রবীন্দ্র কৌশিক: একজন র এজেন্ট কিংবা এক পাকিস্তানি মেজর

রাজ্যস্থানের একদম শেষ মাথায় ছোট একটা শহর। নাম শ্রী গঙ্গানগর। শহরটা শেষ হলেই পাকিস্তান বর্ডার। মাঝে মরুভূমি। এই শহরেই ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিস `র’ মানে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের সবচেয়ে প্রোফাইলিক এজেন্ট জন্ম নেয় ১৯৫২ সালে। তার নাম রবীন্দ্র কৌশিক। একদম সাদামাটা পরিবারে জন্ম নেয়া এই ছেলের ইন্টেলিজেন্স লেভেল ছিল বাকি সবার থেকে অনেক উপরে আর অভিনয় দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। ফলে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে কলেজে থাকা অবস্থাতেই।

ভারতে প্রতি বছর ন্যাশনাল লেভেল ড্রামা মিট হয়। সেখানে প্রতিটা রাজ্য থেকে সেরা দল আসে প্রতিনিধিত্ব করতে। সেবার এই মিট ছিল লখনৌতে। রবীন্দ্র আসে রাজস্থানের প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর থিয়েটার পারফরমান্সে সবাই মুগ্ধ। অনেকেই বলে যে দিল্লী বা মুম্বাইয়ে গিয়ে অভিনয়ে যোগ দিতে। এই দর্শক সারিতে ছিল র’এর তিন জন হাই অফিশিয়াল। তাদের নজরে পড়ে যায় রবীন্দ্র। তাঁকে অফার করা হয় দেশের জন্য কাজ করার জন্য। সে রাজিও হয়ে যায়!

র’এর প্ল্যান ছিল কৌশিকের মত ন্যচারাল ট্যালেন্টকে তারা জেমস বন্ডের মত ফিল্ড এজেন্ট না বানিয়ে ‘আন্ডার কাভার এজেন্ট’ বানাবে যারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিচয়ে থেকে, ভারতকে ইনফরমেশন দেয়। ঠিক করা হয় কৌশিক কে ভারতের ১ নম্বর শত্রু পাকিস্তানে পাঠানো হবে। সেরাদের সেরারাই শুধু এজন্য সিলেক্টেড হয়। কিন্তু কৌশিক তো সনাতন ধর্মবলম্বী। কি করা যায়?

যে সময় কৌশিককে র অফার দেয় তখন তার বয়স মাত্র ১৯। সে পরিবার ছেড়ে দিল্লীতে চলে আসে। র তাকে পুরো ২ বছর এসপিওনাজ ট্রেনিং দেয়। কিভাবে ইন্টেলিজেন্স কালেক্ট করা লাগে, কিভাবে ফলো করতে হয়, কিভাবে লোকজনের ভীরে কাভার নিতে হয়, কিভাবে স্যাবোটাজ করতে হয় ইত্যাদি।

এমনকি সুন্নতে খৎনাও করানো হয় মুসলিম বানানোর জন্য। পাকিস্তানি সংস্কৃতি, আচার- ব্যবহার এসব শিখানো হয়। চোস্ত উর্দু শিখানো হয়। আর কৌশিক পারতো পাঞ্জাবি কারন তার জন্মস্থানের অনেক লোক এটা বলতো, ফলে এটা কাজে লেগে যায়। পাকিস্তানের অনেক জায়গায় পাঞ্জাবিতে কথা বলে পাকিস্তনিরা।

ট্রেনিং শেষে কৌশিকের নাম দেয়া হয়- নাবি আহমেদ শাকির। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাকে পাকিস্তানে পাঠায় ভারত। তার উপর নির্দেশ ছিল পাকিস্তানের একটা শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে কারণ সেখান থেকে যাতে সে পরে পাকিস্তানের ডিফেন্স এস্টাব্লিশমেন্টে ঢুকতে পারে। কৌশিক ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায় করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখান থেকে সে এলএলবি পাশ করে সোজা পাকিস্তানে আর্মিতে যোগ দেয়। নিজের গুণে সে দ্রুত প্রমোশন পেয়ে মেজর হয়ে যায় । এরপর আসে তার আসল কাজ।

মেজর হয়ে যাওয়ার ফলে পাকিস্তান আর্মির অনেক টপ সিক্রেট ইনফরমেশন যেমন ট্রুপ মুভমেন্ট, মিসাইল টেস্ট, বর্ডার মিশন এসব ইনফরমেশনেত সে কোন সন্দেহের উদ্রেক না করেই অ্যাক্সেস পেয়ে যায় এবং এসব সুযোগ বুঝে কোডেড মেসেজ আকারে র’কে পাঠাতে থাকে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এই কাজ এত সাফল্যের সাথে করে যে র প্রধান যখন তার সাফল্য সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধিকে জানায়, তিনি বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে কৌশিকের নাম দেন ‘ব্ল্যাক টাইগার’।

ঠিক একই সময়ে পাকিস্তানি সিক্রেট সার্ভিসে আইএসআই-এর সন্দেহ জাগে যে ভারতের কোন স্পাই তাদের আর্মিতে আছে, নাহলে গোপন তথ্য ভারত আগে ভাগে জানে কিভাবে! তারাও এই ‘মোল’ বের করতে উঠেপড়ে লাগে।

সব ঠিকমতই চলছিল। কৌশিক এক পাকিস্তানি মেয়েকে বিয়ে করেন, নাম ছিল আমানত। একটা মেয়েও হয়েছিল তাঁদের। ১৯৮৩ সালে র ইনায়াত মাসিহা নামের আরেক এজেন্টকে পাকিস্তানে পাঠায়। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল আরেকটা মিশনে যেটা সে কৌশিকের সাহায্যে এক্সিকিউট করতো।

কিন্তু কৌশিকের সাথে দেখা হওয়ার আগেই আইএসআই ২৯ বছর বয়সী ধরে ফেলে করাচিতে। সেপ্টেম্বরে আইএসআই-এর টর্চার সেলে মাসিহা কৌশিকের আসল পরিচয় বলতে বাধ্য হয়। আইএসআই টের পেয়ে যায় যে নাবি আহমে নামের এই পাকিস্তানি মেজর আসলে ভারতের স্পাই!

এরপর আইএসআই তাঁকে ধরে ফেলে। ভিন্ন জনশ্রুতি আছে যে, মাসিহার সাথে করাচির একটা পার্কে দেখা করতে গিয়েছিলেন কৌশিক। সেখানেই তাদের গ্রেফতার করা হয়।

তবে, অবাক করার মত ব্যাপার হচ্ছে, আইএসআই তাকে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে টর্চার করে যাতে তার মুখ থেকে ভারতীয় স্পাইদের পরিচয় বের করতে পারে যারা পাকিস্তানে আছে বিভিন্ন পরিচয়ে কিন্তু কৌশিকের মুখ ওরা খুলতে পারেনি! পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কৌশিকের স্ত্রী-কন্যাকেও মেরে ফেলে।

প্রথম দু’বছর তাকে শিয়ালকোটের ইন্টেরোগেশন কেন্দ্রে রেখে টর্চার করা হয়। ১৯৮৫ সালে আমরণ কারাবাস দেওয়া হয় কৌশিককে। ‘ব্ল্যাক টাইগার’-এর জীবনের শেষ ১৬ টা বছর জেলেই কাটে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মূলতান জেলে ২০০১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

জেলের পেছনেই তাঁর করব। মারা যাওয়ার দিন তিনেক আগে বাড়িতে একটা চিঠি লিখেছিলেন, ‘আমি যদি আমেরিকান হতাম, তাহলে তিন দিনের মধ্যে জেল থেকে বের হয়ে যেতাম।’

এই রবীন্দ্র কৌশিকের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছিল সালমান খান অভিনিত সিনেমা ‘এক থা টাইগার’।  বাস্তবের টাইগার প্রেম করে পালায়নি। তিনি ধরা পড়া মাত্রই আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় র তার সকল রেকর্ড ধ্বংস করে ফেলে। এটাই সিক্রেট সার্ভিসের নিয়ম।

টাইগার জিন্দা হ্যায় সিনেমায় সালমান খান।

তবে, আজও ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিসে শ্রদ্ধার সাথে কৌশিক কে স্মরণ করা হয়। এক শীর্ষ স্থানীয় সাবেক র অফিসারের মতে, ‘র-এর হাতে গড়া সবচেয়ে প্রতিভাবান স্পাইদের একজন হল এই কৌশিক।’

– দ্য টেলিগ্রাফ, ইকোনমিক টাইমস ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।