রাসোমন: অমীমাংসিত রহস্যের দুর্দান্ত মায়াজাল

যারা চলচ্চিত্রের ওয়ার্ল্ড ট্যুর দেন নিয়মিত, তাদের কাছে ‘রাসোমন’ পরিচিত নাম। আকিরা কুরোসাওয়ার অসাধারণ নির্মাণে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে গণ্য করা হয় একে। ১৯৫০ সালে নির্মিত সিনেমাটি দিয়ে জাপানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সমাদৃত হয় পশ্চিমা বিশ্বের কাছে। নির্মাতা হিসেবে কুরোসাওয়ার উত্থান আর জাপানের এগিয়ে যাওয়ার শুরু সেই থেকে।

বৃষ্টিভেজা সময়ে তিনজন পুরুষ বসে আছে ভাঙ্গা কেল্লায়। সেখানে একজন নিজের জীবনের সবচেয়ে রোমহষর্ক ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে শিউরে উঠেন। পরের দেড়ঘন্টা শিউরে উঠবে দর্শকও। সত্য, মিথ্যা, কামনা, আকুতির বেড়াজালে কখন যে আটকে পড়বে চোখজোড়া টেরও পাওয়া যাবে না।

জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে কাঠুরে আবিষ্কার করে একটি মৃতদেহ। পুলিশকে জানালে তারা তদন্তে নামে। প্রধান সাক্ষী হিসেবে কাঠুরের জবানবন্দি নেওয়া হয়। সেখানে আরো তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী থাকেন। যাদের একজন মৃত ব্যক্তি! কেমন লাগবে যখন দেখবেন, যাকে খুন করার দায়ে চলছে মামলা তিনিই বর্ণনা করছেন কাহিনী? আর হ্যাঁ, মামলার বিচারক কিন্তু স্বয়ং আপনি!

সাত দশক আগের সিনেমা। তবু এতটুকু মলিন নয়। দর্শকের মাইন্ড নিয়ে যে খেলাটা শুরু করেন পরিচালক, তাতে তিনি শতভাগ সফল। চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি, শৈল্পিক উপস্থাপন, শিল্পীদের সতেজ সাবলীল অভিনয়ে এই সিনেমার আবেদন কখনো এতটুকু কমার জো নেই। পঁচিশতম অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয় রাসোমনকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মুক্তির পর অন্যরা সাদরে গ্রহণ করলেও জাপানের সিনে সমালোচকরা এটিকে ভালভাবে নেয়নি।

‘যদি স্বার্থপর না হও, সংগ্রাম করতে পারবে না।’ – সিনেমার শেষদিকে বলা এমন আরো গোটাকয়েক সংলাপ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও জীবন্ত। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবে আপনার সত্ত্বাকে। সিনেমাকে কেউ কেউ জীবনের আয়না বলেন। সেই আয়না, যেখানে নিজেকে লুকানোর কিছু থাকে না।

আসলেই থাকে না? মানুষ সবসময় নিজের কাছে সত্য বলতে পারে? পারে না। সত্যের মুখোমুখি হতে সাহস লাগে যা সকলের নেই।

আঁধারের শেষে আলোর আগমন। মৃত্যুতে শুরু হওয়া গল্পের শেষ হয় জন্ম দিয়ে। রাসোমনের এন্ডিং নিয়ে আজো বিতর্ক রয়েছে। মুক্তির প্রায় তিনদশক পর আকিরা এর ব্যাখ্যা দিলেও পুরোটা অনাবৃত করেননি। ক্রিস্টোফার নোলানের মুভিতে অমীমাংসিত এন্ডিং দেখে আমরা অভ্যস্ত, কিংবদন্তি আকিরা কুরোসাওয়া তা করে দেখিয়েছেন বহুকাল আগেই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।