হতে চেয়েছিলেন বডিবিল্ডার, হয়ে গেলেন কমেডিয়ান

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

বডিবিল্ডার হবেন, সিক্স প্যাক-এই প্যাকে চমকে দেবেন – এটাই স্বপ্ন দেখতেন। সেভাবেই চলত শরীর চর্চা। তাঁর সমসাময়িক হিরোদের চেয়ে অনেক সুগঠিত ছিল তাঁর শরীর।

আজকাল যাকে বলে জিমচর্চিত। কিন্তু তখন অভিনয়টাই আসল ছিল , শরীর প্রদর্শন নয়। সেজন্য কোনো কাজেই লাগেনি তাঁর বডি বিল্ডিং। হয়ে গেলেন প্রবাদতুল্য কমেডিয়ান, বিখ্যাত অভিনেতা।

আজকাল দেখি, অভিনয় পারুক না পারুক জিমে ঘাম ঝরানো আর জিম থেকে ছবি আপলোড না করলে কি আর অভিনেতা, কি আর স্টার! আজকাল বডি বিল্ডিং করে ফিল্ম জগতে আসা মানেই হিরো হওয়ার স্বপ্ন। না, সে সময় হিরোদের বাহুবলি হওয়ার দরকার পড়ত না। দরকার পরত সুন্দর মুখ, অভিব্যক্তি আর আসল অভিনয়ের।

তাঁর সুন্দর মুখ ছিলনা তাই নায়ক হওয়া হয়নি। কিন্তু অভিনয়টা খাঁটি যেটা দিয়েই কিংবদন্তি হয়ে রইলেন। তবে ১৯৬৬ সালে ‘গল্প হলেও সত্যি’র ধনঞ্জয় তো নায়কই। হিন্দি ভাষায় যখন ‘গল্প হলেও সত্যি’ রিমেক হল ১৯৭২ সালে ‘বাবুর্চি’ নামে। রাজেশ খান্না করলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র – সে তো কাকের ময়ুরপুচ্ছ লাগানো হল।

রবি ঘোষের ছবি করার শুরু অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কিছুক্ষণ’ ছবি দিয়ে। সে ছবি লস্ট। তারপর সত্যজিৎ রায় থেকে অঞ্জন চৌধুরী। সবধারার ছবিতে দশকের পর দশক রবি ঘোষ অনন্য কি কমেডি কি অন্যধারার অভিনয়।

অন্য যেকোনো লেখায় রবি ঘোষকে বোঝাতে সত্যজিতের ছবির প্রসঙ্গ আসে, তাঁর করা ‘বাঘা বাইন’ বা ‘জটায়ু’ চরিত্রগুলোর কথা বলা হয়।

চলছে হীরক রাজার দেশে’র শ্যুটিং

কিন্তু, আমি বলব অঞ্জন চৌধুরীর ‘মায়া মমতা’ ছবির কথা। যেখানে রবি ঘোষ এন্ট্রি নিচ্ছেন হাফটাইমেরও অনেক পরে। বাড়ির চাকর। কিন্তু কী ম্যাজিক! কী দাপট! উফ!

যে সাহেবের মেয়ের ঘরে বোরখা পরিয়ে সাধুমা সাজিয়ে মালিক মালকিনের মেয়ের প্রেমিকাকে ঢুকিয়ে দেয়। সঙ্গে নেয় কমিশন। প্রেমিক প্রেমিকার দেখা করায় যে চাকর দরজা বন্ধ ঘরে। এদিকে মালিক মালকিনদের বলছে মেয়ের রোগ সারাতে সাধু মা ওঝা এসছে। তাই ঘন্টা বাজাতে থাকে ধূপসহ।

এই ছবিটা উনি করেছেন অভিনয় জীবনে অনেক গুলো বসন্ত পার করে। তাও ছবি জুড়ে অভিনয় নয়। ছবিটা অঞ্জন চৌধুরীর মশালা ছবি। সাবিত্রী চ্যাটার্জ্জী, মীনাক্ষী গোস্বামী, চুমকি চৌধুরী, তাপস পালরা ছবি জুড়ে কিন্তু রবি ঘোষ এসে কমেডি পুরো একা টেনে নিচ্ছেন। ছবিটাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছেন। এই ছবিতে অনুপ কুমার আবার সিরিয়াস রোলে যার এক্সিডেন্টে একটা পা বাদ পড়েছে।

রবি ঘোষের এই ঘন্টা বাজিয়ে আর কমিশন নিয়ে অভিনয় ঐ আর্ট ফিল্ম গুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম না।

মাল্টিপ্লেক্সে নয় প্রচুর সিঙ্গেল স্ক্রিনেই শহর শহরতলী মফস্বলে চলেছিল ,হল পাবার জন্য কান্নাকাটি না করেই। বরং বহু সিনেমা হল কর্মীর চোখের জল মেটাতো এসব ছবি।

বডি বিল্ডার হয়েও সেটাকে বিন্দুমাত্র ব্যবহার না করে হরিপদ একজন বেঁটেখাটো সাদামাটা লোক সম রবি ঘোষ অভিনয়টাকেই তাঁর পেশীশক্তি বানিয়েছিলেন। সেকারণেই হয়ে আছেন স্মরণীয়!

বলিউড তারকাদের সাথে রবি ঘোষ

ভালোবাসার বিয়ে অনুভা গুপ্ত (প্রথম স্ত্রী) রবি ঘোষের দাম্পত্য জীবন দিনেদিনে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছিল। অনুভা মারা যাবার আগে অনুভার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী মঞ্জু দে নামী হোটেলে’র সামনে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন অনুভাকে।

সেদিন হন বাড়িছাড়া। এরপর অনুভাকে তাঁর বাড়ি থেকে মাথায় রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন নিয়ে হসপিটালে ভর্তি করা হয়। শীলনোড়া দিয়ে কি স্বামী মেরেছিলেন ? চরম কলহ উত্তেজনায়? কিনারা হয়নি। স্বর্গীয় হন অনুভা গুপ্ত।

রবি ঘোষ ও অনুভা গুপ্ত

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।