কমেডি কিংয়ের উত্থান পতন

গোবিন্দকে লোকে তাঁর কমেডি সিনেমা যেমন ‘আঁখে’, ‘শোলা ওউর শবনম’, ‘রাজা বাবু’, ‘কুলি নম্বর ১’, কিংবা ‘হাসিনা মান জায়েগি’র জন্য মনে রেখেছে। তবে, খুব কম লোকই এটা জানে যে, এই নায়ক তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু করেছিলেন অ্যাকশন হিরো হিসেবে।

৮০’র দশকে বলিউড বুঁদ হয়ে ছিল অ্যাকশন সিনেমায়। তখন গোবিন্দ আহুজা ‘মেরা লাহু’, ‘মারতে দাম তাক’, ‘খুদগার্জ’, ‘দাদাগিরি’, ‘হত্যা’, ‘সাচ্চাই কি তাকাত’ – ইত্যাদি সিনেমা করেন। সাফল্যও পেয়েছিলেন টুকটাক। তবে, গোবিন্দর ক্যারিয়ারে সত্যিকারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ‘শোলা ওউর শবনব’ – এটা তাঁর ব্যবসা সাফল্য পাওয়া প্রথম কমেডি সিনেমা। একই সাথে ডেভিড ধাওয়ানের সাথে মিলে তাঁর প্রথম কমেডি সিনেমাও এটাই। এই জুটিই কালক্রমে বলিউডে নতুন ইতিহাস গড়ে।

একে একে এরপর ‘আঁখে’, ‘রাজা বাবু’, ‘কুলি নম্বর ১’, ‘সাজান চালে সাসুরাল’, ‘হিরো নম্বর ১’, ‘দিওয়ানা মাস্তানা’, ‘দুলহে রাজা’, ‘বাড়ে মিয়া ছোটে মিয়া’, ‘হাসিনা মান জায়েগি’ ও ‘জোড়ি নম্বর ১’-এর মত সিনেমা করেন গোবিন্দ। খুব অল্প সময়েই গোবিন্দ’র মাথায় উঠে যায় কমেডি কিং-এর মুকুট। তিনিই যে প্রথম অভিনেতা হিসেবে কমেডিকে বলিউডের মূলধারায় নিয়ে আসেন, এটা না বললে খুবই অবিচার হবে।

আশি’র দশকে কমেডিকে মূল সিনেমার আড়ালে একটা সাব প্লট হিসেবে দেখা হত, আর তখন এমন সুপারস্টার খুব কমই ছিলেন যারা কমেডিতে আগ্রহী ছিলেন। ডেভিড ধাওয়ানের সাথে গোবিন্দই প্রথম এই স্টেরিওটাইপ ধারণা ভাঙেন। ফলে, একটা সময় তাঁর দেখাদেখি আরো অনেক ‍সুপারস্টার হাঁটেন এই পথে।

ওই সময় গোবিন্দর আরেকটা ‘বিশেষ’ ব্যাপার ছিল। আর সেটা হল তাঁর নাচ। তাঁর চোখ আর নাচের এক্সপ্রেশনও কথা বলত জানতো। গোবিন্দ ভক্তদের কাছে তাই তিনি ছিলেন মাস্টার অব ডান্স।

নব্বই দশকে সানি দেওল, শাহরুখ খান কিংবা সালমান খানদের পাশে গোবিন্দ ছিলেন শীর্ষ নায়কদের একজন। কত হিট সিনেমা যে উপহার দিয়েছেন তার হিসাব নেই। এমনকি ১৯৯৯ সালে বিবিসি নিউজের করা একটা পাঠক জরিপে তিনি বিশ্বের দশম অন স্ক্রিন/অন স্টেড তারকা বলে স্বীকৃতি পান। এরপরও তাঁর খ্যাতি ছিল।

তবে, এরপর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মুম্বাইয়ের উত্তরাঞ্চল থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে তিনি পাঁচ বারের সংসদ সদস্য রাম নায়েককে ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে চমকেও দেন। যদিও, গোবিন্দ রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল ছিলেন না। লোকসভায় অনুপস্থিত থেকে তিনি অনেক সমালোচনারও জন্ম দেন।

কালক্রমে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে ফেলেন। হঠাৎ করে রাজনীতিতে যাওয়াটাই সম্ভবত গোবিন্দর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল। এর ফলে তিনি তাঁর স্টারডম খোঁয়ান।

পর্দায় নিজের সেকেন্ড ইনিংসও বেশ ধুমধামের সাথেই ‍শুরু করেছিলেন গোবিন্দ। ২০০৬ সালে ফিরে এসে অক্ষয় কুমারের সাথে করেন ‘ভাগাম ভাগ’। বক্স অফিসে সাফল্য পায় সিনেমাটি। এরপর সালমান খানের সাথে ‘সালাম ই ইশক’ ও ‘পার্টনার’ করেন। পার্টনার অভাবনীয় সাফল্য পায়। তিনটি সিনেমাতেই প্রশংসিত হন গোবিন্দ।

সবাই বিশ্বাস করে ফেলেন যে, নব্বই দশকের কমিক স্টার এবারো নিজের সাফল্য ধরে রাখবেন। কিন্তু, বাস্তবে তা আর হয়নি। এরপর তিনি ‘মানি হ্যায় তো হানি হ্যায়’, ‘নটি অ্যাট ফর্টি’, ‘চাল চালা চাল’, ‘লুট’ ইত্যাদি নিম্নমানের সিনেমায় কাজ করেন।

গোবিন্দ বলিউডের প্রচলিত স্টার কাস্ট সিস্টেমে আটকে গেছেন। ক্যারিায়ারের শেষ বেলাতে এসেও তিনি সেকেন্ড লিড রোল নিতে উৎসাহিত নন। ফলে, অনেক বড় বড় ছবি হারাচ্ছেন তিনি। বলিউডের অন্যতম সেরা প্রতিভা হওয়া পরও তিনি একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছেন।

সিনেমায় তিনি নিজেকে বড় তারকা হিসেবে দেখাতে চান। যেটা, গোবিন্দ এই বয়সে গিয়ে শীর্ষ সিনেমাগুলোতে পাচ্ছেন না। এমনকি শাহরুখ খান তাঁকে একটা সিনেমায় বাবার ভূমিকায় নিতে চেয়েছিলেন, সেটাও গোবিন্দ নাকোচ করে দেন।

কেন্দ্রীয় চরিত্রে গোবিন্দ’র শেষ কাজ ‘আ গ্যায়া হিরো’, যেটাকে বক্স অফিস স্রেফ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এর বাদে ‘হলিউড’, ‘কিল দিল’ কিংবা ‘হ্যাপি এন্ডিং’ সিনেমায় অতিথি চরিত্র করেছেন তিনি। আর তার এসব কাজের প্রশংসা করেছেন দর্শক ও সমালোচকরা।  সামনে তাঁকে বরুণ শর্মার সাথে ‘ফ্রাই ডে’ সিনেমায় দেখা যাবে।

ক্যারিয়ারের সেকেন্ড ইনিংস কারো জন্যই সহজ হয় না। এই সময়টায় অমিতাভ বচ্চন বা অনিল কাপুররা যা করেছেন, গোবিন্দ’রও সেটাই করা দরকার। সেটা করতে না পারলে তিনি তার নব্বই দশকের ঐতিহ্য একেবারেই ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন, যা তাঁর কিংবা তাঁর ভক্তদের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না।

– কইমই অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।