বাকের ভাইয়ের ফেরা!

‘কোথাও কেউ নেই’ টিভিতে দেখিনি আমি। জন্মের আগের কন্টেন্ট। তবু অদ্ভুত উপায়ে আমার স্মৃতিতে জেলখানায়, গরাদের ওইপাশে দাঁড়ানো বাকের ভাইয়ের দুঃখী-দুঃখী মুখ ছিল। এই তো, মাত্র কিছুদিন আগে, বিটিভ আর্কাইভ থেকে উদ্ধার হওয়া ঘষাঘষা প্রিন্টের যে কপি দেখলাম, তাতেও জেলখানার গারদ ধরা একটা দৃশ্য ছিল বটে মুনা-বাকেরের; তবে আমার ‘স্মৃতি’র সঙ্গে মিল নেই তার।

আমরা স্মৃতি বানাই, আবার স্মৃতি ‘এডিট’ও করি। নতুন মালমশলা যোগ করি, কখনো খাবলা দিয়ে তুলেও ফেলি এক একটা অংশ। হুমায়ূন আহমেদের কোনো লেখায় কি পড়েছিলাম এমন কিছু? নাকি চাপাবাজ মন এই স্মৃতিটাও এই মাত্র তৈরি করে গুঁজে দিল মগজের ভাঁজে!

এতোবছর পর, এই করোনাকালে কেন এই ফিরিস্তি লিখতে বসলাম হঠাৎ? কারণ একটা আছে অবশ্য। বলছি। আসলে মনে মনে টের পাচ্ছি, নব্বইয়ের বাকের ভাইরা আবার এই শহরের বুকে ফিরছে। ‘আধা গ্যাংস্টার-আধা ভলেন্টিয়ার’ স্বভাবের তরুণেরা কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে রাস্তায় অনাহারী মুখ খুঁজছে হিমুর মতো। আবার পাড়ার সচ্ছল বাড়িগুলো থেকে চাঁদা তুলে দলবেঁধে খিচুড়ি রাঁধছে, বিলাচ্ছে বাকেরীয় তরিকায়।

তো যা বলছিলাম, ‘কোথাও কেউ নেই’ না দেখেও বাকের ভাইকে আমি দেখেছি; অনেকবার। বাকের ভাই কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি; আমার ছেলেবেলার ক্লাসরুম তার একটা-দুটো উদাহরণ নিয়ে হাজির হয়েছিল। রিয়াজ চাচ্চু তো বাকের ভাই-ই ছিল। ওই যে লোকটা, যে লাই কাকাদের বাড়ির নিচে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।

দুই হাতে দুই কন্যার দুই হাত শক্ত করে ধরে আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতে তাড়ায় থাকা আমার মাকে যে নিচু গলায় বলতো, ‘ভাবি স্লামালিকুম’। তাড়াহুড়োয় শুনতে পায়নি মা। তাই এবার একটু এগিয়ে এসে, এবার কিছুটা জোরে, ‘ভাবি সালাম দিছিলাম।’ ‘ওহ! রিয়াজ তুমি! শুনি নাই ভাই!’

সালামের উত্তর দেওয়ার আগেই পাল্টা প্রশ্ন, ‘রিকশা খোঁজেন ভাবি? আপনি দাঁড়ান। আমি নিয়া আসি।’ সামনের দিকে এগুতে এগুতেই কথাগুলো পেছনে ছুঁড়ে দিত রিয়াজ, যেখানে ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছি আমরা। স্মৃতিতে পরের দৃশ্যে আমরা রিকশায় চড়ে গেছি।

চেপে ঠিকঠাক করে হুডের গায়ে একটা চাপড় দিয়ে রিকশাওয়ালাকে কিছুটা অথরিটির মেজাজে নির্দেশ, ‘ওই ভাঙ্গাভুঙ্গায় সাবধানে নিবি। ভাবি, ওরে ১০ টাকা দিবেন। এর বেশি চাইলে দিবেন না।’ রিকশা চলতে শুরু করতো এরমধ্যে; তাই মা গলা চড়াতো এবার, ‘বাসায় আইসো রিয়াজ।’

আমরা সবাই জানতাম, রিয়াজ চাচ্চু আর দেলোয়ার ভাই আসলে বাকের ভাই। আরও জানতাম, বাকের ভাইরা কিছু করে না। সারাদিন রাস্তায় পাওয়া যায় ওদের। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে নাম ধরে হাঁক দিলে ওরা ঠিক এসে হাজির হয় বাল্ব পালটে দিতে বা রিকশা ডেকে দিতে। দেলোয়ার ভাইয়ের দাঁড়ানোর জায়গাটা অবশ্য ছিল আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে। গুরুদাস সরকার লেন থেকে বসু বাজার রোডে ওঠার একটা শর্টকাট আছে না? ওই গলিটার মুখে।

আমাদের বাগান থেকেই গলিটা চোখে পড়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই প্রায়ই আমার বড় চাচী দেলোয়ারের নাম ধরে ডাকতেন; সামনের মুদি দোকান থেকে হঠাৎ দরকার পড়া মশলা বা ম্যাচের বাক্স এনে দিতে। দেলোয়ার ভাইকে ঘিরে থাকা শিষ্যদের কেউ দৌঁড়ে নিয়ে আসতো, যা দরকার।

আরেকটা দায়িত্ব ছিল দেলোয়ারের। ষোলই ডিসেম্বর বা একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে পাড়ার ছোটরা যে নাচবে-গাইবে, তার রিহার্সালের জন্য ওদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নিয়ে আসা আর তারপর পৌঁছে দেওয়ার কাজটাও ছিল তাঁরই। ১৬ই ডিসেম্বর সকালে ঘুম ভেঙ্গে যে পুরো পাড়ায় মাথার ওপর কাগজের পতাকা ঝোলানো দেখতে পেতাম, জানতাম ‘দেলোয়ার এন্ড টিম’ রাত জেগে করেছে এগুলো।

পুরান ঢাকায়, আমার মহল্লায় ৯০ দশকের শেষদিক পর্যন্ত পাড়ার অল্পবয়সীরা মিলে প্যান্ডেল খাটিয়ে জাতীয় দিবস উদযাপনের রেওয়াজ ছিল। ছোট কমিউনিটির এসব অনুষ্ঠানের অতিথিরা কিন্তু আবার হেভিওয়েট। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, আবদুল গাফফার চৌধুরীকে অতিথি হিসেবে মঞ্চে দেখেছি বলে আবছা আবছা মনে পড়ে।

দেলোয়ার ভাই মারা গেলে আমার পাড়ার এই অনুষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেল। হুট করেই মরে গেল একদিন দেলোয়ার। বয়স আন্দাজে ত্রিশের এর কোঠায় ছিল বোধহয়। বড়রা ফিসফাস করতো শুনেছি, অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য লিভার ‘পঁচে’ গেছিল নাকি! কী জানি সত্য-মিথ্যে! ছোটদের সাথে কি আর এসব নিয়ে আলাপ করে কেউ!

রিয়াজ চাচ্চু মারা গেল বোধহয় আরও কিছু পরে। বুড়িগঙ্গায় লাশ ভেসে উঠেছিল ওর। রিকশাভ্যানে চড়ে চাটাই মোড়ানো শরীর এসেছিল পাড়ায়। মহল্লার ছেলেপেলেদের ‘বিচার’ আয়োজনের হেড রিয়াজ নিজে ন্যায়বিচার পেয়েছিল কিনা, আজ আর মনে নেই। তবে মনে পড়ে, আমার মা-চাচীরা কেঁদেছিল খুব। আর আমিও দুই দুইয়ে সূত্র মিলিয়েছিলাম, বাকের ভাইয়েরা বেশিদিন বাঁচে না।

এতো কাল পর, এই লকডাউনে ঠাওর করলাম, সন্ধ্যার পর গলির মোড়ে মোড়ে আড্ডা জমছে আবার। আমার বানানো বা সম্পাদিত স্মৃতির সময়গুলো ফিরছে যেন। ক্যাসেট প্লেয়ারের বদলে এবার হয়তো স্মার্টফোনের কোনো গানের অ্যাপ থেকে একদিন হঠাৎ বেজে উঠবে – ‘হাওয়ামে উড়তা যায়ে মেরা লাল দোপাট্টা মলমলকা…’

অপেক্ষায় আমি কান পেতে রই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।