ফুড ফ্যান্টাসি ও নস্টালজিয়ায় কাতর হওয়ার ছবি

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

স্কেচপেন, প্যাস্টেল কালার, ড্রয়িং খাতা, অরেঞ্জ কাঠি আইসক্রিম, কাগজের রাজা রানীর মুকুট, কাগজের রকেট বানানো, দড়ি বাঁধা চশমা, এগুলো সব আমাদের ছোটবেলার নস্টালজিয়ার প্রতীক। আর সেই স্বাদ দিতেই ছোটদের মনমুগ্ধকর ও বড়দের স্মৃতিমেদুরতার ছবি ‘রেনবো জেলি’ বানিয়েছেন পরিচালক শৌকর্য ঘোষাল।

নব্বই দশকে কলকাতা দূরদর্শনে হত ছোটদের গরমের ছুটি তে অনুষ্ঠান ‘ছুটি ছুটি’। যেখানে দেখানো হত ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’, ‘সফেদ হাতি’, ‘বাদশা’র মতো ছোটদের ছবি।কিন্তু তারপর এ যুগে ছোটদের ছবি সেভাবে হয়নি। আর ঠিক এই গরমের ছুটিতেই শৌকর্য ঘোষাল উপহার দিলেন নির্মল ছেলেবেলার গল্প ‘রেনবো জেলি’।

ছবির মূল চরিত্র ঘোঁতনের (মহাব্রত) ছেলেবেলা যদিও নির্মল রঙিন নয় কিন্তু তার মনটা অপাপবিদ্ধ রঙীন। রীতিমতো তাকে শিশু শ্রম করায় তার অর্কমন্য মামা গণ্ডারিয়া (কৌশিক সেন)। সংসারের জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ করতে হয় ঘোঁতনকে। যে একজন স্পেশাল চাইল্ড। তাই সাধারণ স্কুলে সে ক্লাস টু তেই ফেল করে যায়।

স্কুল থেকে বলে দেয় তাকে স্পেশাল চাইল্ড দের স্কুলে দিতে। কিন্তু কুচক্রী মামা এক পয়সাও আর ঢালেনা মা বাপ মরা ভাগ্নের পেছনে। বরং তার সম্পত্তির পয়সা ভোগ করে। ঘোঁতনকে মারধোর করে সব রান্না বাসন মাজা যাবতীয় কাজ করায়। ঘোঁতনের ১৮ বছর হলে তার বাবার রেখে যাওয়া সমস্ত গুপ্তধন তার হাতে তুলে দেবেন মামা এই শর্তে স্বপ্ন দেখিয়ে।

মামার ঘরে রাখা রোবটের মধ্যে গুপ্তধনের পাসওয়ার্ড লুকোনো রয়েছে। কিন্তু আদৌ কি মামা সত্যি কথা বলছেন!এই সব প্রশ্ন যখন জট পাকাতে থাকবে, তখনই ময়দানে আসেন পরী পিসি। পদিপিসি নয়, পরী পিসি! সিনেমাতে লীলা মজুমদারের লেখা ‘পদিপিসির বর্মীবাক্সের’ আলতো প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হলেও, ‘রেনবো জেলি’ আদতে অন্য।

পদি পিসি ছায়া দেবীর মতো এখানেও হাজির হন পরী পিসি শ্রীলেখা মিত্র।

এই শ্রীলেখাকে আগে আমরা দেখিনি। শ্রীলেখার জীবনের আরেকটি শ্রেষ্ঠ চরিত্র পরী পিসি। শুরুতে শ্রীলেখা সুন্দরী গৃহবধূর চরিত্রে অনবদ্য ছিলেন যদিও ‘স্বাদে আহ্লাদে’ তে সেই শ্রীলেখাকে আজও পাই। তারপর যে আবেদনময়ী শ্রীলেখা আর্বিভূত হলেন তার রেশ অনেকদিন ছিল সেই রূপেই আজকাল তিনি বেশি জনপ্রিয় যদিও তিনি ছুড়ে ফেলে দেন ‘দুপুর ঠাকুরপো’-তে সস্তা বৌদি হবার অফার।

আর জন্ম দেন পরী পিসির। ফুড ফ্যান্টাসি নিয়ে বাংলা ছবি বাঙালি উপহার পেল। আর তার কারিগর পরী। যে সূর্যের সাতরঙে মানুষের মনের রঙ পাল্টে দেবার ক্ষমতা রাখেন। আর ঘোঁতনের নতুন জীবনের চাবিকাঠি নিয়ে আসেন তার এই পরী পিসি। এত সুন্দর সুন্দর রঙের নতুন নতুন রেসিপির রান্না দেখলে মন ভালো হয়ে যাবেই।

এই ছবি বাস্তব থেকে পরাবাস্তব থেকে রূপকথা হয়ে আবার বাস্তবে ফিরে এসছে যা অতি অপ্রতীম ভাবে দেখিয়েছেন শৌকর্য।

ঘোঁতন, পরী পিসি ,মামা, কাবুলি পাওনাদার, সহানুভূতিশীল চা-ওয়ালা শান্তিলাল, সিন্ডেরেলার মতো ফুরফুরে মিষ্টি এক কিশোরী পপিন্স অনুমেঘা – এদের নিয়েই অভিনব কথামালায় এক রূপকথা সাজিয়েছেন শৌকর্য।

শ্রীলেখা কৌশিক সেরা অভিনয়টা করে দিয়েছেন। কোনো অতি অভিনয়, অহেতুক মেক আপ, চড়া আলো নেই ছবিতে এক অদ্ভুত ভালো লাগা যা নিয়ে ছবি শেষ হলে দর্শক হল থেকে বেরোবে। শৌকর্য’র আগের ছবি ‘পেন্ডুলাম’, ‘লোডশেডিং’ এ অন্য ছবির প্রভাব থাকলেও রেনবো জেলি একদম নতুন রোমাঞ্চ।

ছবিটি আরো বাজেট পেলে আরো ভালো হত।কিন্তু তাতে গল্প বলার কোন খামতি নেই পরিচালনায় কোন খামতি নেই অভিনয়ে চিত্রনাট্যে কোন দুর্বলতা নেই। ছবিতে অদ্ভুত সুন্দর একটি গান গেয়েছেন মৌসুমী ভৌমিক। পরী পিসির গানটিও ভীষন ক্যাচি বাচ্চাদের মূখে মুখে ঘুরছে।

তবে একটাই খটকা লাগল, কোনো স্পেশাল চাইল্ডের পক্ষে গ্যাস জ্বালিয়ে দিনের পর দিন চা থেকে সব রান্না করা সম্ভব? রান্নাঘরটাই পুরো তার দায়িত্বে। যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়। এখানে মেধার চেয়েও শারিরীক খাটুনি নিপুনতা থাকে।

কোন মশলার পর কোন মশলা দেবে এত রকমের রান্নায়, বাটনা বেটে রান্না, খাবার পরিবেশন, বাসন মাজা, ঘর পরিস্কার, চা করা, একা হাতে বাজার করা, বাজারে দরদামের সমস্ত অংকের দুরুহ হিসেব করে করা কোনো অটিস্টিক স্পেশাল চাইল্ডের পক্ষে করা সম্ভব যে কিনা ক্লাস টু তেই ফেল করে!

বড্ড অবাস্তব না? যতই শিশু শ্রম করাক যে ক্লাস টু তে কম মেধার জন্য ফেল করে সে এত বাজারের হিসেব বাকির হিসেব সুদাসলের হিসেব কি করে রোজ করে? আমি নিজের জীবনে অনেক স্পেশাল চাইল্ড দেখেছি এত পারদর্শী স্পেশাল বাচ্চা দেখিনি। তাদের বাবা মা দের ভাবার বিষয় তাঁদের অবর্তমানে স্পেশাল চাইল্ডটির কি হবে। আর এখানে ঘোঁতন একাই প্রায় বাড়িতে থাকে সব কাজ সে একাই একশো হয়ে করে। যে আবার প্রেমেও পরে সংসার করার স্বপ্ন দেখে।

মহাব্রত ছেলেটি যদিও বাস্তবে স্পেশাল চাইল্ড তাই সেখানে সাহস দেখিয়েছেন শৌকর্য। এতদিন আমরা অনেক এরকম চরিত্র পেয়েছি বাংলা ছবিতে কিন্তু সেগুলো করেছেন সুস্থ পাকা অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাঁরা জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু এখানে মহাব্রত নিজেই একজন স্পেশাল চাইল্ড। তাই পরিচালক ও এই খুদে অভিনেতাটিকে কুর্ণিশ।

ছবির অসাধারন পোষ্টার করেছেন সৌরীষ মিত্র। যা রূপকথার রাজ্যে আপনাকে নিয়ে যাবেই। অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। টাইটেল কার্ড দেখানোর স্টাইল নানা কার্টুনের ব্যবহার সিনেমায় বেশ চোখ জুড়নো।

‘রেনবো জেলি’ কেমন দেখতে? যা সূর্যের সাতরঙ মিশিয়ে বানানো হয়। অনেকদিন পর এই ভোজপুরী তামিল কপি পেস্টের যুগে একটা নিখাঁদ বাঙালিদের গল্প নিয়ে বাংলা ছবি হল হাউসফুল করা দর্শক এবং ছবির শেষে মনে রয়ে যাবেই পরী পিসি, ঘোঁতন, পপিন্সের মুখ গুলো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।