‘আমার মা বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না’

১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় কোন একটা গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যর্থ হয়ে যায় ভারতের। কর্নেল হরিন্দর সিক্কা তার অধীনস্ত সেনাদের প্রতি রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। ক্ষোভ এতোটাই ছিলো যে তিনি সেনাদের গালিগালাজও করতেছিলেন। গালিগালাজের এক পর্যায়ে সে সেনাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেন। তখনই এক সেনা বলে ওঠেন, ‘সবাই বিশ্বাসঘাতক হয় না। আমার মা বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না।’

রাজি সিনেমার রিভিউ লিখতে বসে হঠাৎ কার্গিল যুদ্ধের এই ঘটনার কথা আসছে কোথা থেকে?

আসছে এজন্যই যে এই ঘটনাই রাজি সিনেমার মুল ভিত্তি। এই ঘটনার পর হরিন্দর সিক্কা খুঁজে বের করেন সেহমাত খান (নাম পরিবর্তিত) নামের সেই নারীকে। পাঞ্জাবের কোটলায় কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে এক শিখ সন্তের সংস্পর্শে পুরোপুরি আধ্যাত্মিক জীবন কাটাতেন তিনি। কে এই সেহমাত খান? কেনই বা তিনি এভাবে জীবন কাটাচ্ছেন ?

দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্বভাবের ছাত্রী সেহমাত খান। সে এতোটাই কোমল স্বভাবের ছিলো যে সামান্য কাঁটা বিঁধে রক্ত বের হলে সেই কাঁটা অন্য কাউকে খুলে দিতে হত। ইনজেকশনের সিরিঞ্জ এর সূচ কে প্রচন্ড ভয় পাওয়া মেয়ে দুই দুইটা খুন করেছিলো দেশের জন্য। দেশের জন্যই জন্যটা উৎসর্গও করেছিলেন। যাঁর দেওয়া তথ্যে ভর করেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ আইএনএস বিক্রান্ত-এর উপরে পাকিস্তানী সাবমেরিন ‘গাজী’ কর্তৃক হামলার ছক ভেস্তে দেয় ভারত।

 

প্রথমে সেহমত মুখ খুলতে চাননি। বারবার বলতেন, তিনি চান তাঁর পরিচয় যেন কেউ না জানে! কাশ্মীরের মেয়েটির বাবা নিজে ভারতের চর হয়ে কাজ করতেন। তিনিই রীতিমতো ছক কষে এক পাক সেনাকর্তার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। সেহমাত সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে শ্বশুরবাড়ি চলে যান, যেখানে বধূবেশে তথ্য পাচার করাই তাঁর কাজ।

বাস্তবের এই সেহমাতকে নিয়েই হরিন্দর সিক্কা-র উপন্যাস ‘কলিং সেহমাত’। সেই বই থেকেই এখন তৈরি হয়েছে ছবি ‘রাজ়ি’, যাতে সেহমাতের ভূমিকায় আলিয়া ভাট অভিনয় নজর কেড়েছে দর্শকের। সেই সঙ্গে বেড়েছে কৌতূহল, সত্যিকার সেহমতকে ঘিরে। কি অদ্ভুত অভিনয় করে গেলেন মেয়েটা।

এই সিনেমায় আলিয়া একটা মুগ্ধতার নাম। এই অভিনেত্রী দুর্দান্ত অভিনয় করে গেছেন। নারীপ্রধান সিনেমায় যথেষ্ট স্ক্রিন টাইম পেয়েছেন আর সেটার যথাযথ ব্যবহার করেছেন অভিনয় দিয়ে। এই বছরের সেরা অভিনেত্রীদের দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে রইলেন আলিয়া এই সিনেমা দিয়ে। আরেকজন আছে ভিকি কৌশল নামের একজন। পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে দুর্দান্ত বছর কাটাচ্ছেন তিনি।

গুলজার সাহেবের কবিতা, গান, শায়রি শুনে যেমন মুগ্ধতা ছড়িয়ে যেতো তেমনি তার একমাত্র মেয়ে হিসেবে লেখায় আর পরিচালনায় হাত পাকাচ্ছেন মেঘনা গুলজার। ২০০৮ সালের নৈরা ডাবল মার্ডার কেস এর উপড় বিশাল ভরদ্ব্যাজ এর চিত্রনাট্যে ‘তালভার’ সিনেমা যারা দেখে ত্থাকবেন তারা মেঘনা গুলজার সম্পর্কে ধারনা রাখবেন। সাথে আছে শঙ্কর-এহসান-লয় এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

সবেচেয়ে বড় কথা নারী পরিচালক, নারী প্রধান সিনেমা, নেই কোন রোমান্টিক গান এমনকি নেই কোন আইটেম নাম্বার, দুর্ধর্ষ মারামারি নেই। এতো কিছু নেই এর ভিতরে আছে শুধু গল্প। সেই গল্পকে পুঁজি করে যখন ৩০-৪০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমা ১৯০ কোটি রুপি ঘরে তুলে আর সেই গল্পে যখন প্রতিবেশী দেশের জন্মযুদ্ধের কথা অন্য ভাবে উপস্থাপন হয় তখন খারাপ তো লাগেই, সাথে হীনমন্যতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। অন্তত একটা দেশের বীরশ্রেষ্ঠর নামটা সঠিক ভাবে ব্যবহার করাই যেত!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।