রণবীর কাপুরই বর্তমান বলিউডের ‘বিগ থিঙ’!

আর্ট বলে যে বস্তুটা জগতে আছে, পুরোপুরি সংজ্ঞা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। এবং ধরেই নেয়া যায় তা আর কেউ দিতে পারবেও না। কারণ শিল্প এমন এক বিষয়, যাকে কোন নির্দিষ্ট ফর্মায় ফেলা যায় না। যেমন ধরুন, গদ্যে যে কবিতা লেখা যায় এটা কয়েক দশক আগে ছিলো পাগলের প্রলাপ। কিন্তু এখন ছন্দে ক’জন কবি কবিতা লেখে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। তার কারণ লোকের কাছে, প্রধানত কবিতা বোদ্ধাদের কাছে এটাই এখন কবিতা হিসেবে উৎরে গেছে।

এখানে সঙ্গত কারণেই ‘কবিতা বোদ্ধা’ শব্দটার ব্যবহার করলাম। তার কারণ সব যুগেই শিল্পের পাঠক, শ্রোতা বা দর্শক ছিল দুই শ্রেণির। প্রথম শ্রেণি হল, যারা শিল্পের অতটা অন্তর্নিহিত বিষয় নিয়ে ভাববে না, তাদের কাছে সেটা পড়তে, দেখতে বা শুনতে ভাল লাগলো কিনা সেটাই প্রধান বিষয়। এরা হলো সাধারণ শ্রেণি।

দ্বিতীয় শ্রেণি হল সেসব লোক, যারা কেবল শিল্পের মধ্যে ভাল লাগা বা মন্দ লাগাটাই খোঁজে না, বরং সেটা নির্মাণের, সেটা তৈরির প্রক্রিয়াটা কতটা শৈল্পিক সেটার সন্ধান করে। একটা তেলাপোকার পায়ে কালি লাগিয়ে সাদা কাগজে ছেড়ে দিলে হয়ে যেতে পারে যেকোন চিত্র। কিন্তু তাতে করে তেলাপোকা কোন শিল্পী হয়ে যায় না। বরং যদি কোন ব্যক্তি সজ্ঞানে, নিজের শক্তিমত্তায় সেই চিত্রটা নিজে আঁকতে পারে। তখনই তাকে শিল্পী বলা যায়। এরা হলো উন্নত শ্রেণি।

আমার ব্যক্তিগত দর্শন সব সময় এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের দিকেই ছিলো এবং আছে। কিন্তু এই পুঁজিতান্ত্রিক সহাবস্থানে শিল্পের সেই মানদণ্ড আর বাকি নাই। বিশেষত বাঙালির তা খুব কম অংশেই আছে। তাই যদি কোন বই কারো কাছে প্রশংসিত হয়, সেটা শুনে বাঙালি জানতে চাইবে বেস্ট সেলার হয়েছে কি? তার মানে, যত বড় বোদ্ধাই সেটাকে ভাল বলুক, যেহেতু লোকে সেটা কিনছে না, তাহলে আমিও কিনবো না।

একই কথা শিল্পের সব শাখার ক্ষেত্রেই চলে। যেমন ধরুন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটি চলচিত্র নির্মাণ করলো। কিন্তু বক্স অফিসে সেটা ফ্লপ গেল। তো এই ফ্লপ ট্যাগ লাগা মুভিটা কোন কাপল জীবনেও তাঁদের ছুটির দিনটাতে দেখতে বসবে না। তার কারণ ওটা তো লোকে দেখেনি। হোক তা কান চলচিত্র উৎসব ঘুরে এসেছে।

মোটাদাগে বর্তমানে বাঙালি শিল্পমনস্কদের এই হলো হাল। এজন্য যখন আমি রণবীর কাপুরকে নিয়ে লিখবো ঠিক করলাম। প্রথমেই আমার মাথায় এলো এই সাধারণ শ্রেণীর দর্শকদের কথা। যারা যুগে যুগে অনেক মহান শিল্পকে অগ্রাহ্য করে এসেছে। জীবননান্দের মত কবিকে এরা অগ্রাহ্যই করেনি শুধু, তাকে নিতান্ত ডিপ্রেশনে ফেলে আত্মহত্যার দিকে ঢেলে দিয়েছে।

শহীদুল জহিরের মত কথাসাহিত্যিক, আহমদ ছফার মত চিন্তক তাদের নিজেদের সময়ে ছিলেন উপেক্ষিত। কিন্তু এখন যারা কথা সাহিত্যের ছাত্র (একাডেমিক অর্থে না) তারা জানেন শহিদুল জহিরের মত লেখক সারা বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়জন নাই। আর ছফা সম্পর্কে তো একথা এখন প্রচলিত যে বর্তমানে বাংলাদেশে যত বুদ্বিজীবী আছে তাদের অর্ধেক এসেছে ছফার ডান পাশের বুক পকেট থেকে। আর অর্ধেক এসেছে ছফার পেছনের পকেট থেকে।

চলচিত্রের ক্ষেত্রে সব থেকে প্রাসঙ্গিক হবে ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ ছবিটার নাম। কয়েকদিন আগেই যার ২৫ তম বর্ষ পূর্ণ হল। যেটাকে এখন অনেকেই বলে থাকেন সর্বকালের সেরা চলচিত্র। অথচ সেই সময়ের মাথামোটা দর্শক এই ছবিকে কেন অগ্রাহ্য করে ছিলো তা তারাই ভাল জানে। যার ফলে বক্স অফিসে এটা ছিলো ফ্লপ। এই সূত্রে ‘ফাইট ক্লাব’-এর নাম আসবে। এমন আরো অনেক ছবির নামও বলা যাবে।

এখানে আমার মূল বক্তব্য হলো, যেহেতু যেকোন আর্টের মত সিনেমাও এখন বোদ্ধাদের (অ্যাওয়ার্ড) মতের পাশাপাশি সাধারণ দর্শকের মানদণ্ডে (বক্স অফিস হিসেবে) মাপা হয়, সুতরাং এই দুই হিসাবকে সামনে রেখে রণবীর কাপুরের আপাতত ক্যারিয়ারটাকে বলিউডের অন্যান্য স্টারদের সাথে মিলিয়ে দেখা যাক ফলাফল কি আসে। প্রথমে বাকিদের পরিসংখ্যানটা দেখে নেই –

  • শাহরুখ খান

প্রথম ১৭ ছবিতে ফ্লপ ৭ টা, ব্যবসা সফল ১০ টা।

ফিল্মফেয়ার জয় ৫ টা, মনোনয়ন ২ টা।

সালমান খান

প্রথম ১৭ ছবিতে ফ্লপ ১০ টা, ব্যবসা সফল ৭ টা।

ফিল্মফেয়ার জয় ১ টা, মনোনয়ন ১ টা।

  • আমির খান

প্রথম ১৭ ছবিতে ফ্লপ ৭ টা, ব্যবসা সফল ১০ টা।

ফিল্মফেয়ার জয় ৩ টা, মনোনয়ন ১১ টা।

  • হৃতিক রোশন

প্রথম ১৭ ছবিতে ফ্লপ ৮ টা, ব্যবসা সফল ৯ টা।

ফিল্মফেয়ার জয় ৬ টা, মনোনয়ন ৫ টা।

‘সাঞ্জু’ পর্যন্ত রণবীর কাপুরের ছবির সংখ্যা ১৭, সেই হিসেবে শাহরুখ, সালমান, আমির ও হৃতিকের পরিসংখ্যান উপরে দেয়া আছে। এবার তাঁরটা দেখি – সিনেমা ১৭ টা, ফ্লপ ৬ টা, ব্যবসা সফল ১১ টা। ফিল্মফেয়ার জয় ৬ টা, মনোনয়ন ৮ টা।

চারজনের থেকে তাঁর ফ্লপের সংখ্যা কম। এবং ফিল্মফেয়ার হৃতিকের সাথে যৌথভাবে ৬ টা। তবে মনোনয়ন তাঁর থেকে তিনবার বেশি। সুতরাং যদি আপনি বক্স অফিসের হিসাব করেন, তাহলেও বাকি চারজনের থেকে এখন পর্যন্ত এগিয়ে। এবং যদি সিনেমা বোদ্ধাদের মতামত নিয়ে হিসাব করেন, সেক্ষেত্রেও সে এগিয়ে। কারণ তাঁর পুরস্কার বেশি।

উল্লেখ্য, এখানে ফ্লপ বলতে ব্যবসা সফল না যেসব, সেসবই বোঝানো হয়েছে। আর ব্যবসা সফলের মধ্যে হিট, ব্লকবাস্টার সবই ধরা হয়েছে। আর ফিল্মফেয়ারকে মানদণ্ড ধরার কারণ বলিউডের সব থেকে বড় পুরস্তার এটা। যেটাকে অনেকেই বলিউডের অস্কার বলে থাকেন। স্বাভাবিক ভাবেই এটার গুরত্ব বেশি।

এবার আসি সব থেকে প্রাসঙ্গিক এবং সমসাময়িক তর্কে। রনবীর কাপুরের সব থেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী যাকে বলা হচ্ছে, তার নাম আশাকরি সবাই বুঝতেই পারছেন। রণবীর সিং। তিনিও যে মারাত্মক অভিনেতা তাতে কোন সন্দেহ নাই।

আপাতত রনবীর সিংয়ের পরিসংখ্যানটা একটু দেখে নেই – ছবি ১২ টা, ফ্লপ ২ টা, ব্যবসা সফল ১০ টা। ফিল্মফেয়ার জয় ৩ টা, মনোনয়ন ২ টা। একই সময়ে রণবীর কাপুরের পরিসংখ্যান – ছবি ১২ টা, ফ্লপ ৩ টা, ব্যবসা সফল ৯ টা। ফিল্মফেয়ার জয় ৫ টা, মনোনয়ন ৪ টা। বক্স অফিসের হিসেবে একটাতে পিছিয়ে, কিন্তু পুরস্কার পাওয়া বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধানে এগিয়ে কাপুর।

লেখার শিরোনাম কেন এমন, তার উত্তর আশাকরি পেয়ে গেছেন। তবে হ্যা, কাউকে ভাল লাগা বা মন্দ লাগা কখনো পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ হয় না। যার যাকে ভাল লাগবে, তার কাছে সেই সেরা। কাউকে জোর করে ভাল লাগাতে বলছি না। কেবল ফ্যক্ট দিয়ে প্রমাণ করছি যে রণবীর কাপুরই বর্তমান বলিউডের ‘বিগ থিঙ’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।