতে দেখা যাবে না বললেই চলে।

পরিচালক শঙ্কর তার আই মুভিতে যেভাবে অ্যামি জ্যাকসনের অভিনয় আর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন এবার ২.০ মুভিতে দুই সুপার স্টার অক্ষয় আর রজনীকান্তকে পেয়ে পরিচালক ছবিতে অ্যামি জ্যাকসনের অভিনয় আর সৌন্দর্যের রুপদানে মনোযোগ দেননি বললেই চলে। আর অ্যাকশন মুভিতে আবেদনময়ী নায়িকার ভুমিকা না থাকলে সালাদ আর চিজহীন বার্গার খাচ্ছি মনে হয়। রোবটের প্রথম পার্টের নায়িকা ঐশ্বরিয়ার ‘ক্যামিও অ্যাপেয়ারেন্স’ আশা করেছিলাম, কিন্তু তা ছিল না।

তবে যারা হলিউড মুভি কম দেখেন বা পরিচালক শঙ্কর এর সাহসিকতার সাথে তৈরি করা দীর্ঘ সময় জুড়ে ভারতের প্রথম থ্রি ডি মুভিকে স্বাগত জানাতে চান তাদের ছবিটা অবশ্যই ভাল লাগবে। কারণে ভারতে এমন ছবি তৈরি করার সাহস দেখানো চারটে খানে কথা নয়। আর বর্তমান যুগের মায়েরা ছবির ভিলেন অক্ষয় কুমারের রোলটাকে অনেক পছন্দ করবেন, কারণ ভিলেন সবার মোবাইল কেড়ে নেয় বলে বর্তমান যুগের মায়েদের সন্তানেরা এবার বোধয় মোবাইলের অভাবে পড়াশোনার পেছনে মন দেবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।