নিছক শিল্প কর‍তে আসিনি, আমার প্রোডিউসারের টাকাও আমাকে ফেরত দিতে হবে

কমার্শিয়াল সিনেমাকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমার বাড়িতে বাংলা সিনেমার বিরাট একটা ভিসিডি বা ডিভিডি কালেকশন আছে। আলাদা করে সিডি কেস কিনি আমি- সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋতিক আলাদা করে রাখা আছে সেখানে। তপনদার, তনুদার, উত্তম কুমারের ছবি আছে সেখানে। সৌমিত্র, সুচিত্রা, সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, চিরঞ্জিত, প্রসেনজিৎ, মিঠুন, তাপস- সবার সিনেমা আছে। আমি এদের সিনেমা শুধু দেখি না, খুঁজে খুঁজে কালেক্ট করি। আমি এমএলএ ফাটাকেস্ট দেখি। আমার কাছে জিতের সব সিনেমা আছে, সব।

আমার মনে হয়, মেইনস্ট্রিম সিনেমা যদি পাওয়ারফুল না হয়; সেখানে অল্টারনেটিভ সিনেমা পাওয়ারফুল হতে পারে না। মেইনস্ট্রিমটা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখে। তখন আমরা একটু অবসর পাই শিল্প নিয়ে একটু ভাবার বা চর্চা করার।

দিনশেষে সিনেমা একটা প্রোডাক্ট। যতক্ষণ আমি বানাচ্ছি, ততক্ষণ আমি মনে করতে পারি এটা শিল্প; যেই এটা শেষ হয়ে গেল তখনই সেটা একটা প্রোডাক্ট। এটা বাজারে আসবে, লোকে দেখবে। তবে প্রতিটা সিনেমার বাজার একই হতে হবে, তা নয়।

আমি বা কৌশিক, যার কথাই বলি না কেন – আমাদের প্রত্যেকের ভাগ্য জুড়ে আছে মেইনস্ট্রিম সিনেমার সাথে- যেগুলো স্বপন সাহা বা আরও অনেকে বানাচ্ছেন। এই ছবিগুলো না হলে হল বন্ধ হয়ে যাবে, এই ছবিগুলো না চললে বাংলা সিনেমাতে আর কেউ টাকা দেবে না। বাংলা সিনেমাতে টাকা ঢাললে প্রথমে কেউ মেইনস্ট্রিম সিনেমাতেই টাকা ঢালবে। ফর্মুলা সিনেমা থেকে অন্তত টাকা উঠে আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটা যে ইন্ডাস্ট্রি, আমরা যে অনেকগুলো মানুষের টাকা নিয়ে কাজ করছি- এই একাউন্টটিবিলিটা কিন্তু মেইনস্ট্রিম সিনেমা ডিসিপ্লিন দেয়। আমি এখানে নিছক শিল্প কর‍তে আসিনি, আমার প্রোডিউসারের টাকাও আমাকে ফেরত দিতে হবে।

 

আমার সিনেমা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেলে বেশি আনন্দ পাই, নাকি হল ভর্তি করে মানুষ দেখলে নাকি আমার সিনেমা কানে বা ভেনিসে কোন স্বর্ণপদক পেলে? আসলে তিনটার আনন্দ তিনরকম। আজকে দেশের যেকোনো অভিনেতা, অভিনেত্রী, টেকনিশিয়ান আমার সাথে যে কাজ করতে চান- এই পরিচিতির মূলে ন্যাশনাল এওয়ার্ড। আবার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলা ছবি দাঁড়ানোর যেমন একটা গৌরবের জায়গা আছে- সেক্ষেত্রে অবশ্যই কান বা ভেনিস আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আমাকে বলে, বোম্বেতে সে যেসব কাজ পেয়েছে, তার মূলে আছে আমার সিনেমা ‘দহন’। ওখানকার লোকেরা দহন দেখেছে। আমার সিনেমা যদি আমার বাইরেও অন্য দু’চারজন মানুষকে অন্য জায়গায় পরিচিতি দেয়, তাহলে আমি কেন সেই কাজটাকে ভাল বলবো না?

ডেট্রয়েটে একবার আমি আর বুম্বা গিয়েছি। সকালে ব্রেকফাস্ট করছি। এক মেক্সিকান ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী এসে বুম্বার অটোগ্রাফ চাইল। আর সাথে বললো, ‘ইউ আর ফ্রম বোম্বে?’

আমি আর বুম্বা বোঝার চেষ্টা করলাম ওরা কি বলতে চাচ্ছে। তারা বললো, ‘তুমি ঐশ্বরিয়ার সাথে কাজ করেছ না?’

এবার আমরা বুঝলাম। ওরা চোখের বালি সিনেমার কথা বলছিল। ওদের সমীকরণ অনুযায়ী, ঐশ্বরিয়া মানে বোম্বে আর বোম্বের সিনেমাতে বুম্বা থাকা মানে সেও ফ্রম বোম্বে।

অটোগ্রাফ দিতে দিতে বুম্বা বললো, ‘কোন বিদেশীকে কখনও অটোগ্রাফ দেব, এটা আমি ভাবিনি!’

আমি অনেকবার বলতে চেষ্টা করলাম- আই এম দ্য মেকার অফ দ্য ফিল্ম- তারা তাকালোই না আমার দিকে।

বুম্বাও অনেকবার চেষ্টা করল বলতে, ‘দিস ইজ ঋতুপর্ণ ঘোষ, মেকার অফ দ্যাট ফিল্ম।’ তারা নট ইভেন ইন্টারেস্টেড, বুম্বার অটোগ্রাফ নিয়ে চলে গেল।

সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের এক মানুষ বুম্বাকে যেভাবে সম্মান দিল- সেই সম্মানটাকে আমি কীভাবে ছোট করি? আবার একটা সিনেমা হলে চললে- সেই সম্মানটাকেও আমি কীভাবে ছোট করি?

_______________

কথাগুলো বলেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।