কখনো হাসি, কখনো কান্না

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

আজকাল সবাই সিনেমা বোঝে। সিনেমা হলে গিয়ে কোন কোন খুঁত গুলো খুঁজে বের করা যায় সবাই যেন ফেবু এ এই করতেই ব্যস্ত। ফেসবুক দুনিয়ার আগেও বাঙালি-ভারতীয় দর্শক ছবি দেখত। তখন এত্ত ছবি সমালোচক গজাইনি আবার পেড রিভিউ লেখার লোকও এত্ত ছিলনা। আমি কোনো রিভিউ লিখতে বসিনি এ ছবি নিয়ে, তবু কিছু কথা লিখছি ছবিটি হলে গিয়ে দেখেই।

চলচ্চিত্র মানে বিনোদন সেটা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি আর সেই আর্টিফিশিয়াল আঁতলামোর যুগে রাজু হিরানি আনলেন ‘সাঞ্জু’। ‘সাঞ্জু’ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ছবি। কোনো সময়ে এটা আপনার হাসির কারণ তো কখনো দু:খের। সিঙ্গেল স্ক্রিন ছাড়া এ ছবি উপভোগ করা যায়না। দরকার নেই কোনো রিভিউ তর্ক বিতর্ক স্রেফ চিত্তবিনোদন আর সেটা করতে হিরানি তাঁর সেরাটা দিয়েছেন।

পর্দায় সঞ্জয় দত্ত হিসেবে মন্ত্রমুগ্ধকর বিশ্বাসযোগ্য রণবীর কাপুর। শুধুমাত্র সঞ্জয়ের শরীরী ভাষাই নয়, তার আভ্যন্তরীণ সংশয়কেও ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা। সঞ্জয় দত্তের প্রতিটি লুকস, ম্যানারিজিম, শরীরী ভাষা সবেতে সব বিশেষণ দিলেও রণবীরের তুলনা হবেনা। ওঁর অভিনয় জীবনের সেরার সেরা অভিনয়। তেমনি প্রশংসনীয় মেক আপ, পোশাক পরিকল্পনা ও রণবীরের দৈহিক মানসিক অধ্যাবসায়। ছবিতেও যেমন দেখানো হচ্ছে কামব্যাক সাঞ্জু মুন্নাভাই ওরফে রণবীর ফিল্মফেয়ার থেকে সব পুরস্কার নিচ্ছেন ঠিক তেমনি এ বছরের সব ক’টি সেরা নায়ক পুরস্কার বিজেতা হবেন রণবীর কাপুর।

সুনীল দত্তের ভূমিকায় পরেশ রাওয়ালের অভিনয়ও দৃষ্টান্তমূলক। রণবীরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেন তিনি, কিছু সময়ে এগিয়েও থেকেছেন। সুনীল দত্ত আরো মিষ্টি ছিলেন অনেকে বলেছেন কিন্তু এ অভিনয় পরেশ রাওয়াল ছাড়া হতনা। একদিকে স্ত্রী অন্যদিকে সন্তান নিজের রাজনৈতিক ফিল্মি জীবন সবকিছুর টানাপোড়েনে পোড় খাওয়া অভিনয় পরেশজির। নার্গিস দত্তের চরিত্রে মনীষা কৈরালা অনবদ্য। মনীষাকে আর একটু বেশি দেখা গেলে ভালো হতো।

নার্গিস যে সঞ্জয়ের প্রানদায়িনী ছিলেন মনীষা রনবীর’র গানটির দৃশ্যায়ণ চোখে জল আনবেই। তবু নার্গিস যেন বড় কম। ওই সময় থেকেই গল্পটা ধরা হয়েছে। বাবা ও ছেলের মাঝে বসে ‘রকি’র প্রিমিয়ার দেখতে চেয়েছিলেন নার্গিস। কিন্তু প্রিমিয়ারে সুনীল দত্ত ও সাঞ্জু’র মাঝের চেয়ারটি ফাঁকাই থেকে যায়! মানতে কষ্ট হয় সঞ্জয়ের। গুলিয়ে যেতে থাকে কল্পনা আর বাস্তব। এক ক্যান্সার আক্রান্ত মা ও সন্তানের শেষ দিনের কষ্ট দেখে যার চোখে জল আসবেনা সে মান হুশ নয়। যেখানে মনীষা নিজেও ক্যান্সার অতিক্রম করে উঠেছেন সদ্য জীবনের জয়গানে।

সঞ্জয়ের জীবনে কুপ্রভাব যে মানুষটি, সেই ভূমিকায় জিম সার্ভ অত্যন্ত সপ্রতিভ। আর নিউ ইয়র্কে ‘সাঞ্জু’র গুজরাটি বন্ধু যে জীবনের পাঠ পড়িয়েছিলেন, সেই চরিত্রে ভিকি কৌশল অনবদ্য। হিরানি তাঁর পরিচালনার মধ্যগগনে, আত্মজীবনী থেকে উঠে আসা প্রত্যেকটি চরিত্রকে যেন অন্ধ অনুসরণ করেছেন। সোনম কাপুর শেষ দৃশ্যে মাত করেছেন। দিয়া মির্জা যোগ্য সহধর্মিণীর মতো বেশ। আনুশকা শর্মা বায়োগ্রাফার রূপে সুন্দর।

 

তবে ছবির গান গুলো খুবই দুর্বল। এ আর রহমান থাকা সত্ত্বেও হিরানির সব থেকে গানের দিক দিয়ে দুর্বল এ ছবি। যদিও সুনীল দত্তের প্রথম জীবনে রেডিও সঞ্চালকের জীবনী তুলে এনে কথায় গানে ডায়লগ গুলো চোখে জল আনবেই। কিন্তু গান গুলো সুপারহিট হলে একটা লেজেন্ডারি চিত্তবিনোদন ছবির সকল বিষয় পূর্ণ করত এই ছবি। সঙ্গীত একদমই মন ছোঁয়নি। সঞ্জয়ের রকির গানে সেই আশির দশকের মতো সিটি কিন্তু পরেছে।

তবু বক্স অফিস রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে রণবীর’র অভিনয়। যা দেখতেই ছবিটি লেজেন্ডারি রয়ে যাবে। আর চোখে জল মনে শান্তি নিয়ে একটা ভালো ছবি দেখে টিকিটের দাম উসুলের চেয়েও বেশি হল চিত্তবিনোদন কোটায় একশোয় একশো রঞ্জু, থুড়ি সাঞ্জু। কিন্তু রঞ্জু তো বলাই যায় কারণ রণবীর যে পৃথ্বীরাজ কাপুর রাজকাপুর শাম্মিকাপুর শশী কাপুর ঋষি কাপুর নীতু সিং দের যোগ্য উত্তরসূরী কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের চেয়েও বেশী তা প্রমাণ করেছে রণবীর। রণবীরের রঞ্জু।

অনেকেই বলবেন এ তো জীবন ছবি নয়। হ্যাঁ, ছবির শুরুতেই নায়ক বলছেন আমার আমার অটো-বায়োগ্রাফি কিন্তু মাধুরী দীক্ষিত থেকে সাঞ্জুর আরো অনেক বিবাহ আরো অনেককাঁদা ঘটনা লুপ্ত ছবিতে সেটার ব্যক্তিগত আক্রোশ না বাড়িয়ে ছবি না করতে এবং হিরানি বলা যেতে পারে ট্রিবিউট দিয়েছেন তাঁর গুরু সঞ্জয় দত্তকে। ছবিতে তাই রকি থেকে মুন্নাভাই এমবিবিএস ফিল্মোগ্রাফিতে উঠে এসছে। মাঝের ছবিগুলি নেই ‘সাজান’,‘থানেদার’, ‘দুশমন’, ‘জিভা’। দেখানো সম্ভব না সব। ‘খলনায়ক’-এর পোষ্টার ছেড়া দেখানো হয়েছে বাবরি মসজিদ কাণ্ডে।

মুম্বাই দাঙ্গা, মুম্বাইয়ের বোমা বিস্ফোরণ সেই মামলায় সঞ্জয় দত্তের জড়িয়ে পড়া। বলিউডের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে তাঁর কানেকশন, বেআইনি অস্ত্র রাখার কারণ বলা হল সঞ্জয় দত্তের নিজের বয়ানে।

 

ছবির শেষেও মিডিয়াকেও ‘যা খুশি ওরা বলে বলুক ওদের কথায় কি আসে যায়’ বলতে রণবীর আর স্বয়ং সঞ্জয় দত্ত একসঙ্গে পারফর্ম করেন। এটা কেন সেটা কেন হাজার কথা হাজার ভুল ধরা যায় কিন্তু এ ছবি হাউজফুল বোর্ড, হাউজফুল হল, আবেগের ছবি। এ ছবি সেই আশির নব্বই দশকের দর্শকদের আবার ফিরিয়ে এনেছে হলে।

সেই করতালি, সিটি, রুমাল ভেজা কান্না, হো হো করে হেসে ওঠা, মন কাঁদিয়ে দিয়ে ভালো করবার ছবি চিত্তবিনোদনের ছবি ‘সাঞ্জু’। কোন হলপ্রিন্ট পাইরেসি প্রিন্ট নয় কোন মাল্টিপ্লেক্সে নয় সবাই মিলে জমজমাটি করে এই ছবি দেখুন উপভোগ করুন। এটা কেন ওটা কেন ওসব নিন্দুকদের মুখে ঝাঁটার বাড়ি মেরে দিয়েছেন হিরানি আর রণবীর কাপুর।

সঞ্জয় দত্তকে দেখে যাদের ব্যাড বয় ইমেজটাই চোখে পড়ে, রণবীরের অপাপবিদ্ধতায় যেন সে গ্লানি মুছে যায়। যদিও বাজে ছেলে বাজে মেয়ে দের গল্পই বিরল হয় কালজয়ী হয় যেমন হয়েছিল ‘ছায়াসূর্য’-তে অপয়া ঘেঁটুর গল্প।

একটা মানুষই নিজের জীবনকালে কিভাবে এতো গুলো ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন সেটাই বড় প্রশ্ন। অনেকে অনেক না পারা কাজে নতুন করে উদ্যম পাবেন ‘সাঞ্জু’ দেখে। অনেক কালো গল্প হয়তো দেখানো হয়নি তাই অটোবায়োগ্রাফি পুরোপুরি নয়। তাই সঞ্জয় হিরানিকে বেছেছেন।

‘সাঞ্জু’ আবেগের ছবি এক পিতা পুত্রের সেরা গল্প, এক স্বামীর অকালে স্ত্রীকে হারানোর গল্প। যে স্ত্রীকে বিয়ে করতে তিনি জীবন বাজি রেখেছিলেন। আর যারা অকালে মাতৃহারা হয়েছেন তাদের কাঁদাবেই নার্গিস মণীষা ও সাঞ্জু রণবীর। চোখ ভিজে আসবেই।

হিরানি পারেন এমন বিনোদন ছবি বানাতে। হিরানির বেস্ট। রণবীরের বেস্ট। অনেকদিন পর একটা সেই আশির নব্বই দশকের জমকালো ছবি দেখলাম সিটি হাউজফুল হাসি কান্না। সঞ্জয় ফ্যানরা পাগলপারা হয়ে ছুটে এসেছেন এ ছবি দেখতে।

আমি ছোটবেলায় দেখতাম আমার এক মামাকে তার বেডরুমে সঞ্জয় দত্তর বিশাল ছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে স্রেফ দেবতার মত অনুসরণ করতো, তাঁদের জন্য এ ছবি। আর সবার ভালো লাগবে এক জীবনগানের ছবি তাই। উপসংহারে একটাই কথা – শেষমেশ রাজু হিরানি, বিধুবিনোদ চোপড়া ও সাঞ্জু বাবা জুটি আবারও সুপারহিট। রণবীর সুপারহিট।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।