সম্রাট শাহজাহান ও স্থাপত্য ভাবনার এক বিস্ময়

এই নিয়ে দু’বার আগ্রার তাজমহল আর দিল্লীর লাল কেল্লা দেখা হল। কি বলবো আসলে সেই কয়েকশত বছর আগের পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া সম্রাটের প্রতি ভালোবাসা যেন হুট করেই বেড়ে গেছে! কেনই বা বাড়বেনা? মাত্র তিনটি স্থাপনা দেখেই তো আমি সম্রাটের প্রতি অভিভূত। তাজমহল দেখেছিলাম সেই ২০১২ সালে প্রথমবার।

এরপর দিল্লীর লালকেল্লা দেখেছিলাম ২০১৫ সালের একদম প্রথমে। প্রথমবার তাজমহল দেখে যে মুগ্ধতা, যে আবেশ আর যে আবেগে আবিলুপ্ত হয়েছিলাম সেকথা আগে বলেছি বেশ কয়েকবার। আর প্রথমবার লালকেল্লা দেখে যতটা আবেগে ভেসেছি তার চেয়ে অনেক বেশী অবাক হয়েছিলাম আগ্রা দুর্গের সাথে নিজে নিজেই এর তুলনা করে।

যাই হোক, এরপর এলো ২০১৮ এর শেষ। নানা রকম অপরিকল্পিত ভ্রমণের শেষ দিকে এসে যাওয়া হল আগ্রা। সেই অপূর্ব স্থাপনা তাজ মহল দেখতে। আমি মনে মনে দারুণ খুশি, তবে অপ্রকাশিত অবশ্যই। এই স্থাপনা নিয়ে বেশী আবেগের প্রকাশ করাটা ঠিক হবে কিনা সেই শঙ্কায়। খুব অল্প সময়ের জন্য তাজমহলের শীতল পরশ আর অপরূপ রূপের সুধা পান করে পরদিন যাওয়া হল দিল্লীর লাল কেল্লায়।

আগেও এখানে গিয়েছি তবে এবার যেভাবে লাল কেল্লা দেখেছি, সেভাবে আগে দেখিনি। আসলেই সেই চোখই যে তখন ছিলোনা আমার। আর সেই সাথে আবারো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে সেই আগ্রা দূর্গের কথা। কারন দুটো স্থাপনা অনেকটা একই, শুধু আকারে ছোট আর বড় মানে বিশাল।

আজকে তাজমহল বা আগ্রা দূর্গের কথা না বলে শুধু রেড ফোর্ট  বা লাল কেল্লার বিস্ময়ের কথা বলতে ইচ্ছা করছে। লালকেল্লার প্রবেশের শুরুতেই তার বিশাল প্রাচীন প্রাচীর বিস্ময় জাগায় এতো এতো বছরের পুরনো স্থাপনা কিন্তু আকাশে মাথা উঁচু করে এখনো ঠায় দাড়িয়ে আছে তার সেই প্রাচীন মহিমা প্রচার করে।

একটু সামনে এগিয়ে গেটের কাছাকাছি যেতেই অবাক হয়ে যাই বিশাল খালের মত চওড়া আর গভীর করে পরিখা খনন করা আছে নিরাপত্তার জন্য। যেন সেই সময় যে কেউ, কোন শত্রুপক্ষ বা ক্ষতি সাধন করতে পারে এমন কেউ যেন মুল গেট ছাড়া, অননুমোদিত ভাবে কোন ভাবেই যেন কেল্লায় প্রবেশ করতে না পারে তেমন ব্যাবস্থা। আর এই পরিখা বা চওড়া ও গভীর খালের মত নিরাপত্তা বেষ্টনি রয়েছে পুরো কেল্লার চারপাশ জুড়েই।

ভিতরের আধুনিক নিরাপত্তা বেষ্টনি পার হয়ে ভিতরে ঢুকে, কোন রকমে প্রাচীরের দুপাশের দোকান পেরিয়ে যেতেই আরও আরও অবাক করা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। নাহ, সবার কাছে এইসব বাগান, মাঠ, ফোয়ারা, আনুষ্ঠানিক মঞ্চ, সভা করার নির্ধারিত যায়গা, এসব তেমন ভালো লাগবেনা। হয়তো সেভাবে বিশেষ কিছু চোখে নাও পড়তে পারে, তবে আমি দেখেছি, হেঁটেছি, অনুভব করেছি আর বিস্মিত হয়ে অপলক তাকিয়ে থেকেছি এক, একটা আলাদা আলাদা স্থাপনা আর তার চারপাশের প্রকৃতি ও তার সাঁজের দিকে।

দেখেছি আর ভেবেছি কতটা সুক্ষ ভাবনা আর কতটা দূরদর্শী চিন্তা থাকলে আজ থেকেও কয়েকশ বছর আগেই এই উপমহাদেশের কোন একজন সম্রাট এমন নান্দনিক, এমন আভিজাত্যপূর্ণ, এমন নিরাপত্তা সমন্বিত, এমন বিশাল কোন আয়োজন করতে পারে! কতটা বিলাসী আর কতটা আয়েশী হলে একজন সম্রাট তাঁর আবাসনেই পুষতে পারেন বাঘ, সিংহর মত হিংস্র পশু।

কতটা রোমান্টিক আর কতটা গভীর হৃদয়ের হলে একজন সম্রাট তাঁর প্রশাসনিক বাসভবনেই গড়ে তুলতে পারেন রঙ্গমঞ্চ। সময় কাটানোর উন্মুক্ত পাথুরে বেদী তৈরি করেছেন মুক্ত বাতাস গায়ে মেখে উন্মুক্ত আকাশ দেখার জন্য। কতটা অদম্য হলে এতো অঢেল সম্পদ অকাতরে খরচ করা যায়, তাঁর দৃষ্টান্ত যেন এই প্রাসাদ।

পুরো লাল কেল্লার অর্ধেকটাও দেখতে পারিনি মনের মত করে। মাত্র একটি পাশ দেখেছি প্রায় চার ঘণ্টা সময়ে। তার পরেও যেন কিছুই দেখা হলনা যে আর যেভাবে দেখতে চেয়েছিলাম। বাকি অর্ধেক তো রয়েই গেছে অদেখা। মমতাজ মহল, ছোট ছোট যাদুঘর, নানা রকম বাগান আর ব্যাক্তিগত সামগ্রীর সংরক্ষণ।

সেসব পুরোটা দেখতে হলে পুরো একটা দিনও বোধয় যথেষ্ট হবেনা মনে হল। হবে কি করে, যদি সত্যিকারের ভাবে কেউ দেখতে চায়, যদি শুধু কপালের নয় মনের চোখ দিয়ে দেখতে চায়, আর কেউ যদি অনুভব করতে চায় সেই ইতিহাস, প্রাচীন ঐতিহ্য, গাছে, ঘাসে, লতায়, পাতায়, পাথরে, মাটিতে আর মাঠেঘাটে পুরনো সেই স্বাদ তবে তো একদিনেও ঘুরে দেখার সাধ মিটবেনা সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

পাথরের উপরে কি কারুকাজ, বাগানের কি বিশালতা, ফোয়ারার কি বিলাসিতা, স্থাপনার কি আভিজাত্য, সিংহাসনের কি গাম্ভীর্য, লালকেল্লার বিস্তার আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর সেসব দেখে দেখে আমি প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটি কাজে, তার সাথে মিশে থাকা ইতিহাসকে একটু একটু করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম, শিহরিত হচ্ছিলাম আর সম্রাটের প্রতি আবেগে, আবেশে, আকুলতায় যেন অবনত হয়ে যাচ্ছিলাম।

তার ভাবনা দেখে, তার বুদ্ধির কাজ দেখে, তার দর্শন বুঝতে পারে, তার আধুনিক মানসিকতা অনুভব করে, তার আভিজাত্য আর ঐতিহাসিক সমন্বয় দেখে।

সত্যি, শাহজাহান শুধু একজন সম্রাট, একজন শাসক, একজন প্রেমিক, একজন স্থাপত্যবিদ আর একজন বিলাসী মানুষই ছিলেননা। আমার মতে সম্রাট শাহ্‌জাহান ছিলেন এই উপমহাদেশের একজন বিস্ময়কার এবং অবাক করা প্রতিভা। তাঁকে তাই ভালোবাসতে ইচ্ছা হয়, যাকে জানতে, মানতে আর সত্যিকারের ভক্তিতে কুর্নিশ করতে ইচ্ছা হয় নির্দ্বিধায়।

এমনই তার মহিমা, তার চিন্তা-চেতনা, ভাবনা আর নানা রকম স্থাপনায় সেসবের নিদর্শন, প্রমাণ আর ইতিহাসের সাক্ষী।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।