রাজি: দেশপ্রেম বনাম মানবতা ও ধ্বংসাত্মক কাঁটাতার

২০১৮ সালের বেশ আলোচিত একটা ছবি ছিল রাজি। ব্যবসায়িক দিক থেকে তো বটেই, সিনেমার জায়গা থেকেও সমালোচকদের কাছে বেশ প্রশংসা পেয়েছে এই ছবি। একটু দেরি করেই দেখলাম। কারণ একটাই, ছবিটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। সাধারণ একটা সিনেমার ক্ষেত্রে কেবল আর্টের জায়গা থেকে আলোচনা সমালোচনা করা যায়। কিন্তু এটাতে শিল্প বিষয়ক আলাপের বাইরেও আলাপ থেকে যাবে, এজন্যই ভাল ভাবে দেখতে বসা।

  • নির্মান

হিন্দি এবং উর্দু ভাষায় আমার কিছুটা দক্ষতা আছে। হিন্দি লেখা পড়তে না পারলেও শুনে শতভাগ বুঝতে পারি। উর্দু লিখতে,পড়তে দুটাই পারি। কিন্তু এই ছবি দেখতে নিয়া প্রথম বিশ মিনিট দু’বার দেখলাম, তাও কোন কোন অংশ স্পষ্ট হলো না। শেষে ইংলিশ সাবটাইটেল নামায়া নিতে হলো। একদম কিতাবি উর্দু শব্দের ব্যবহার ছিল খেয়াল করার মত। সংলাপ আরো সহজ হতে পারতো।

সিনেমার প্লট আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগের। অর্ধশত বছর আগের ছবির স্ক্রিন কালার এতটা ব্রাইটফুল একটু বেখাপ্পা লাগছে। কিছু কিছু দৃশ্যে মনেই হয় নাই এটা পঞ্চাশ বছর আগের সময় দেখাচ্ছে। দিল্লী ইউনিভার্সিটির দৃশ্যটা উল্লেখ্য। আমি বলছিনা পঞ্চাশ বছর আগের সময় দেখেই ব্লাক এন্ড ওয়াইট দেখানো লাগব। এই পার্থক্যটা যারা বুঝতে পারছেন না তারা কয়েক মাস আগের ‘মান্টো’ দেখতে পারেন।

  • অভিনয়

অভিনয়ের কথা বলতে গেলে এটা এমন একটা ছবি, যেটাতে তেমন কারো জন্যই ভেঙে উপস্থাপন করার মত কোন চরিত্র নাই। আলিয়ার চরিত্রটাই ছবির মূল চরিত্র। কিন্তু চিত্রায়ন হয়েছে রোবটিক আকারে। অবশ্য এখানে স্ক্রিপ্টের ডিমান্ডই এইটা। যতটা না কথায় তাঁর থেকে কাজটাই বেশি ছিল। কতগুলো কান্নার অভিনয় ছাড়া আলিয়ার তেমন কিছুই করতে হয় নাই।

নামগুলা নিয়া একটু কথা বলা যাক। রাজি মানে আমরা বাংলায় যা বুঝি তাই, মানে সম্মতি আরকি। আলিয়ার নাম সেহমত, সেহমত অর্থও একই, সম্মতি। আলিয়া নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেশের সেবার জন্য সম্মতি দিছে বিয়ে বসার। এইটাই ছবির কনসেপ্ট, সেদিক থেকে নাম ঠিকাছে। আলিয়ার বাবার নাম হেদায়াত, মানে পথপ্রদর্শক। ভারতীয়দের তো বটেই, পাকিস্থান আর্মিরও কৌশলগত কারনে এজেন্ট সে, পথপ্রদর্শক আরকি। অপরদিকে ভিকি কোশলের নাম ইকবাল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন কবি ইকবাল, আর ছবিতে ইকবাল একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। ইকবালকে মেটাফোর হিসেবে এক্ষেত্রে ধরেও নেয়া যায়।

  • কনসেপ্ট ও তথ্যগত ভুল

ছবির প্রথম দৃশ্যে বরাবরের মত ইউজুয়াল একাত্তরকে ভারত পাকিস্থান যুদ্ধ হিসেবেই বলা হইলো। ছবির একদম শেষ দৃশ্যেও তাই। ‘ইন্ডিয়া ওয়ার জিত গায়ি হ্যা’ – তাদের তিন বাহিনীর অনেক কঠিন পরিশ্রমের ফসল তারা একাত্তরে জয় লাভ করলো। এসব আরকি। ভারতীয়রা তাদের ইতিহাসে এটাকে তাদের জয় হিসেবেই দেখে। হোক তা সিনেমায় বা সাহিত্যে। অর্জুন-রণবীরের ‘গুণ্ডে’র কথা মনে আছে নিশ্চয়। এসব থেকে আমাদের প্রতি তাদের মনোভাব একদম ই স্পষ্ট। এই যে এত বছরেও সীমান্ত, পানি, বন, আরো কত কত সমস্যা তাদের সাথে। এগুলাতে অবাক হওয়ার কিছুই নাই।

আমাদের স্বাধীনতায় সহযোগীতার উদ্দেশ্যই ছিলো এটা, শোষণ। এর মানে আমি তাদের সহযোগীতার কথা অস্বীকার করতেছি না। কিন্তু এক দেশের যুদ্ধে আরাক দেশের সাহায্য তো তাদেরটাই একমাত্র না। যুদ্বের এটাই প্রাচীন নীতি, মিত্র বাহিনী থাকবেই। শুধু বাস্তবতাটা বললাম।

এইটা না হয় একটা কমন ব্যাপার গেলো। গোঁজামিল যেটা লাগছে, পূর্ব পাকিস্থানের সাথে ঝামেলা হলে এখানে ভারত নাঁক গলাতে পারে। ভারত যাতে নাঁক গলাতে না পারে এজন্য পাকিস্থান ভারতের বিরুদ্বে এমন কিছু করতে পারে যেটা ভারতকে একদম অচল করে দেবে।

এটা সেহমতের (আলিয়া) বাবার ভাষ্য। সুতরাং ভারতের যেন ক্ষতি না করতে পারে তাই ভারতই আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এটাই মুভির মূল কনসেপ্ট। এই কনসেপ্ট ঠিক না রাখলে ছবির গল্পই তো দাঁড়াবে না। একবার খেয়াল করেন, কনসেপ্টটা কত দুর্বল এবং হাস্যকর। দুই পাকিস্থানের মধ্যে ঝামেলা, এতে ভারত নাঁক গলালে অবশ্যই পাকিস্থান চাইবে প্রতিহত করতে।

কিন্তু ছবিতে বলা হচ্ছে তাঁরা ভারতকে পঙ্গু করে দেবে। বিধায় তাঁদের বিরুদ্ধে ভারত উঠেপড়ে লাগলো। কি হাস্যকর লজিক! পঙ্গু বললাম এজন্য, ইংলিশ সাবটাইটেলে ‘cripple’ শব্দটা ব্যবহার করছে। এই যে ভারতের আগায়া নাকঁ গলানোর ব্যাপারটাকে আড়াল করে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতির কারণটাকে বড় করে দেখানো, এইটাকে বলে ব্রেন ওয়াশ প্রক্রিয়া।

কিছুদিন আগে একটা লেখা পড়ছিলাম, ভিয়েতনাম যুদ্বে আমেরিকা যে পাশবিকতা দেখিয়েছে, আজকে এত বছর পর ভিয়েতনাম যুদ্বের উপর নির্মিত আমেরিকানদের ফিল্মগুলা দেখেন, তারা দেখাচ্ছে আমেরিকা সেখানে গেছে ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের সাহায্যের জন্য। এবং এটাকে প্রায় সত্যি বানিয়ে ফেলছে তারা। বলিউড যেভাবে আমাদের সংগ্রামকে তাদের বিজয় হিসেবে দেখাচ্ছে, তাঁদের এই প্রজন্মের কাছে গিয়ে জানতে চাইলে কী উত্তর দেয় ভাববার বিষয়।

ছবিতে হেদায়াত একজন ভারতীয়। আর ভারত অলিখিত একটা হিন্দু রাষ্ট্র (যদিও লিখিত স্যেকুলার)। সেই রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করছে একটা মুসলিম পরিবার, একজন মুসলিম নারী। স্টোরির ডিমান্ড এমনই ছিল। কিন্তু এছাড়াও খেয়াল করার ব্যাপার আছে এখানে।

নারীর পারিবারিক অধিকারকে তুচ্ছ করে দেখার সেই চিরায়ত হিপোক্রেসির আশ্রয়। মেয়ের বিয়ের জন্য মেয়ে বা তার মায়ের অনুমতি না নেয়াটাই স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো। এবং সেটা একটা মুসলিম পরিবার। চামে চিকনে নারীকে ছোট করে দেখার ইসলামীকরণ আর কি!

সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, এটা একটা দেশপ্রেম মূলক সিনেমা। কিন্তু একটা সময় খেয়াল করবেন, সেহমত যখন একেকজন নিরপরাধ লোককে মারতে থাকে, আপনে ভাবতে বাধ্য হবেন দেশপ্রেম আগে নাকি মানবতা আগে? আফসোস, কাঁটাতারের খুঁটিটাই সবচেয়ে বড় ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে কি না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।