আইটেম গানের বিবর্তন: স্বস্তা ফর্মুলা নাকি শক্তিশালী মাধ্যম?

আইটেম সং, আইটেম নাম্বার কিংবা অঞ্জন দত্তর ভাষায় দুষ্টু গান – যে নামেই ডাকি না কেন ব্যাপারট যে এখন বলিউডের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা আর অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আইটেম গানের সংজ্ঞা আসলে কি? – এটা এমন একটা গান, যার সাথে সিনেমার প্লটের সংযোগ থাকে খুব সামান্যই। গানের সাথে নাচ, যার ফলে, দর্শকদের বিনোদনের বাড়তি একটা মাত্রা যোগ হয়।

বলিউডের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’ (১৯৩১)। সেই সিনেমায় গান ছিল সাতটি। কালক্রমে বলিউডি চলচ্চিত্রের গানে হরেক রকমের ধারা বেরিয়েছে। তার মধ্যে একটি হল আইটেম নাম্বার। কালক্রমে এখনকার বানিজ্যিক সিনেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ আইটেম নাম্বার। সমালোচক, চলচ্চিত্র বোদ্ধা কিংবা নারীবাদীদের হাজারো সমালোচনার পরও এর আসন টলেনি। বরং, কালক্রমে হয়েছে আরো আকর্ষণীয়।

ত্রিশের দশকে আজুরি আইটেম গার্ল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এরপর পঞ্চাশের দশকে কাক্কু মোরে আইটেম গানের জগতে নিজেকে তারকা হিসেবে প্রমাণ করেন। পঞ্চাশের দশকে বলিউড পেয়েছিল বিজয়ন্তীমালাকে। সুন্দরী, নৃত্যে পটু এই অভিনেত্রী আইটেম গানের সাথে শাস্ত্রীয় নৃত্যের যোগসূত্র স্থাপন করে গিয়েছেন।

আইটেম গানের প্রসঙ্গ উঠলে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন হেলেন অ্যান রিচার্ডসন। যিনি দর্শকমহলে ‘হেলেন’ নামে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে কাক্কুর হাত ধরে বলিউডে আসা এই রূপবতী বলিউডকে দুই দশকে উপহার দিয়েছেন হিট সব আইটেম গান। মোহাবিষ্ট করেছেন দর্শকদের।

উপহার দিয়েছেন ‘মেরা নাম চিন চিন চু’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘ইয়ে মেরা দিল’-এর মত কালজয়ী আইটেম গান। আইটেম গানের জগতে তিনি ছিলেন মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী। সমসাময়িক মধুমতী, বেলা বোস, অরুণা, সুজাতা বকশিদের থেকে তিনি ছিলেন যোজন যোজন এগিয়ে।

এরপর যুগ বদলাল। বদলাল দর্শকদের রুচি। আশির দশকে দর্শকেরা আইটেম গার্ল হিসেবে সিনেমার নায়িকাদেরই পছন্দ করতে লাগলেন। ‘মোহিনী’ হিসেবে খ্যাত মাধুরী দীক্ষিত ‘তেজাব’ (১৯৮৮) সিনেমায় ‘এক দো তিন’ আইটেম গানে পারফর্ম করেন। এই গানটা ঝড়ের গতিতে তাঁকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়।

আইটেম গান যেমন তাঁকে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে, তেমনি বিতর্কিতও করেছে। ‘খলনায়ক’ (১৯৯৩) সিনেমার আইটেম গান ‘চোলি কে পিছে ক্যায় হ্যায়’ জন্ম দিয়েছিল অজস্র বিতর্কের। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির বিবেচনায় ২০১৩ সালে গানটি বলিউড ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজক গান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় শাহরুখ খান ও মনীষা কৈরালা অভিনীত চলচ্চিত্র ‘দিল সে…’। এই সিনেমায় মালাইকা অরোরার আইটেম গার্ল ‘ছাইয়া ছাইয়া’ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়। ২০০২ সালে বিবিসির চালানো জরিপ অনুযায়ী গানটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দশ গানের একটি। ১৯৯৯ সালে শিল্পা শেঠিকে আইটেম নাম্বার হিসেবে দেখা যায় ‘শূল’ সিনেমায়।

এরপর বলিউড পা রাখে একবিংশ শতাব্দীতে। বলিউডের অভিনেত্রীরা আইটেম গানকে তারকাখ্যাতি পাওয়ার সহজ উপায় মনে করতে লাগলেন। বলিউড পেল ইয়ানা গুপ্তা, মালাইকা অরোরা ও মল্লিকা শেরাওয়াতের মত আইটেম গার্লদের।

আইটেম গানের জগতে যে বলিউড অভিনেত্রীর নাম উল্লেখ না করলে নয়, তিনি হলেন ক্যাটরিনা কাইফ। ২০১০ সালে তিনি ‘শিলা কি জাওয়ানি’ আইটেম গানে পারফর্ম করে। গানটি টেক্কা দিয়েছিল মালাইকা অরোরার ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি’র সাথে। এছাড়াও ক্যাটরিনাকে আইটেম গার্ল হিসেবে দেখা গিয়েছে ‘চিকনি চামেলি’, ‘বডিগার্ড’ গানে।

বলিউড অভিনেতাদেরও এই শতাব্দীতে দেখা গিয়েছে ‘আইটেম বয়’ রূপে। অভিষেক বচ্চন থেকে শুরু করে এই তালিকায় যুক্ত হন শাহরুখ খান, ঋত্বিক রোশন ও রণবীর কাপুর। এমনকি স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনও এই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।

ইন্দো-কানাডিয়ান অভিনেত্রী সানি লিওন একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে উপহার দিয়েছেন ‘লায়লা’, ‘বেবি ডল’, ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’র মত হিট আইটেম নাম্বার। এ কালে এসে তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ছেন উর্বশি রাউঠেলা। হাল আমলে আইটেম গানের দিক থেকে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রমাণ করে ফেলেছেন নোরা ফাতেহি।

বর্তমানে বলিউডের টপ অভিনেত্রীদের দীপিকা পাডুকোন, ক্যাটরিনা কাইফ, জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ, শ্রদ্ধা কাপুর, কারিনা কাপুর, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার নাম উল্লেখযোগ্য। এদের সবাইকেই আইটেম গার্ল হিসেবে পেয়েছে দর্শকমহল।

আইটেম গানের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা আছে। পক্ষের লোকদের মতে আইটেম গান চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে। তখন সমালোচকরা ‘পিকে’, ‘বাজরঙ্গী ভাইজান’, ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর উদাহরণ টানেন যেসব সিনেমায় আইটেম নাম্বারের কোনো বালাই ছিল না।

তবে ইউটিউবে মোস্ট ভিউড হিন্দি গানের তালিকায় আইটেম গানের উপস্থিতি জানান দেয়, গানগুলো কেমন জনপ্রিয়। প্রতিষ্ঠিত বলিউড বিশ্লেষক ও সমালোচক কমল মেহতা ও তারান আদর্শদের মতে আইটেম গান ভূমিকা রাখে সিনেমার বাণিজ্যে। অভিনেত্রী অদিতি রাও হায়দারি বলেছেলিন, ‘আমি আইটেম গান ঘৃণা করি।’

আরেক অভিনেত্রী কালকি কোচলিন পারিবারি সিনেমায় আইটেম গানের বিপক্ষে কিন্তু পরিণত সিনেমায় আইটেম গান রাখার পক্ষে। কঙ্গনা রনৌতের মতে, ‘আইটেম গান নিষিদ্ধ করা উচিত।’ ভারতের নারী অধিকার সংস্থা আকশারা সেন্টারের মতে, ‘বলিউডের আইটেম গান নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়াচ্ছে।’

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘যস্মিন দেশে যদাচার।’ বলিউডের দর্শকেরা আইটেম গান পছন্দ করে এটা এর সমালোচকেরাও স্বীকার করে নেবেন এক বাক্যে। সেজন্য বলিউডি সিনেমায় দেখা যাচ্ছে আইটেম গান। অদূর ভবিষ্যতেও আইটেম গান হিন্দি ফিল্মে দেখা যাবে বলেই মনে হয়।

তবে হ্যাঁ,কালের বিবর্তনে মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটে। হয়ত আমরা ভবিষ্যতে নতুন ধারার আইটেম গান দেখব। কিংবা, সমালোচকদের চাপে আইটেম গান হয়ত হারিয়ে যাবে বলিউডি সিনেমা থেকে। কিংবা এমনও তো হতে পারে যে, সিনেমা থেকে গানই উঠে গেল!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।