দোসা বেঁচে কোটিপতি: বেকারি শ্রমিকের অদম্য লড়াই!

প্রেম গণপতির বয়স তখন কেবল ১৭ বছর। ওই বয়সেই তামিল নাড়ুর টুটিকোরিন গ্রামের বাড়িতে কাউকে না জানিয়েই বের হয়ে যান। রওনা দেন মুম্বাইয়ের পথে। উদ্দেশ্য একটা চাকরি খুঁজে বের করা, কোনো ভাবে পেট চালানো।

তখন মুম্বাইয়ের কারো সাথেই পরিচয় ছিল না। অথচ আজ তিনি দোসা প্লাজা নামের খ্যাতনামা একটা চেইন ফুড শপের মালিক, রীতিমত কোটিপতি। কিভাবে হল এতকিছু? সেই গল্পটাই বলবো আজ!

চলুন প্রেমের নিজের কাছ থেকেই শুনি। প্রথম যেদিন মুম্বাই আসলেন সেদিনের স্মৃতিচারণা করে প্রেম বলেন, ‘মুম্বাই আসার পরদিনই একটা মাহিমের একটা স্থানীয় বেকারিতে বাসন মাজার কাজ পাই। বেতন মাসিক ১৫০ রুপি। এরপরের দু’বছর এমন বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে এসব ছোটখাটো কাজ করতে থাকি, যতটা সম্ভব।’

এরপর কাজের পরিধি একটু বাড়ে প্রেমের। চেমপুরের একটা হোটেলে পিজ্জা ব্রেড ডেলিভারি করার কাজ পেয়ে যায়। এরপর মুম্বাইয়ের নভিতে চলে আসে, সেখানে ফের একটা রেস্টুরেন্টে বাসন মাজতে থাকে।

১৯৯২ সালের কথা। প্রেমের হাতে তখন কিছু অর্থকড়ি জমেছে। কিধু ধারদেনা করলো। একটা কার্ট ভাড়া করে ফেললো নিজের জন্য। ভাসি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে শুরু করলো ইডলি আর ডোসার ব্যবসা। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু ধারদেনা করলাম। ১৫০ রুপি দিয়ে একটা কার্ট ভাড়া করলাম। শুরুতে ‍খুব সমস্যা হবে। অনেক সময় মিউনিসিপালিটির লোকরা এসে কার্ট তুলে দিতো। কিন্তু আমি খুব ইতিবাচক ছিলাম। কখনো আশা ছাড়িনি।’

প্রেম খুবই সৌভাগ্যবান যে তাঁর পড়াশোনা জানা কিছু রুমমেট ছিলেন, যারা তাকে কম্পিউটার ব্যবহার করতে শেখায়, ‘আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু’ঘণ্টার বিরতি নিয়ে সাইবার ক্যাফেতে সময় কাটাতাম। নানা রকম ব্যবসার ব্যাপারে পড়াশোনা করতাম। আমার ব্যবসার উন্নতির জন্য আমার ভাইয়েদের অবদানটাও ভুলে গেলে চলবে না।’

কার্ট নিয়ে যেখানে বসতেন, তার পাশেই ছিল ম্যাকডোনাল্ড। একদিন ম্যাকডোনাল্ডের সাফল্যের গল্প পড়লেন ইন্টারনেটে। সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, নিজের একটা রেস্টুরেন্ট দেবেন।

১৯৯৭ সালে মাসিক পাঁচ হাজার রুপিতে ছোট একটা জায়গা নিয়ে একটা খাবারের দোকান খুললেন। নাম দিলেন ‘প্রেম সাগর দোসা প্লাজা’। দোসা নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। ব্যবসা আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো। ভিন্ন স্বাদের ২৬ রকমের দোসা নিয়ে আসলেন।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালামের সাথে

২০০২ সাল নাগাদ তাঁর রেস্টুরেন্ট থেকে তৈরি হতে লাগলো ১০৫ রকমের দোসা। এবার ব্যবসাকে আরো বড় করার কথা চিন্তা করলেন প্রেম। তিনি বলেন যে, ‘আমার ভাগ্য খুব ভাল যে সেন্টার ওয়ান মলের ম্যানেজমেন্ট টিমের স্টাফরা আমার এখানে খেতে আসতো প্রায়ই। তারাই আমাকে মলে একটা জায়গা করে দেয়। এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করিনি।’

দ্রুতই তিনি তাঁর ফ্র্যাঞ্চাইজি আরো বাড়ানোর প্রস্তাব পেতে শুরু করলেন। শুধু ভারতেই নয়, ভারতের বাইরে থেকেও প্রস্তাব আসা শুরু করলো। এখন অবধি ভারতে তাঁর আছে ৪৫ টি আউটলেট। ভারতের বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও নিউজিল্যান্ডে আছে আরো সাতটি।

পুরো ব্যবসার মূল্য এখন ৩০ কোটি রুপি। সেদিন স্বপ্নটা দেখতে পেরেছিলেন বলেই তো আজ আকাশ ছুঁয়েছেন প্রেম! ব্যবসা বড় হওয়ার সাথে সাথে যে দায়িত্বও বেড়েছে সেটাও বোঝেন প্রেম, ‘ব্যবসা বড় হয়েছে, সাথে সাথে বেড়েছে আমার দায়িত্বও। অনেক মানুষ আমার ওপর নির্ভরশীর। অনেকে ফ্র্যাঞ্চাইজির পেছনে অর্থ ঢালছে। ফলে, আমাকে এখন আরো পরিশ্রম করতে হয়!

– ইওরস্টোরি, ইকোনমিক টাইমস ও রেডিফ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।