সাউথ জানে কিভাবে ছবি ‘খাওয়াতে’ হয়!

৫০০ কোটিরও বেশি টাকায় তৈরী ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এযাবতকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি ২.০। ২৯ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর এর ওই উইকেন্ডে সারা পৃথিবী জুড়ে যত ছবি বেরিয়েছে এবং পয়সা কামিয়েছে, তার মধ্যে লিস্টে সবার উপরে নাম ২.০! হ্যাঁ, গত উইকেন্ডে অর্থের নিরিখে পৃথিবীর এক নম্বর সিনেমা এই ২.০ যা কিনা ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস কেও ছাড়িয়ে গেছে! এ যাবত তার ঝুলিতে ৪০০ কোটি যা ভারতীয় সিনেমা প্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের কথা!

গল্পটা যারা রোবট দেখেছিলেন তারা জানবেন রজনীকান্ত একজন সাইন্টিস্ট আর তার তৈরী করা রোবট হচ্ছে চিট্টি। এই গল্পেও তাই। এখানে লড়াইটা অক্ষয় কুমার এর সাথে যিনি একজন পক্ষী বিশারদ এবং মোবাইল ফোনের অত্যাধিক ব্যবহারে পাখিরা যে মরে যাচ্ছে সে বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তাশীল একজন মানুষ।

তিনি পাখিদের বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু সবই যখন বিফলে গেলো, তখন নিজেই ড্রাগনের মতো একটা বিশাল পাখী সেজে লোকজনকে মারতে শুরু করেন, তাদের মোবাইল কেড়ে নিতে লাগেন। বলাই বাহুল্য, অক্ষয় একজন সুপার পাওয়ার এবং তার সাথে পুলিশ, মিলিটারি কেউই পেরে উঠছিল না। অবশেষে তাঁর হাত থেকে শহর বাঁচাতে রজনীকান্ত তার রোবট চিট্টিকে মাঠে নামায়। এই হচ্ছে মোদ্দা গল্প।

ছবির ভালো কিছু দিক আছে। এক হলো থ্রিডি এফেক্ট। এই প্রথম ভারতীয় ছবি যা সম্পূর্ণ থ্রিডি ক্যামেরায় শুট হয়েছে। ফলে যদি দেখতে চান, থ্রিডি ফরম্যাটে দেখাই শ্রেয়। ছবির শুরুটা বেশ ভালো। প্রথম ৫ মিনিট ধরে নাম দেখানোটা অভিনব না হলেও বেশ দৃষ্টি নন্দন ওই থ্রিডি ফরম্যাটে।

এই ছবির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো মারপিটের দৃশ্য গুলো। ভিএফেক্স বা সিজিআই টাইপের টেকনিকাল কচকচানির মধ্যে যেতে পছন্দ করি না। দেখতে ভালো লাগছে, এটাই আসল কথা। অনেকে বলছেন বিদেশে এর চেয়ে অনেক ভালো কাজ হয়, হয়েছেও। আমি বারবারই যেটা বলি, আবারও বলবো।

একটা ছবিকে তার নিজ গুনে তুলনা করুন। হ্যাঁ, সত্যি বিদেশে অনেক ভালো কাজ হয়। তাই জন্যেই ওটা ১০/১৫ বছর আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। আমরাও কিছু কম এগিয়ে নেই ভেবে আত্মতৃপ্তি না পেয়ে ছবিটি যদি ভালো লেগে থাকে, তার থেকেই তৃপ্তি পান। সেটাই যথেষ্ট।

‘খিদে পেলে নিজের হাত খান নাকি? সকালে মুরগি দিয়ে নিজের ব্রেকফাস্ট করাটাও ওই একই রকম। ৩০ গ্রামের একটা পাখী যদি আমাদের থেকে তার নিরাপত্তা না পায়, এ তাহলে কিসের সভ্যতা?’ – ছবির এই একটা ডায়ালগ মন ছুঁয়ে গেলো। ছবিতে দু তিনটে গান আছে, কয়েক কলি করে। তাই বিশেষ বোর হওয়ার ব্যাপার নেই। কারন গানগুলো পদের নয়। এ আর রহমান সুরকার যদিও!

সাউন্ড ডিজাইন গল্পের বক্তব্য আর গতির সাথে সমানুপাতিক। অস্কার পাওয়া সাউন্ড ডিসাইনার রেসুল পকুট্টি এ ছবির দায়িত্তে ছিলেন। উনি পরিচালকের নির্দেশ মতই করেছেন।

আরও একটা ভালো পয়েন্ট হলো অক্ষয়ের এন্ট্রি। ভিলেনের এন্ট্রি দিয়েই গল্পে হাফ টাইম হয়। ওই জায়গাটা বেশ স্টাইলিশ। ফ্যানেদের পক্ষ্যে। সিটি মারার জন্য আদর্শ।

অ্যামি জ্যাকসন এ ছবির মধ্যে সবচেয়ে মানানসই চরিত্র। সত্যি বলতে রজনীকান্ত কে আমার একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞ্যানী হিসেবে কখনই মনে হয়নি। রোবটেও না, ২.০ তেও না। অক্ষয়ও একজন পাখিরুপী ভিলেন হিসেবে খুব একটা গ্রহন যোগ্য মনে হয়নি। ব্যাতিক্রম অ্যামি। সে হচ্ছে একজন নারী রোবট এবং চিট্টিকে অল্প অল্প পছন্দ করে। যেহেতু রোবট তাই অল্প অল্প ফিলিংস আছে। বেশ মিষ্টি একটা ব্যাপার।

এবার ছবির কিছু খারাপ দিক। প্রথমেই স্ক্রিপ্ট। গল্পের বাঁধন দানা কখনই বাঁধেনি। মানে আস্তে আস্তে গল্প এগোয় বটে, কিন্তু তার মাঝে যে খুন, যে ঘটনার ঘনঘটা, চরিত্র গুলোর একে একে আসা, পারস্পরিক টানাপোড়েন, এগুলোর জন্য চিত্রনাট্যের যে জোর থাকা দরকার, সেটা মনে হলো এই সিনেমায় ছিলোনা। সবই হয়েছে, কিন্তু মন ভরেনি যেন।

গল্পের কমেডি ভয়াবহ রকমের নিম্নমানের। দক্ষিনী সিনেমার মধ্যে হাস্যরসবোধ বরাবরই একটা বিশেষ ধরনের ঘরানাকে প্রশ্রয় দেয় এবং এখানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা ব্যাক্তিগত ভাবে আমার পছন্দের আওতায় না পরলেও পরিচালক শঙ্কর নিঃসন্দেহে একজন পেশাদার এবং অত্যন্ত সংযত ভাবেই ওই জাতীয় স্থুলরসকে কতক্ষণ পর্দায় রাখতে হয় জানেন, তাই মোটামুটি মানিয়ে গেছে।

দু’জন অস্কার খ্যাত সম্পদকে কাজে লাগাতে পারেননি পরিচালক। এ আর রহমান এর সুর হয়ত অন্য এক দিগন্ত দিতে পারত যদি আত্মহত্যা; পাখীর প্রতি একই সাথে প্রেম ও অপ্রেম; আর রোবটদের আবেগ কে সুরারোপিত করা যেতো। এটা যদিও একান্তই আমার ব্যাক্তিগত মত। নিজের মতো করে ছবিটার একটা সুর দিতে চাইছিলেম। তাই এই পয়েন্টা বাদও দিতে পারেন। কিন্তু সাউন্ড ডিসাইনের বিষয়টাতে অনেক খামতি লেগেছে।

অযথা অনেক শব্দ কানে এসেছে যা মাথা না ধরালেও বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ছবিতে দেখানো হচ্ছে যেখান থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে, দু চাকা, চার চাকা, লোহা, হাতা, খুন্তি, ইট, পাথর সব নিয়ে একটা মানুষের সমান রোবট হুট করে হয়ে গেলো ডাইনিসোরের মতো বিশাল একটা রোবট। এটা হওয়ার যে প্রক্রিয়া দেখানো হোল, ২ মিনিটে, সেটা পর্দায় দেখাতে হলে, আপনার কান ফেটে যাওয়ার কথা। কিন্তু গুরু গম্ভীর কিছু আওয়াজ দিয়েই শঙ্কর কাজ চালিয়ে দিলেন।

অভিনয় এমি ছাড়া কাররই ভালো লাগেনি। এমনকি আদিল হুসেন এর মতো অত বলিষ্ঠ এক অভিনেতাকেও অনেকটা কমিক ক্যারেকটারের মতো উপস্থাপিত করতে গিয়ে ওই কমেডির মজাটাও নষ্ট হয়ে গেলো।

সাউথের ছবি আমি বিশেষ ভাবে পছন্দ করি। ওরা জানে কাকে কি এবং কিভাবে ‘খাওয়াতে’ হবে। তাই আমার সাউন্ড ডিজাইন না পছন্দ হলেও কিসসু না। সিনেমা ৪০০ কোটির ক্লাবে ঢুকে গেছে। আশা করবো আরও অনেক সফল হোক। কারণ একটাই – পেশাদারিত্ব। বাকিদের তো ছেড়েই দিন। বলিউডেও এই পরিমাণ টাকা ঢাললেও আর একটা ২.০ তৈরী হবেনা।

কারণ, করণ জোহর, রোহিত শেট্টি, অনুভব সিনহা বা কৃশ খ্যাত রাকেশ রোশন দের হাতে পড়লে তিনটে লম্বা লম্বা গান, একটা মাখো মাখো প্রেম আর দুর্দান্ত লোকেশান এর চক্করে এই ছবির পিন্ডি চটকে যাবে। এই দানবীও পরিসরের ছবি হয়তো করতে পারবেন অনুরাগ কাশ্যপ। কিন্তু করবেন না। কারণ কাশ্যপের ‘ভাবেশ জোশী, দ্য সুপারহিরো’ অন্য মাত্রার এক সুপারহিরোর গল্প যার দর্শক সীমিত, উচ্চমার্গীও এবং কাশ্যপ এদের জন্যেই ছবি বানান। তাই উনি আমার প্রনম্য।

সুতরাং দেখতে চাইলে দেখতে যান। যে সিনেমা বিশ্বের দরবারে জায়গা করে নিয়েছে, সেটা না দেখলে কিছু না কিছু তো একটা মিস করবেনই নিশ্চিত। আমার রেটিংএর প্রয়োজন নেই। আমি নিয়ম মত রেটিং দেই, দেবো। দশে সাত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।