বলিউডের নতুন ‘রাজ কুমার’

ভারতের হরিয়ানা। সেখানকার গুরুগাওয়ের সাদামাটা এক মধ্যবিত্ত পরিবার। পরিবারের কেউ ভারতীয় সিনেমায় কাজ করা তো দূরের কথা, কেউ মুম্বাই ফিল্ম সিটিতে গিয়ে একবার হেঁটেও আসেনি। তবে, প্রত্যেকেই সিনেমার পোঁকা।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে যা হয় আর কি। এমন একটি পরিবারে জন্ম তাঁর, ১৯৮৪ সালের ৩১ আগস্ট। তিনি হলেন রাজ কুমার যাদব। পর্দায় তাকে আমরা রাজ কুমার রাও বলে চিনি।

মজার ব্যাপর হল, এই সময়ের খ্যাতিমান এই তারকা শৈশবে কখনোই বড় অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তিনি কেবল বড় তারকাদের ‘মিমিক্রি’ বা কথার ঢঙ নকল করে মজা পেতেন।

অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নটা তিনি দেখেছিলেন দশম শ্রেণিতে থাকাকালে। ভেবেছিলেন, এই অভিনয়েই ক্যারিয়ার গড়বেন। সে কারণেই কলেজ জীবনে তিনি যোগ দিয়েছিলেন দিল্লীর একটি নাট্যগোষ্ঠীতে।

মঞ্চ নাটক করে বেড়াতেন। আর সেকারণে সাইকেল দিয়েই তিনি গুরুগাও থেকে দিল্লীতে আসতেন। ফিরতেনও ওই সাইকেলে করেই।

রাজ কুমারের পড়াশোনাও সিনেমা নিয়েই। তিনি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার গ্র্যাজুয়েট। সেখান থেকে স্বপ্নের শহর মুম্বাইয়ে পা রাখেন। সেটা ২০০৮ সালের কথা।

কিন্তু, বলিউড কি আর ছেলের হাতের মোয়া!

চাইলেই তো আর সেখানে গিয়ে নায়ক বনে যাওয়া যায় না। শুরুতে তাই রাজ কুমারও পারেননি। অনেক কাস্টিং ডিরেক্টররা তাঁকে বারবার ফিরিয়ে দেন। তবে, তিনি আশাহত হননি, তিনি যে অন্য ধাতু দিয়ে গড়া।

কেউ একজন বলেছিল, রাজ কুমারের ভ্রু নাকি অভিনয়ের জন্য না। আবার আরেকজন বলেছিল, তিনি নাকি নায়ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট ফর্সা নন। এসব কথায় রাজ কুমার ভেঙে পড়েননি। বরং, এসব সমালোচনাই তিনি নিজেকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন।

বছর দুয়েক অভিজ্ঞতার পর প্রথমবারের মত তাঁর সুযোগ পেলে। পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জী তাঁর সিনেমার জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। তিনি পছন্দ করেন রাজ কুমারকে। ব্যস, ২০১০ সালে ‘লাভ সেক্স ওউর ধোকা’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে পা রাখেন রাজ কুমার রাও। একই বছর ‘রণ’ সিনেমাতেও কাজ করেন তিনি।

এর আর আর পেছনে ফিরে তাকাননি তিনি!

২০১১ সালে ‘রাগিনি এমএমএস’ ও ‘শয়তান’ সিনেমায় কাজ করেন। ২০১২ সালে ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এর দ্বিতীয় কিস্তি, ‘চিটাগং’, ‘তালাশ’ সিনেমায় কাজ করেন, প্রশংসিত হন। ২০১৩ সালে ‘কাই পো চে’ ও ‘শহীদ’ সিনেমা দিয়ে তিনি ভিন্নধারায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। কাই পো চে’র জন্য ফিল্ম ফেয়ার ও স্টার স্ক্রিনের মনোনয়ন পেলেও পুরস্কার জিতেননি। তবে, জি সিনের বিবেচনায় সেরা সাপোর্টিং রোলের জন্য পুরস্কৃত হন।

শহীদ সিনেমাটির জন্য তিনি ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে জেতেন সমালোচক পুরস্কার। এই সিনেমাটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান। সেখান থেকেই শুরু হয় রাজ কুমারের বলিউডের রাজা হয়ে ওঠার যাত্রা।

এরপর একে একে ‘কুইন’, ‘সিটি লাইটস’, ‘ডলি কি ডোলি’, ‘হামারি আধুরি কাহানি’, ‘আলিগর’-এর মত সিনেমায় কাজ করেন। তবে, সবচেয়ে বড় বিস্ময়টা তিনি জমা রাখেন ২০১৭ সালের জন্য। গত বছর এই অভিনেতার মুক্তি পেয়েছে পাঁচটি সিনেমা – ‘ট্র্যাপড’, ‘রাবতা’, ‘ব্যাহেন হোগি তেরি’, ‘বেরিলি কি বারফি’, ‘নিউটন’ ও ‘শাদি মেয় জরুর আনা’।

এর মধ্যে নিউটন সিনেমাটি রাজকুমার রাওয়ের জন্য নতুন এক মাইলফলক। এর জন্য স্টার স্ক্রিনের বিবেচনায় তিনি পেয়েছেন সমালোচক পুরস্কার। অন্যদিকে বেরিলি কি বারফি সিনেমার জন্য তিনি দু’টি সাপোর্টিং রোলের পুরস্কার জেতেন – ফিল্ম ফেয়ার ও স্টার স্ক্রিন।

বলিউড ছাপিয়ে তিনি ওয়েব সিরিজেও নিজের জাত চিনিয়েছেন। তিনি যে কত বড় একজন অভিনেতা সেটা ‘বোস: ডেড অর অ্যালাইভ’ সিনেমায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর চরিত্রে তাঁকে কাজ করতে দেখলে বোঝা যায়! আসছে বছর গুলোতে মুক্তির অপেক্ষায় তাঁর যত ছবি আছে, সেগুলো দেখলেই বোঝা যায় হারিয়ে যেতে নয়, বরং বলিউডের আকাশে উজ্জ্বল তারাদের একজন হতেই এসেছেন তিনি।

অথচ, এক জীবনে কি না দেখেছেন তিনি। পরিশ্রমের পর পরিশ্রম, হতাশায় বুদ হওয়া, কিংবা আকাশ ছোঁয়া সাফল্য – সবই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারে। এত কিছু করে পাওয়া খ্যাতিটাকে নিশ্চয়ই হেলায় হারাতে চাইবেন না তিনি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।