‘আমাদের চোখের পানিটা কেউ দেখে না’

অম্ল-মধুর এক সিরিজ শেষ করলো বাংলাদেশ। সিলেটে যে মুখগুলো হতাশায় আচ্ছন্ন ছিল, মিরপুর টেস্ট শেষে সেই মুখগুলোতেই আজ হাসির বন্যা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৮ রানের বড় জয় দিয়ে ১-১ ব্যবধানে সিরিজ ড্র হল।

এরই মধ্যে লম্বা সিরিজ খেলতে চলে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজও। তাই, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ শেষে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সংবাদ সম্মেলনে সদ্য শেষ হওয়া সিরিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ছাড়াও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজের প্রসঙ্গও আসলো।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কি?

সবাই চাচ্ছিলো জিম্বাবুয়ের সাথে বাংলাদেশ জিতুক। আমার মনে হয় জিম্বাবুয়েকেও ক্রেডিট দিতে হবে, ওরা ভাল ক্রিকেট খেলেছে। ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগের ভাল করেছে। প্রথম টেস্টে কিছু ল্যাক অব ডিসিপ্লিন ছিল, যা টেস্ট ক্রিকেটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।ওই জিনিসটা আমরা করতে পারি নি, যা এই টেস্টে করতে পেরেছি। প্রথম টেস্ট শেষে একটা কথা বলেছিলাম, আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সবাই বেশ ডিটারমাইন্ড ছিলাম, প্রথম টেস্ট হারের পর আমরা খুব হার্ট হয়েছিলাম, আমরা চেয়েছিলাম তাঁর বহিঃপ্রকাশ মাঠে দেখাতে। আমার মনে হয় আমরা কিছুটা হলেও করতে পেরেছি।

ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ’র জন্য সেঞ্চুরিটা কতটা স্বস্তিদায়ক?

হ্যাঁ কিছুটা রিলিফ বলতে পারেন। কারণ আমার শেষ পাঁচ টেস্টে কোন ভাল পারফর্মেন্স ছিল না, কোন ফিফটি ছিল না। আমি এই ফরম্যাটের ক্রিকেটে স্ট্রাগল করছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম আমার জায়গাটা মূল্যায়ন করতে পারে, কারণ অধিনায়ক হিসেবে সবসময় সামনে থেকে পারফর্ম করতে হয়। ওই দায়বদ্ধতা আমার মধ্যে ছিল। আলহামদুলিল্লাহ যে আমি দলের জন্য কন্ট্রিবিউট করতে পেরেছি। তবে আমার এখনও উন্নতির অনেক জায়গা আছে। আমি চাই এই ফরম্যাটে আরও ধারাবাহিক হতে।

জিম্বাবুয়ের মত দলের বিপক্ষে সিরিজ ড্রয়ে আনন্দ বেশি নাকি স্বস্তি?

যদি আপনি ম্যাচ জয় করেন তাহলে অবশ্যই আপনার আনন্দ লাগা উচিত। ম্যাচ জিতলে ওতটুকু অধিকার থাকে আনন্দ প্রকাশ করার। আমরা যখন খারাপ খেলি, ড্রেসিং রুমে মনটা আমাদেরই বেশি খারাপ হয়। আমাদের চোখের পানিটা কেউ দেখে না। আমরা এটা কাউকে বলিও না। এখানে কমপেয়ারিজমের কোন ইস্যু নেই, স্বস্তিও না, আনন্দও না। বলতে পারেন দু’টোর মাঝামাঝি।

‘এভাবে টেস্ট খেলার মানে হয় না’ বলেছিলেন সিলেট টেস্টের পর, এবার কি মনে হয় কোনো আছে?

হ্যাঁ যদি আমরা প্রথম টেস্টের মত খেলি, তাহলে অবশ্যই মানে হয় না। আবার যদি আপনি এই টেস্টের কথা চিন্তা করেন, যদি আমরা এমন মানসিকতা দেখাতে পারি এবং কাজে কর্মে সেটা দেখাতে পারি, তাহলে অবশ্যই মানে হয়।

ইনিংস ঘোষণা কি সঠিক সময়ে হয়েছিল?

আমার মনে হয় পুরো পাঁচ দিনই উইকেট খুবই ভাল ছিল। আজকের দিনটাও যদি খেয়াল করেন, ইনিশিয়ালি ৩০ মিনিটের মতন কিছুটা এদিক সেদিক টার্ন হয়েছে, এরপর মিরাজ এসে দুটি উইকেট নিয়েছে। আমরা ওই মুমেমটামের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একটু রাফ ছিল, আমরা উইকেট থেকে যতটা স্পিন, বাউন্স পাওয়ার আশা করছিলাম সেটা পাই নি। উইকেট অনেক ভাল ছিল।

খালেদকে কেমন দেখলেন?

খালেদ তাঁর প্রথম ম্যাচের তুলনায় অনেক ভাল পারফর্ম করেছে। হি অয়াজ অ্যা বিট আনলাকি, তাঁর বোলিংয়ে কিছু সহজ ম্যাচ মিস করেছি, নয়তো তাঁর বোলিং ফিগারটা আরও সুন্দর দেখাতো। মাঝে মাঝে ভাগ্যও পাশে থাকা লাগে, আমার মনে হয় মুস্তাফিজ ভাল বোলিং করেছে। ভাল জায়গায় বোলিং করেছে। আর স্পিনাররা, মিরাজ তাইজুল স্ট্যান্ড আউট পারফর্মার।

উইন্ডিজ সিরিজের আগে ঢাকার উইকেট নিয়ে কতটা দুশ্চিন্তায় আছেন?

হ্যাঁ অবশ্যই, এই উইকেটটা একটু গ্রিনিশ ছিল, আর্লি অন। আমরা যখন ব্যাট করছিলাম, তখন ১-২ ঘণ্টা ভাল হেল্প ছিল পেসারের জন্য। ওরা খুব ভাল জায়গায় বল করেছে। আমার মনে হয় ওই সময়টায় মুশফিক মমিনুল খুবই ভাল ব্যাট করেছে। দ্যা অ্যামাউন্ট অব গুড দে হ্যাভ লেফট, ঈট ওয়াজ আনবিলিভেবল। তারপর মিরাজ খুব ভাল ব্যাট করেছে। সব মিলিয়ে এই টেস্টের পারফর্মেন্স খুবই ভাল, তবে ক্রিকেটে সবসময় উন্নতির জায়গা থাকে। আর ওয়েস্ট ইন্ডীজের সাথে টিম ম্যানেজমেন্টের সাথে বসে চিন্তা করব কেমন উইকেট চাচ্ছি। ওদের দলও আমাদের দেখতে হবে, প্লাস হচ্ছে আমরা সবসময় যেই স্পিন ফ্রেন্ডি উইকেট করি, সেই দিকেই হয়তো আমরা যাব।

এখনো কি উন্নতির জায়গা আছে?

ক্রিকেট খেলাটাই এমন, আপনি যদি একশো করেন কিংবা দুইশো পঞ্চাশ করেন তারপরও ব্যক্তিগত ভাবে মনে হবে আমার এই জায়গাতে কাজ করা দরকার। কারো যদি সুইং, স্পিন কিংবা সুইপ শটে দূর্বলতা থাকে সেখানে উন্নতি করার সুযোগ থাকে। এই ম্যাচটা জিতে যেহেতু আমার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে নামবো, এর জন্য এটা ভালো একটা ক্যামবেক। ব্যাটসম্যানদের জন্য ভালো হয়েছে, অনেকেই ভালো করেছে। সবাই একসঙ্গে ভালো করবে না। কখনো টপঅর্ডার রান করবে, কখনো মিডল অর্ডার রান করবে। যার যার পজিশন থেকে সবাই চেষ্টা করছে। সবাই ট্রেনিং সেশনগুলোতে চেষ্টা করছে। কারন আমাদের ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা দু:চিন্তা ছিল। এই ম্যাচে রান করাতে ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস আরও ভালো হবে। এই আত্মবিশ্বাস আমাদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও কাজে দেবে।

জিম্বাবুয়ের পেস ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস তো আলাদা। সিরিজটা কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে?

বিষয়টি আমি এভাবে চিন্তা করছি না। ওদের যে পেস বোলিং আছে রোচ, গ্র্যাবিয়েল..  সবাইকে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলেছি, ওই অভিজ্ঞতাটুকু আছে ওরা কেমন বোলিং করতে পারে। তাছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট এবং বাংলাদেশের উইকেটতো এক নয়।

অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ট্রফি শেয়ার করাটা কতটা বেদনাদায়ক?

প্রথম টেস্টে আমার মনে হয় আমরা খুব বাজে ক্রিকেট খেলেছি। শুরুতে আমাদের লক্ষ্য ছিল দুটি ম্যাচেই জেতা। হোম কন্ডিশনে জিম্বাবুয়ে হোক, অস্ট্রেলিয়া হোক কিংবা অন্য যে কোন দলই হোক আমরা সব সময় চাই নিজেদের কন্ডিশনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে যেন আমরা সিরিজ জিততে পারি। যে ফরম্যাটই হোক আমাদের লক্ষ্য থাকে এমনটাই। সেদিক থেকে বললে ট্রফিটা শেয়ার করতে খুবই খারাপ  লাগছে।

ক্যাচিংটা কি আবারো আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ?

প্রথমে একটু বলে নেই জয়টা সহজে আসেনি। প্রত্যেকে অনেক কষ্ট করেছে।   মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরি, মুমিনুলের দেড়শো রান, মিঠুনের রান, তাইজুলের ৩০-৪০ ওভার বোলিং এটা সহজ কাজ নয়। কষ্ট করে আমরা ম্যাচ জিতেছি, সবার কমিটমেন্ট ছিল। আর ক্যাচিংয়ের ইস্যুটা…আপনি যদি খেয়াল করে থাকেন, প্রথম টেস্টে আমাদের স্লিপ ক্যাচে বেশ কয়েকটা ফিফটি ফিফটি চান্স মিস করেছিলাম। এটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তারপরও আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। অনেক সময় একটা ক্যাচ ম্যাচের মোমেন্টটাইম ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই জিনিসটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আশা করি ভবিষ্যতে আমরা এখানে উন্নতি করতে পারবো।

ওয়েস্ট কি ভারতের বিপক্ষে দেড় মাসের সিরিজের পর আরো পরিণত?

অবশ্য। যেহেতু ওরা কিছুদিন আগে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলেছিল। ওটা ওদের কিছুটা হলেও হেল্প করতে পারে। এখানকার কন্ডিশনও কিছুটা ভিন্ন। আমরা যদি আমাদের হোম কন্ডিশনটা আমাদের মতো করে ট্রিপিকাল করে নিতে পারি তাহলে ম্যাচের রেজাল্ট আমাদের পক্ষে আসতেও পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা কতটা ভালো ক্রিকেট খেলছি সেটা। তারা অনেক ভালো দল। আমরা মানসিক ভাবে ও শারীরিক ভাবে তৈরি থাকতে হবে টাফ উইকেটে খেলার জন্য।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের নিয়ে আমাদের কিছুটা হলেও দু:চিন্তা থাকলে আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাস আছে আমরা আমাদের স্কিলের পূর্ণব্যবহার করতে পারবো।

মাশরাফি বিন মুর্তজা কি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে থাকবেন?

ইনশাল্লাহ মাশরাফি ভাইকে পাবো। সে আমাদের ওয়ানডে অধিনায়ক। উনি যদি সুস্থ থাকেন, আমরা অবশ্যই ওনাকে আমাদের মাঝে পাবো।

অভিষিক্ত পেসার খালেদ আহমেদের বেলায় অধিনায়ক হিসেবে আপনার ভূমিকা কতটুকু?

খালেদ তার প্রথম টেস্ট অনুযায়ি যথেস্ট ভালো বোলিং করেছে। প্রথম ওভারটা যখন সে করেছিল, আমার মনে হয় পর পর তিনটা বাউন্সার সে করেছিল। তখন তার সঙ্গে আমি কথা বলেছি, শুরুতে কিছুটা নার্ভাস সে ছিল। যদি ২-১ টা উেইকেট ওপেয়ে যেত। কিংবা আরও অ্যাফোর্ট দিয়ে বোলিং করতো পারতো ,তাহলে ভালো হতো। তারপরও আমার মনে হয় তার প্রতিভা আছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।