চাইনি এমন রেকর্ড, চাইনি বিধাতার এমন নিষ্ঠুরতা

২০০৭ সালের মার্চ মাস। চৈত্র মাসের উত্তাপ সবে মাত্র ছড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। সেইসাথে দেশের ক্রিকেটভক্তদের মাঝে বাড়তি উত্তাপ যোগ করতে থাকে নবম ক্রিকেট বিশ্বকাপ। বিশ্বের প্রতিটি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের মত বাংলাদেশেও কাজ করছিলো বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উত্তেজনা। কারণ মার্চের ১৪ তারিখ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে শুরু হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের এই মহোৎসব।

কন্ডিশনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশ দল ফেব্রুয়ারিতেই পাড়ি জমায় ক্যারিবিয়ান দ্বীপে। মার্চের ১৭ তারিখ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন। প্রথম ম্যাচকে ঘিরে তাই চলছিল হাবিবুল বাশারদের জোর প্রস্তুতি। তাছাড়া এর আগের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল একেবারে যাচ্ছেতাই। সেবার একটি ম্যাচও জিততে পারেনি বাংলাদেশ।

এমনকি খর্ব শক্তির কানাডার বিপক্ষেও হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। তাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের সামর্থ্য জানান দেয়ার জন্য উন্মুখ ছিল খেলোয়াড়রা। এবং প্রথম ম্যাচেই তার প্রমাণ মেলে। কারণ এর আগের বিশ্বকাপের রানার্স আপ ভারতকে হেসেখেলে হারিয়ে নবম বিশ্বকাপের শুভসূচনা করে বাংলাদেশ। অথচ ভারতকে হারানোর কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।

শুধু প্রতিপক্ষের শক্তির বিচারেই নয়, তখন বাংলাদেশ দলের সার্বিক পরিস্থিতির সাপেক্ষে ভারতের মত দলের বিপক্ষে মাঠে নেমে ডমিনেট করে ম্যাচ জেতাটাও ছিল অনেকটা অপ্রত্যাশিত। কারণ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে নামার আগেই বিরাট এক ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ম্যাচের আগের দিন হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের কাছে ফোন আসে।

ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে তাঁরই সতীর্থ মানজারুল ইসলাম রানার মৃত্যুর সংবাদ। সঙ্গে সঙ্গে খুলনার কার্তিকডাঙ্গা থেকে শোকের মাতম ছড়িয়ে পড়ে পোর্ট অব স্পেইন পর্যন্ত। বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে নেমে আসে শোকের ছায়া। এক সমুদ্র জল জলোচ্ছ্বাসের মত উথলে উঠে সবার চোখে। সবারই মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছিলো এটা। কারণ দলের সবারই যে অত্যন্ত প্রিয়মুখ ছিলেন এই রানা।

পরদিন ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগমুহূর্তে রানার স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয় পোর্ট অব স্পেইনে। ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিটি খেলোয়াড় কালো আর্ম ব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিল। রানার অকালমৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেদিন তারকাখচিত ভারতকে ঠিকই রুখে দিয়েছিল বাংলাদেশ। রানার জন্য কিছু একটা করার তাগিদে ক্ষুধার্ত সেই বাঘেরা এই জয়কে উৎসর্গ করেছিল তাদেরই হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাণপ্রিয় সতীর্থকে।

মাঞ্জারুল ইসলাম রানা ছিলেন খুব হাসিখুশি একজন মানুষ। ড্রেসিংরুম মাতিয়ে রাখার ব্যাপারটা ছিল একদম তাঁর নখদর্পণে। সিনিয়র, জুনিয়র সবার সাথেই ছিল খুব ভালো সম্পর্ক। তখনকার বাংলাদেশ দলের কোচ ডেভ হোয়াইটমোরেরও অন্যতম প্রিয় শিষ্য ছিলেন রানা।

মানজারুল ইসলাম রানা ছিলেন মনে প্রাণে একজন ক্রিকেটার। ছোটবেলা থেকেই রানা ছিলেন ক্রিকেট-উন্মাদ। স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে ক্রিকেটার হবার। তখন রাতে  বিছানায় ব্যাট, বল নিয়ে ঘুমানোর ঘটনা রানার ক্রিকেট পাগলামিরই একটি উদাহরণ।

দিনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি পার করতেন মাঠে ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে। তাছাড়া রানা শুধু মাঠেই বোলিং করতেন না। রাস্তাঘাট এমনকি ঘরেও বল করতেন। রাস্তায় চলার সময় বা বাসায় অবসরের সময় খালি হাতেই একের পর এক ডেলিভারি দিতে থাকতেন রানা।

ক্রিকেটের নেশায় সারাক্ষণ বুদ হয়ে থাকায় রানাকে প্রায়শই বকুনি খেতে হতো মায়ের কাছ থেকে। তারপর মা নিজেই একটা সময় ছেলের এই পাগলামির কাছে হার মানেন। রানার মত তিনিও একসময় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ছেলেকে লাল সবুজের জার্সি গায়ে দেখার।

২০০৩ সালে রানা ও তাঁর মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে পথচলা শুরু হয় মাঞ্জারুল ইসলাম রানার। অভিষেক ম্যাচ খেলতে নেমেই রানা করে বসেন এক রেকর্ড। নিজের করা তৃতীয় বলেই মাইকেল ভনকে স্ট্যাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম ওভারেই উইকেট তুলে নেয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি।

অভিষেক ম্যাচে রেকর্ড করলেও অভিষেক সিরিজে বলার মত তেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি তিনি। তিন ম্যাচের ওই সিরিজে ব্যাট হাতে রানার সংগ্রহ ৪৬ রান এবং বল হাতে মাত্র একটি উইকেট। ঠিক এর পরের সিরিজেই টেস্ট অভিষেকও হয়ে যায় তাঁর। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের পর একই বছর মাত্র দুটি টেস্ট সিরিজ খেলে দল থেকে বাদ পড়ে যান রানা।

তারপর আর কোন টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়নি তাঁর। মাত্র ৬ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে ২৫.৭০ অ্যাভারেজে তাঁর সংগ্রহ ২৫৭ রান এবং বোলিংয়ে সংগ্রহ পাঁচটি উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটের এই ছোট্ট ক্যারিয়ারে অবশ্য একটি রেকর্ডের ভাগিদার রানা। ২০০৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁর ও হাবিবুল বাশারের ১২০ রানের জুটিটা চতুর্থ উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।

টেস্ট অভিষেকের মাত্র ১০ মাস পর দল থেকে বাদ পড়লেও ওয়ানডেতে রানা খেলে যাচ্ছিলেন নিয়মিত। আর ওয়ানডেতে নিজের সেরা খেলাটা তিনি খেলেন ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হোম সিরিজে। ওই সিরিজের তৃতীয় ও চতুর্থ ম্যাচে টানা ম্যাচসেরার পুরস্কার পান রানা।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওই সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ হেরে সিরিজ হারের শঙ্কায় পড়ে যায় বাংলাদেশ। সিরিজ রক্ষার তৃতীয় ম্যাচে রানার ক্যারিয়ারসেরা ৩৪ রানে ৪ উইকেট ও ৪র্থ ম্যাচে ৩৬ রানে ৪ উইকেট বাংলাদেশকে সিরিজ হারের লজ্জা থেকে রক্ষা করে।

পরবর্তীতে শেষ ম্যাচটি জিতে ৩-২ এ সিরিজ জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম কোন ওয়ানডে সিরিজ জয় যেখানে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল মানজারুল ইসলাম রানার।

ওয়ানডে ক্যারিয়ারে মানজারুল ইসলাম রানা খেলেন ২৫ টা ম্যাচ। ২০.৬৮ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ৩৩১ রান যেখানে রয়েছে একটি হাফ সেঞ্চুরি। আর বোলিংয়ে ৪.১৫ ইকোনোমিতে রানার সংগ্রহ ২৩ উইকেট।

২০০৫ সালের জিম্বাবুয়ে সিরিজের পরের কয়েকটি সিরিজে সাদামাটা পারফরম্যান্স করতে থাকায় একাদশে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন মাঞ্জারুল ইসলাম রানা। তারপর ২০০৬ সালে ঘরের মাঠে কেনিয়ার বিপক্ষে চার ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচটি খেলে দল থেকে বাদ পড়ে যান তিনি।

সেই যে বাদ পড়া তারপর আর দলে ফেরা হয়নি তাঁর। আর ফিরবেনই বা কী করে! জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার এক বছরের মধ্যে যে পৃথিবী থেকেই বিদায় ঘন্টা বেজে যায় তাঁর।

২০০৭ সালে আজকের এই দিনেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে যায় মাত্র ২২ বছর বয়সী মানজারুল ইসলাম রানার জীবনপ্রদীপ। দশটি বছর কেটে গেল রানা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। হয়ত এখন স্বর্গের সবুজ গালিচায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ২২ গজে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন রানা।

হয়ত তাঁর বাঁ-হাতের ভেলকিতে ব্যাটসম্যানরা খাবি খাচ্ছে। নিশ্চয়ই মজা করে মাতিয়ে রাখছেন স্বর্গের সবাইকে। রানার খালি হাতে বল করা দৃশ্য দেখে হয়ত গগণফাটা হাসিতে মেতে উঠেন স্বর্গের বাকিরা। তাঁর এই ক্রিকেট পাগলামিকে নিশ্চয়ই স্বর্গের বাকিরা উপভোগ করছেন। হয়ত স্বর্গে বসেই দেখছেন প্রিয় বন্ধু মাশরাফিকে। দেখছেন তাঁরই মত বাঁহাতি অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে যিনি বিশ্বসেরা মুকুট মাথায় লাল সবুজের প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বব্যাপি।

হয়ত মাশরাফির মতই কাউকে পেয়ে গেছেন স্বর্গে। প্রিয় বন্ধু বানিয়ে যার সাথে গল্প করেন বিশ্বসেরা সাকিবের, গল্প করেন মাশরাফি ও তাঁর দলের প্রত্যেকটি সাফল্যের। কিছুটা আক্ষেপও করেন হয়ত সাকিবের মত একজন বিশ্বসেরাকে খেলোয়াড়ি জীবনে স্পিন পার্টনার হিসেবে না পেয়ে।

আফসোস আমরাও করি সাকিব ও রানাকে একসাথে বোলিং করার দৃশ্য দেখতে না পেরে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য এক্ষেত্রে বড়ই নিষ্ঠুর। কারণ দুই প্রান্ত থেকে সাকিব ও রানার বোলিং করার সে সৌন্দর্য উপভোগ করার সৌভাগ্য যে আমাদের হয়নি।

ছোট্ট ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগতভাবে মাত্র একটি রেকর্ড করতে পারা রানা রেকর্ড করে গেছেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েও। কারণ তিনিই সবচেয়ে কমবয়সী টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। রানার এই রেকর্ডে এখন পর্যন্ত আঁচড় কাটতে পারেনি কেউ। রেকর্ড তো গড়াই হয় ভাঙ্গার জন্য।

তাই রানার আগে টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার আর্ছিবেল্ড জ্যাকসনের সবচেয়ে কম বয়সে মৃত্যুর রেকর্ডটা যে ভাঙারই ছিল। কিন্তু সেই রেকর্ড কেন আমাদের রানাকেই ভাঙতে হলো? এমন একটা রেকর্ডের মালিক হতে কখনওই চাইনি আমরা! এমন রেকর্ড আমরা কেউই চাইনি যা আগামীতে আরো অনেক রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনাকে চিরতরে নিষ্পেষ করে দেয়। চাইনি আমরা বিধাতার এমন নিষ্ঠুরতা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।