নেহায়েৎ এক মাটির মানুষের আকাশ ছোয়ার গল্প

সবাই তো আকাশের তারা হতে চায়। নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকীও চাইতেন। কিন্তু ব্যাপার হল, তার সম্বল ছিল একটাই – প্রতিভা। কিন্তু, কেবল প্রতিভা দিয়ে কি হয় নাকি, তিনি তো আর কোনো স্টারের সন্তান নয় যে পরিচালকরা যেচে পড়ে কাজ দেবেন। তাই, নওয়াজউদ্দীনের জন্য তারকা হওয়া তো দূরের কথা, নিয়মিত কাজ পাওয়াটাই বেশ ঝক্কির একটা কাজ ছিল।

কিন্তু, সুপারম্যান খ্যাত আমেরিকান অভিনেতা ক্রিস্টোফর রিভের একটা কথা মাথায় গিয়েছিল নওয়াজউদ্দীনের। রিভ বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেক স্বপ্নকেই প্রথমে অসম্ভব মনে হয়, পরে মনে হয় অভাবনীন। কিন্তু, এরপরই যখন আমরা নিজেদের প্রচুর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তাকে চাই তখন সেই স্বপ্নকেই মনে হয় অনিবার্য।’

এবার একদম শুরু থেকেই শুরু করা যাক।

উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের ছোট্ট একটা গ্রাম বুধানা। সেখানকারই এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের জন্ম হয় নওয়াজের। দিনটা ছিল ১৯৭৪ সালের ১৯ মে।  নাওয়াজউদ্দীনের পুরো নাম নাম্বারদার নাওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। এই ‘নাম্বারদার’ হলো বড় জমিদারের পদবী। তারপরও সাধারণ জীবন-যাপনেই বিশ্বাসী ছিলে তারা।  নওয়াজরা সাত ভাই ও দুই বোন। বাবা ছিলেন কৃষক, তবে খুব বেশি আর্থিক টানাপোড়েন ছিল না।

নওয়াজ হারিদওয়ারের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন। এরপর কেমিস্ট হিসেবে যোগ দেন বারোদার একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু, মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। মনে যে তাঁর অভিনেতা হওয়ার বাসনা।

তাই, চলে আসলেন দিল্লী। অভিনয়ে একটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুঁজছিলেন। দিল্লীর বিখ্যাত ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) খবর পান। কিন্তু, প্রথমবার অ্যাডমিশন পরীক্ষায় ফেল করেন। তবে, ভারতের রাজধানী তিনি ছাড়েননি। টানা দু’বছর দারোয়ানের চাকরী করেছেন মাসিক ৬০০-৭০০ রুপির বিনিময়ে। চাকরী পাওয়ার জন্য মায়ের গয়নাও বন্ধক রেখেছিলেন।

সেই সব দিনে সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন থিয়েটার দেখতে। বুঝে ফেলেছিলেন, এই অভিনয়ের জন্যই তাঁর জন্ম। একটা সময় সাক্ষী থিয়েটার গ্রুপে যোগ দিয়ে ফেলেন। সেখানে তাঁর সাথে থিয়েটার করতেন সৌরভ শুকলা, মনোজ বাজপায়ীরা। তখন শুধু রাতে দারোয়ানের কাজটা করতেন। দিনে অনুশীলন, সন্ধ্যায় নাটকের শো আর রাতে দারোয়ানগিরি – এই ছিল নওয়াজের জীবন।

এরই মধ্যে এনএসডির ভর্তি পরীক্ষাতে পাস করে ফেলেন। সেখান থেকে ১৯৯৬ সালে স্নাতক শেষ করে বের হন।

নওয়াজ তখন কাজের জন্য টেলিভিশনের সিরিয়ালগুলোর পরিচালকদের কাছেও ধরণা দিয়েছেন। কিন্তু, বড় কিছু পাচ্ছিলেন না। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ কিংবা ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’-এর ছোট ছোট চরিত্রেই তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল।

না, এখানেই নওয়াজের স্ট্রাগল থেমে যায়নি। টানা চার বছর তিনি পথনাটক করে বেড়িয়েছে। প্রথম সুযোগ পান ১৯৯৯ সালে। সেবার ‘শূল’ ছবিতে একজন ওয়েটারের ও ‘সারফারোশ’ ছবিতে সামান্য একজন অপরাধীর চরিত্র করেন। খুবই সামান্য চরিত্র ছিল সেসব।

আসলে, প্রত্যেকটা বার নিজেরে চেহারার জন্য বাদ পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কেউ তাঁর অভিনয় প্রতিভা নিয়ে কোনো আগ্রহী ছিলেন না। সবাই শুধু বলতো, ‘নায়ক হতে এসেছো? দেখে তো মনে হয় না!’

এমন সময়, ‍মুম্বাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন নওয়াজ। মনে মনে বললেন, ‘যদি না খেয়ে মরতে হয়, তাহলে ‍মুম্বাই গিয়েই মরি।’ ২০০০ সালে তিনি আসলেন স্বপ্নের শহর মুম্বাইয়ে। এর মধ্যেই ‘বাইপাস’ নামের একটা শর্টফিল্ম করলেন ইরফান খানের সাথে।

নওয়াজের জীবনের টার্নিং পয়েন্টও আমার কোনো একটা বিশেষ চরিত্র দিয়ে আসেনি। ২০০৪ সালের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র কথা বলেন কেউ কেউ। কিন্তু, সেন্সর বোর্ডের জটিলতায় সিনেমা আটকে ছিল লম্বা সময়।

২০০৯ সালে ‘নিউ ইয়র্ক’ ছবিতে দুই মিনিটের একটা চরিত্র করেছিলেন। সেখানে জেলে বসে দেওয়া নওয়াজের বয়ানে অনেকে চোখের পানি পর্যন্ত ফেলেছেন। এরপর ২০১০ সালে ‘পিপলি লাইভ’, ২০১১ সালে ‘কাহানি’ – অভিনয় জীবন শুরু করার এক যুগ পর বড় অভিনেতা হওয়া শুরু করলেন নওয়াজ। কালক্রমে গ্যাঙস অব ওয়াসিপুর, তালাশ, লাঞ্চবক্স, বাজরাঙ্গি ভাইজান, মাঝি, মান্তো ছবিগুলো সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে।

নওয়াজের চেহারা কখনোই আহামরী কিছু ছিল না। কিন্তু, তাঁর মনোভাবটাই ছিল অদম্য। তিনি লেগে থাকতে শিখে ফেলেছিলেন। তাই তো এতগুলো বছরপর যখন একবার সাফল্যের দেখা পেতে শুরু করেছেন মুহূর্তের মধ্যে তিনি বনে গেছেন সুপারস্টার। নওয়াজ বলেন, আসলে তাঁর জীবনটা পাল্টে দিয়েছে মায়ের একটা কথা।

তখন, সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্র করেন। বাড়ি গেলে, গ্রামের লোক খোঁচা দিয়ে বলে – ‘ওই যে নায়ক যায়!’ নওয়াজ দাঁতে দাত কামড়ান। জবাব দিতে পারেন না। মা বিষয়টা বুঝতে পারেন। বলেন, ‘একটা শিশুরও তো কিশোরী হতে ১২-১৩ বছর লাগে। আর তোমার তো মোটে ছয় বছর হল। লেগে থাকো।’

ব্যাস, লেগে থাকলেন নওয়াজ। এই সময়ে নওয়াজ কতটা স্ট্রাগল করেছেন তাঁর প্রমান হল ‘সারফারোশ’ আর ‘তালাশ’  – আমির খানের সাথে তাঁর দু’টো ছবির মধ্যকার সময়ের পার্থক্য হল ১৩ বছরের। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় – এর বড় নিদর্শন হলেন তিনি।

প্রচলিত স্টার কাস্টিং সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারাটাই নওয়াজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। নিজের স্টারডম নিয়ে নিন্দুকদের বকবক সব সময়ের জন্য বন্ধ করে দিতে পেরেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে নওয়াজউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হল, আমি ওদের মুখ বন্ধ করতে পেরেছি। আগে লোকে বলতো, ‘আরে এ কি হিরো হবে?’ আর এখন বলে, ‘আরে এ তো করে দেখিয়েছে!’ অনেক সময় আমার মনে হয়েছে মিছে মিছে সময় নষ্ট করছি। ভেবেছি ফিরে যাবো, অন্য কিছু করবো। কিন্তু, কি আর করতাম, জীবনে অভিনয় ছাড়া যে আর কিছুই শিখিনি। আরো ভাবতাম, বাড়ি গেলে বন্ধুরা ক্ষ্যাপাবে, ‘আরে ও তো হিরো হতে গিয়েছিলে, দেখো আবার ফিরে এসেছে!’

সামান্য একটা এক্সট্রা  শিল্পী ছিলেন, সেখান থেকে তিনি এখন বলিউডের ছবিগুলোতে কেন্দ্রীয় চরিত্র করেন। বিশ্বের নামীদামী চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর লাল গালিচা দাঁপিয়ে বেড়ান। তিনি এমন মাপের সব্যসাচী একজন অভিনেতা, যার অধ্যাবসায় ও জীবনের অম্ল-মধুর গল্পটা আর কারো সাথেই মেলে না। ক্ষুদ্র থেকে তিনি বৃহৎ হয়েছে, নেহায়েৎ মাটির মানুষ হয়ে তিনি আকাশ ছুঁয়েছেন। তাঁর এই অনুপ্রেরণার গল্পগুলো তাই টিকে রবে বহুকাল।

এতগুলো বছর সিনেমার জগতে কাটিয়ে দেওয়ার পর নওয়াজের জীবন বোধ, সিনেমা বোধও পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, ‘অভিনয়টা একটা সাগরের মত। এখানে আপনি যত গভীরে যাবেন, তত বেশি বিচিত্র জিনিস আবিষ্কার করবেন। আর সেই গভীরে যাওয়ার যাত্রা আজো চলছে।’

– ফোর্বস ইন্ডিয়া ও ইওর স্টোরি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।