আর মাধবন: পাশের বাড়ির সেই ‘চকলেট বয়’

তিনি ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে!

এই তথ্যটায় অনেকেই আপত্তি করবেন। কিন্তু, সত্যি কথা হল একটা দিক থেকে আর মাধবন আসলেই সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি হলেন ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে পড়াশোনা করা লোক। সেটা এতটাই যে, অভিনয়ে আসারই কথা ছিল না তাঁর।

সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য একদম শুরু থেকেই শুরু করা যায়। পুরো নাম রঙ্গনাথান মাধবন। ১৯৭০ সালের এক জুন জামশেদপুরে এক তামিল পরিবারে জন্ম মাধবনের। বাবা রঙ্গনাথন ছিলেন টাটা স্টিলের ম্যানেজমেন্ট এক্সিকিউটিভ। মা সরোজা ছিলেন ব্যাংক ম্যানেজার, কাজ করতেন ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায়। বোন দেবিকাও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।

বোঝাই যাচ্ছে, যে পারিবারিক আবহে তিনি বড় হয়েছেন, তাতে পড়াশোনায় মনোনিবেশ না করে কোনো উপায়ও ছিল না মাধবনের। তিনি কোলাপুরের রাজারাম কলেজ থেকে ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাশ করেন।

‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে তাঁকে ফাইনাল পরীক্ষার আগে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ফটোগ্রাফিতে মন দিতে দেখা যায়। বাস্তবেও সেটা হতে পারতো। তরুণ বয়সেই ভারতের সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে তাঁকে বছরখানেক কাটাতে হয় কানাডায়। সেটা ১৯৮৮ সালের কথা। সেখান থেকে ফিরে তিনি ঠিকই ইঞ্জিনিয়ারিংটা আগে শেষ করেন।

২২ বছর বয়সে তিনি মহারাষ্ট্রের এনসিসি ক্যাডারা হিসেবে নিয়োগ পান। দলটির হয়ে ব্রিটেন সফরও করেন। সেখানে ব্রিটিশ আর্মি, রয়্যাল নেভি এবং রয়্যাল এয়ারফোর্সের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। একটা সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মাধবন। সেটাই ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বয়সে মার খেয়ে যান। বয়স ছয় মাস বেশি থাকায় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি তিনি।

কে জানে, এই ঘটনাই হয়তো তাকে একটু একটু করে বিনোদন জগতের দিকে ঠেলে দেয়। মাধবন এরপর পাবলিক স্পিকিং ও ব্যক্তিত্ব উন্নয়নমূলক কিছু কোর্স করেন। মুম্বাইয়ের কৃষ্ণচাঁদ কলেজে পাবলিক স্পিকিংয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনও করেন। পাবলিক স্পিকিংয়ের ওপর ভারতীয় একটি প্রতিযোগীতায় সেরাও হয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে টোকিওতে একটা কনফারেন্সও করে আসেন।

মুম্বাইয়ে থাকার সময়ই নিজের পোর্টফোলিও করেছিলেন। শখের বশে জমা দিয়েছিলেন একটা মডেলিং এজেন্সিতে। সেটাই হয়ে রয় মাধবনের ক্যারিয়ারের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

সিনেমাটোগ্রাফার ও অ্যাড-ফিল্ম মেকার সন্তোষ শিবনের তৈরি একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ পেয়ে যান। ‘স্যান্ডেল ট্যালক’-এর বিজ্ঞাপনে মাধবনের কাজ পছন্দ হয় সন্তোষের। এরপর দক্ষিণী ছবির কিংবদন্তিতুল্য পরিচালক স্বয়ং মণিরত্নমের কাছে মাধবনের নাম সুপারিশ করেন সন্তোষ।

মাধবনের জীবন পাল্টাতে শুরু করে। টেলিভিশনের পর্দায় কাজ করা শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে মণিরত্নমের ছবি ‘ইরুভার’-এর জন্য স্ক্রিন টেস্টও দেন তিনি। পরে মণিরত্নম তাঁকে ‘তামিজশেলভন’ নামে একটি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র দেন।  তবে, শেষ মূহূর্তে বাদ পড়েন তিনি। কারণ, মনিরত্নমের মতে মাধবনের চোখ একদম কিশোরদের মতো, তাঁকে কেন্দ্রীয় দেওয়া যাবে না।

তবে, সেই বছরই ১৯৯৭ সালের হলিউড ছবি ‘ইনফার্নো’ দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু হয় মাধবনের। যদিও, সেটা তখন খুব একটা আলোচিত হয়নি। ২০০০ সালে সেই মনিরত্নমই আবার ফেরেন তাঁর কাছে। তাঁর নির্মানে তামিল ছবি ‘আলাইপায়ুত্থে’ করে ব্যবসায়িক সাফল্যের সাথে সাথে দক্ষিণী ফিল্ম ফেয়ারে সেরা নবাগতর পুরস্কার জিতে যান মাধবন।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০০১ সালে বলিউডে অভিষেক হয়। ‘র‌্যহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ ছবিটি এখনো বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোম্যান্টিক ছবিগুলোর একটি। মাধব শাস্ত্রী বা ম্যাডি চরিত্র করে পাশের বাড়ির মিষ্টি হাসির ছেলের খেতাবও জুটে যায় মাধবনের।

যদিও, বলিউডে কখনােই খুব বেশি স্থায়ী হননি তিনি। তবে, যখন যেটা করেছেন তাতেই প্রশংসার ছাপ রেখে গেছেন। ‘গুরু’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘তানু ওয়েডস মানু’ বা ‘সালা খারুজ’ – কোনোটাকেই হতাশ করা তো দূরের কথা, বরং চরিত্রগুলোকে করেছেন আরো অনন্য।

এই বাছবিচারটাই তাঁকে করেছে সবার থেকে আলাদা, হোক সেটা দক্ষিণ ভারতে বা বলিউডে। ‘র‌্যাহনা হ্যায় তেরে দিল মে’-র সেই পাগলাটে ম্যাডিই তাই ‘আনবে সিভাম’-এ কিংবদন্তি কমল হাসানের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন, ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ফারহানকে কখনোই মনে হয় তিনি র‌্যাঞ্ছোরদাসের মানে আমির খানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। ‘গুরু’র প্রগাঢ় বিজনেস রিপোর্টার শ্যাম সাক্সেনা, ‘তানু ওয়েডস মানু’র নিপাঁট ভদ্রলোক ডাক্তার, ‘সালা খাড়ুজ’-এর রগচটা কোচ, ‘বিক্রমভেদা’র সেই ড্যাশিং পুলিশ অফিসার – কোনো চরিত্রই তাঁকে ছাড়া পূর্ণতা পেত না।

দুই যুগেরও বেশি সময় অভিনয়ে কাটিয়ে দেওয়া মাধবন নিজের এই বাছবিচার করে কাজ করাটাকেই নিজের আত্মবিশ্বাস বলে মানেন, ‘আমি রামজি লন্ডনওয়ালের মত বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়া ছবিও করেছি। কিন্তু, সেখানেও আমার চেষ্টাটা প্রশংসিত হয়েছে। এসব আমার নিজের পছন্দের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আমার ভাবনটাটা সহজ। আমি এগোতে চাই ধীরগতিতে, বড় হতে চাই আস্তে আস্তে, তবে সেই পথটা যেন মসৃন হয়!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।