রেস্টুরেন্ট কালচারের অলিগলি: গোপন দুনিয়ার অন্ধকার দরজা

বাণিজ্যে লক্ষ্মী, বাণিজ্যেই বসতি। একথাটি সন্দেহাতীতভাবে সত্য। তবে আজকালকার প্রেক্ষাপট দেখে আরেকটা কথা সহজেই বলে দেয়া যায়। তা হল, বিজ্ঞাপনে বিপণন, বিজ্ঞাপনেই বাণিজ্য। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ব্যবসায়ীরা কীভাবে বিজ্ঞাপনকে একটি অব্যর্থ বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে? সেটা জানতে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে।

এটাতো সবার জানা যে আজকে আমরা বিজ্ঞাপন বলতে যা বুঝি, তার হাতেখড়ি হয়েছিল প্রাচীন মিশরীয়দের হাতে। তারাই প্রথম পোস্টার ও ক্যাম্পেইন এর প্রচলন ঘটিয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞাপনের ইতিহাসের সুচনা ঘটে পঞ্চদশ শতাব্দীর ব্রিটেনে, যখন একটি প্রার্থনা বই বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সর্বপ্রথম, যারা বিজ্ঞাপনকে একটি কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। পুঁজিবাদি মুল্যবোধকে ব্যবহার করে বানিজ্যের প্রসার বৃদ্ধির এই মার্কিনি প্রচেষ্টাকে অনেকেই বাকা চোখে দেখেছেন। কিন্তু ব্র‍্যান্ডিংয়ের এই ধারণাটি যে আমেরিকানদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত, এব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

আশির দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙন, চীনের উত্থান এবং ভারতের গণতন্ত্রায়নের ফলে বিশ্ব জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ ভোক্তাবাদের দিকে ঝুকে পড়ে। যার ফলে বিখ্যাত বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো গ্লোবাল হয়ে উঠতে শুরু করে।

যতই দিন গড়াতে থাকে, এই বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসা দখল নিয়ে একটা ছোটখাটো ‘কোল্ড ওয়ার’ জমে ওঠে। প্রত্যেকেই চাচ্ছিল, অন্যকে পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠে যেতে। উদ্ভাবিত হতে নানা কৌশল আর প্রযুক্তি, যা সূচনা করে বিপণন জগতের রেনেসাঁর।

আজ, এই বিশ্বায়নের যুগে, বিপণন ও বিজ্ঞাপন পরস্পরের হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে। এই পথচলার পেছনে যে সেই রেনেসাঁর অবদান ছিল, তা বোধহয় আর বুঝিয়ে দেয়ার দরকার নেই।

সেই আলোকে চলুন দেখা যাক, ফাস্ট ফুড বিপণনে বিজ্ঞাপনের বহুমুখী ব্যবহারের কিছু দিক।

  • ফাস্ট ফুড মার্কেটিং

অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ‘ফাস্ট ফুড’ শব্দটি ইঙ্গ-মার্কিন হলেও ফাস্ট ফুড নামে আমরা যা খাই, তার কোনোটিই ব্রিটিশ বা আমেরিকান নয়। ১৯৫১ সালে মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে সংযুক্তির আগে, এ শব্দটিও কোনো বিশেষ অর্থ বহন করতো না। আর বর্তমানে ফাস্ট ফুড একটি আন্তর্জাতিক শিল্প, যা মার্কিন সংস্কৃতি দ্বারা তুমুল ভাবে প্রভাবিত, প্ররোচিত এবং প্রযোজিতও বলা চলে।

ফাস্ট ফুড ব্যবসার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ম্যাকডোনাল্ডস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪০ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিকূল পরিবেশে নানা ছোটখাটো হোচট খেলেও কখনো আছাড় খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। বরং নিজেদের অভিনব বিপণন কৌশল খাটিয়ে ম্যাকডোনাল্ডস ১৯৪৬ সালের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করে ফেলে।

ম্যাকডোনাল্ডসের এই বড়ভাইসুলভ আচরণ অন্যদের কাছে বোধহয় একটু দৃষ্টিকটুই লেগেছিলো। তাইতো একবিংশ শতাব্দী আসতে না আসতেই অন্যান্য ফাস্ট ফুড প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ বিপণন কৌশল উদ্ভাবন করতে শুরু করে। যার ফলে ম্যাকডোনাল্ডসের ব্যাবসা হুমকির মুখে পড়ে যায়। এদের মধ্যে ছিল ইয়াম্মি ব্র্যান্ডস, কেএফসি, পিজা হাট, ডমিনো’স ইত্যাদি।

অন্যান্য ব্র‍্যান্ডগুলোর এই বিপণন আগ্রাসনের ফলে ম্যাকডোনাল্ডসস এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে, যাকে আমাদের ভাষায় ‘ক্রান্তিকাল’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ ক্রান্তিকালের সাথে পাল্লা দিতে তাদের বিপণন কৌশলগুলি আরো বেশি উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে শুরু করে।

এইসব ইতিহাস হয়তো অনেকেরই জানা। তবে, ম্যাকডোনাল্ডস তাদের রেস্টুরেন্টে ভোজনরসিকদের প্রলুব্ধ করার জন্য যেসব কৌশল ব্যবহার করতো, তাও অনেকেরই অজানা। যদিও এখন বেশীরভাগ ফাস্ট ফুড শপগুলো এ কৌশলগুলো ব্যবহার করছে, তবুও এর পথিকৃৎ হিসেবে ম্যাকডোনাল্ডসকেই কৃতিত্ব দিতে হয়।

তাহলে ম্যাকডোনাল্ডসের সাফল্যের পেছনে সেই এক্স ফ্যাক্টরগুলো কি ছিল? চলুন দেখে আসা যাক।

  • বিলবোর্ড প্রদর্শন

ভাল বিলবোর্ড কিংবা বিজ্ঞাপন হাউজিং, গ্রাহকদের পৌঁছানোর জন্য ফাস্ট ফুড শিল্পের মূল ভিত্তি একটাই। যেহেতু তাদের গ্রাহকদের প্রথমে তাদের রেস্তোরাঁর মধ্যে পেতে হবে, তাই তাদের গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিকগুলির মধ্যে একটি হল ‘ফুটফল’। এখন অনেকেই প্রশ্ন করবেন, ‘আচ্ছা ভাই, ফুটফল কি? আর এটা দিয়ে করেইবা কি?’ ফুটফল হল নির্দিষ্ট কোনো সময়ে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করা ব্যক্তিদের সংখ্যা। আর গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার অন্যতম একটি উপায় হল বিলবোর্ড বা চিহ্ন ব্যবহার করা। এবং ম্যাকডোনাল্ডস এই কৌশলটি তাদের ব্যাবসার জন্য চমৎকার ভাবে ব্যবহার করে।

ধরা যাক, আপনি কোনো হাইওয়ে রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনার বর্তমান অবস্থান থেকে পরবর্তী ফুড শপটির দুরত্ব এক কিলোমিটারেরও বেশি। কিন্তু আপনি লক্ষ্য করবেন, ইতোমধ্যে ফুড শপটির সাইনবোর্ড-পোস্টার আপনার নজরে পড়তে শুরু করেছে। এখানে এই সাইনবোর্ড বা পোস্টারগুলোর পুনঃপুন প্রদর্শনের ফলে আপনার মস্তিষ্কে বারবার সংকেত যেতে থাকে। যার ফলে ক্ষুধা না থাকা সত্ত্বেও ফাস্ট ফুড খেতে আপনি উৎসাহী হয়ে উঠবেন।

এখানে স্লোগানেরও ভুমিকা অনেক।‘ইট ফ্রেশ’ কথাটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাজা লেটুস আর সালাদের ছবি। এতে করে জিভে জল তো আসেই, সেইসাথে মস্তিষ্ক এসব খাবার গ্রহণে উদ্দীপিতও হয়।

তাই অনেকে প্রশ্ন করেন, বাচ্চা-কাচ্চাদের পেট ভর্তি থাকলেও ফাস্ট ফুড দোকানের সামনে আসলে তারা কেন চেঁচামেচি শুরু করে দেয়?

কারণটা এখন আপনারা জানেন।

  • সুবাস বিপণন

কথায় আছে, ঘ্রাণেই অর্ধভোজন। তাই ম্যাকডোনাল্ডস ঘ্রাণ-সৌরভ কেও তাদের বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করা থেকে বাদ দেয়নি।

ম্যাকডোনাল্ডস তাদের রেস্তোরাসমূহ এমন ভাবে ডিজাইন করে, যেন হেশেলে রান্না করা খাবারগুলোর ঘ্রাণ সহজেই পথচলতি মানুষদের প্রলুব্ধ করতে পারে। এটা অনেকটা ফুলের সুবাসের মাধ্যমে পতঙ্গদের প্রলুব্ধ করবার মতো। এতে করে নিতান্ত অনিচ্ছুক কাস্টমাররাও খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাদের ক্ষুধাবর্ধক হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থিগুলো উদ্দীপ্ত হয়, আর তার পরে কি ঘটে, সেটাতো আপনি জানেনই।

  • শব্দচয়ন

কিছু কিছু ফাস্ট ফুড শপ তো আরেক কাঠি সরেস। তারা তাদের বিজ্ঞাপনী পোস্টার, ব্রোশিয়ার কিংবা লিফলেটে প্রস্তুতকৃত খাবারগুলোর নাম নির্বাচন অথবা বর্ণনা এতো রসিয়ে রসিয়ে করে যে, একবার শোনা মাত্রই কাস্টমার তাতে মজে যায়। অনেকটা সম্মোহিতের মতোই সে রেস্তোরার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে। এবং ম্যাকডোনাল্ডস এটা ভালো করেই জানে- যখনই আপনি হাঁটবেন, তখনই আপনি কিনবেন।

(মজার হলেও সত্য: এই কাজের জন্য কনসালটেন্সি কোম্পানিও আছে। তাদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হল ‘ScentAir’।)

  • কালার কোডিং

এমন কোনো ফাস্ট ফুড ফ্র‍্যাঞ্চাইজির কথা ভাবুন তো, যেখানে কিছুদিন আগেই আপনি ব্রেকফাস্ট বা লাঞ্চ

করতে গিয়েছিলেন? তাদের লোগোটি মনে করার চেষ্টা করুন। লাল, নীল, কমলা, হলুদ বাদে কোনো রঙ ছিল কি?

আপনি যদি বুদ্ধিমান হয়ে থাকেন, তাহলে ইতোমধ্যেই ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন।

লসম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই রঙগুলো আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতিকে উস্কে দেয়। যার ফলে প্রায়ই রাস্তা দিয়ে হেটে যাবার সময়, কোনো ফাস্ট ফুড কর্নারের সাইনবোর্ডের দিকে নজর পড়লে আমরা একটু থমকে দাড়াই। চিন্তা করি, এখান থেকে নাস্তাটা সেরে গেলে কেমন হয়?

তাছাড়া খেয়াল করে দেখবেন এসব প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাইনবোর্ড ও লোগো তৈরির সময় একটা বিশেষ বিষয়ে নজর রাখে। আর তা হল, লাল রঙয়ের আধিক্য। যাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা আছে, তারা নিশ্চয়ই জানেন, লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়াতে এটি অনেক দূর থেকেও চোখে পড়ে। আর সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই লাল আলো বা রঙ আমাদের কাছে সতর্কতা আর পুনর্মূল্যায়নের প্রতীক। তাই আমাদের মস্তিক যখনি ওই ফুডশপের সাইনবোর্ডের লাল রঙ দেখতে পায়, তখন সে নিজের অজান্তে বলে ওঠে, আরে! দাড়াও! যাচ্ছো কোথায়? এখান থেকে একটা সাবওয়ে স্যান্ডউইচ খেয়ে গেলে ক্ষতি কিসের?

তাই এরপর থেকে আপনার আশপাশের ফাস্ট ফুড শপের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার লক্ষ্য করবেন এই চিহ্নগুলো নজরে পড়ে কিনা। যদি পড়ে, তাহলে তাদের চুটিয়ে ব্যবসা করা দেখে মোটেও অবাক হবেন না। কারণ রহস্যটা তো আপনি এখন জানেন!

পুশক্রু.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।