রঘু ডাকাত: একজন বাঙালি রবিনহুড

মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গলায় সোনার মাদুলি, দুই বাহুতে সোনার বাজু, হাতে সোনার বালা, পেশা ডাকাতি – এসব বিবরণ শুনে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে রবিনহুডের কথাই বলা হচ্ছে।

না, যার কথা বলা হচ্ছে তিনি পুরোদস্তর বাঙালি। রঘু, রঘু ডাকাত। তাঁকে বলা হয় বাংলার রবিনহুড। সেটা বলার অবশ্য যথার্থ কারণও আছে। কারণ, তিনি ছিলেন গরীবের বন্ধু।

সেই সময়টা আজ থেকে দেড়শ-দু’শো বছর সময় আগের কথা। ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ শাসন। বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার নৈহাটি। নীল করদের অত্যাচারে জর্জরিতদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতো এই রঘু।

রঘুর দুয়ার থেকে অর্থকষ্টে থাকা মানুষ সাহায্য চেয়ে ফিরে এসেছে এমনটা কখনো শোনা যায়নি। অর্থাভাবে কোনো দরিদ্র মেয়ের বিয়ে আটকে যাচ্ছে, সেখানে বাবার পকেটে কিছু টাকা গুজে দিতেন রঘু। কারো ঘর পুড়ে গেছে, সেখানেও সবার আগে হাজির রঘু। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চোখে তাই তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধার পাত্র।

রঘু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের জন্য হুমকির কারণ। একজন বাঙালি ডাকাতের এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তাঁদের জন্য অপমানজনক ছিল। তাই তো, পুলিশের কাছে তিনি ছিলেন ‘মোস্ট ওয়ানন্টেড ক্রিমিনাল’। তাকে ধরিয়ে দিলে বড় অংকের অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে – এমন ঘোষণাও এসেছিল।

সাধারণ মানুষ সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তাই, রঘুর হদিশ পেত না পুলিশ। স্থানীয় লোকেরা তাঁর ঠিকানা জানলেও, বলত না, পুলিশে ধরিয়ে দেবার তো প্রশ্নই আসে না।

রঘু’র ডাকাতি লাইনে আসার পেছনে একটা গল্প শোনা যায়। কথিত আছে, নীলকুঠির পাইক-পেয়াদাদের হাতে মার খেয়েই মারা যান রঘু’র বাবা। রঘুর তখন কেবল কৈশোর পেরিয়েছেন। তখন বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি।

ভাল লাঠিখেলা জানতেন। সেটাই হয়ে যায় অস্ত্র। থানায় থানায় গিয়ে আগুন লাগিয়ে দেন, নীলকুঠিতে লুটপাট চালান। স্থানীয় তরুণদের তাঁর দলে ভেড়ানোর জন্য উৎসাহিত করতে থাকেন। স্থানীয়রাও দেখলো, এতদিনে একজন এসেছেন যারা তাদের নিজেদেরই লোক, কথাও বলছেন তাঁদের হয়ে। তার ওপর লুটপাটের সব অর্থও বিলিয়ে দিচ্ছে। তাই, জনগণের সমর্থন আর আশীর্বাদ ছিল রঘুর সাথে। সাধারণ মানুষই ছিল তাঁর প্রেরণা, ছিল তাঁর ঢাল। পুলিশ তাই কখনো রঘুকে ছুঁয়েও দেখতে পারেনি।

ইতিহাসে এই রঘু ডাকাতের ঠাঁই হয়নি। গুটিকয়েক লেখকদের লেখায় তিনি বেঁচে আছেন। তাঁকে ঘিরে হাজারো গল্প প্রচলিত। কোনোটা সত্যি, কোনোটা মিথ!

বল হয়, ডাকাত রঘুই বাঘহাটি জঙ্গলে স্থাপিত কালিবাড়ী মন্দিরে নরবলি দেওয়ার প্রথা বন্ধ করেন। সেই মন্দিরে কালিপূজার সময় এখনো তাঁকে স্মরণ করা হয়। নামই পাল্টে রাখা হয়ে রঘু ডাকাত কালি মন্দির।

– আনন্দবাজার ও বেঙ্গলবাজ অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।