রেস ৩ বনাম সাঞ্জু: হলিডে রিলিজ বনাম কনটেন্ট

এ বছর ঈদে বলিউডে সালমান খানের ‘রেস ৩’ মুক্তি পেল। তার ঠিক দুই সপ্তাহ পড় মুক্তি পেল রণবীর কাপুর অভিনীত ‘সাঞ্জু’। ‘রেস ৩’ দর্শক-সমালোচকদের কাছে সমালোচনার স্বীকার হলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে ‘সাঞ্জু’। প্রশংসার বারিধারায় সিক্ত হয়েছে ‘সঞ্জু’।

বিগত কয়েক বছর যাবত বলিউডে ঈদ আর সালমান খানের সিনেমা যেন সমর্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় ভাইজানের সিনেমা। সেই সব সিনেমা দর্শকমহলে সমাদৃত হয়। কিন্তু, বিগত দুই বছর যাবত সালমান খানের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা দর্শকমহল কিংবা সমালোচকদের কাছে সমাদৃত হয় নি।

এর কারণ হিসেবে দুর্বল কাহিনিকে দায়ী করেছেন অনেক সমালোচক। ‘রেস ৩’ রেস ফ্রাঞ্চাইজির মত ব্যবসাসফল ফ্রাঞ্চাইজির চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও কেন সমালোচিত হল? আর ছুটির দিনে মুক্তি না পাওয়া সত্ত্বেও ‘সাঞ্জু’ কীভাবে বক্স অফিসে দাপট দেখাচ্ছে?

শুরুতেই আসি রেস ৩ পরিচালক প্রসঙ্গে। রেস ৩ এর পরিচালক রেমো ডি সুজা।অপরদিকে রেস ১ ও ২ এর পরিচালক হলেন আব্বাস-মাস্তান। আব্বাস-মাস্তান বলিউডের সেরা পরিচালকদের তালিকায় অন্যতম। কিন্তু, রেমো ডি সুজা পরিচালক অপেক্ষা কোরিওগ্রাফার হিসেবে সমাধিক পরিচিত।

তার ‘এ ফ্লাইং জাট’ সিনেমাটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। রেস ১ ও ২ সিনেমার এলবাম দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। রেস ৩ এর গানগুলো শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়নি। বলিউডে গান ছাড়া চলচ্চিত্র অসম্ভব।

এবার আসি, কাহিনির বিষয়ে। রেস ১ ও ২ শক্তিশালী পটভূমিতে নির্মিত হলেও রেস ৩ এর কাহিনী ছিল যথেষ্ট দুর্বল। রেস ফ্রাঞ্চাইজি টুইস্টের জন্য বিখ্যাত হলেও রেস ৩ এ টুইস্ট ছিল না বললেই চলে। সালমান খানের ‘অবান্তর ওড়াওড়ি’ এবং ‘যুক্তিহীন অ্যাকশন’ দর্শকদের করেছে বিরক্ত।

আর ৯০ এর দশকের ফ্যামিলি ড্রামার মত রেস ৩ এর শেষটা দর্শকদের বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গিয়েছে। অনেকে হয়ত সাইফ আলী খানের অনুপস্থিতিকে দায়ী করবেন রেস ৩ এর এমন দুরাবস্থার জন্য। সাইফ আলী খানের ক্যারিয়ারের বর্তমান অবস্থায় কেউই সাইফ আলী খানকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইবে না। সে কারণে হয়ত রমেশ তৌরানি তাকে বাদ দিয়ে সালমান খানকে নিয়েছেন।

‘রেস ৩’ মুক্তির দুই সপ্তাহ পড় মুক্তি পায় ‘সাঞ্জু’। সবার কাছ থেকেই প্রশংসার বারিধারায় সিক্ত হয়েছে ‘সাঞ্জু’। ‘নন হলিডে রিলিজ’ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বক্স অফিসে দাপট দেখাচ্ছে ‘সাঞ্জু’? পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যাই ২০১৬ সালে।বাংলাদেশে তখন চলছিল ‘আয়নাবাজি’ ট্রেন্ড। বাংলাদেশের লাইফ সাপোর্টে থাকা চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি হয়ে এসেছিল আয়নাবাজি। সিনেমা হল গুলো পূর্ণ হয়েছিল কানায় কানায়।

ভাল সিনেমা বানালে দর্শক দেখবেই। ‘সাঞ্জু’র ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। সঞ্জুর পরিচালক রাজকুমার হিরানীকে বলা হয় বলিউডের সেরা পরিচালক। তার ‘পিকে’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘লাগে রাহো মুন্নাভাই’, ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ দর্শক ও সমালোচকমহলে কুড়িয়েছে প্রশংসা। এই ধারায় সর্বশেষ সংযোজন হল ‘সাঞ্জু’।

‘সাঞ্জু’ কি আসলে গতানুগতিক বায়োপিক? না, সাঞ্জু আট দশটা বায়োপিকের মত না।সঞ্জুতে সঞ্জয় দত্তের উপর মিডিয়া কর্তৃক আরোপিত ‘সন্ত্রাসী’ ট্যাগটিকে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে ট্যাগটি যোগ করা যথার্থ ছিল না। দেখানো হয়েছে পিতাপুত্র সম্পর্ক।দেখানো হয়েছে বন্ধুত্ব। সিনেমাটিতে ছিল শক্তিশালী কাহিনী।

সিনেমার গানগুলোও খারাপ ছিল না। ‘সঞ্জয় দত্ত’র চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন রণবীর কাপুর। দর্শকেরা পর্দার রণবীর কাপুর আর বাস্তবের সঞ্জয় দত্তকে আলাদা করতে পারেননি। ছিল রাজকুমার হিরানীর মত এক শক্তিমান পরিচালক। এসবই যথেষ্ট ছিল সমালোচক ও দর্শকদের তুষ্ট করার জন্য।

বলিউডে এখন অনেক দুর্দান্ত কাহিনীর সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। রেস ৩-এর মত সিনেমা এখনকার যুগে দর্শক কিংবা সমালোচক, কারো কাছেই সমাদৃত হবে না। সালমান খানের উচিত চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া। ‘সাঞ্জু’ ও ‘বারফি’র মত মুভি দর্শকদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে রণবীর কাপুরের ওপর।

তাঁর কাছ থেকে আরো অসাধারণ চলচ্চিত্র দেখার প্রতীক্ষায় থাকবে উপমহাদেশের দর্শকেরা। আর, ‘সাঞ্জু’ দিয়ে রাজকুমার হিরানী আবারো প্রমাণ করলেন, ‘রাজকুমার হিরানী মানেই মাস্টারপিস।’ এই সিনেমার সৌজন্যে আবারো বোঝা গেল, হলিডে রিলিজ নয় কনটেন্টই বলিউডে সিনেমার সাফল্যের চাবিকাঠি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।