হায় ধারাভাষ্য!

১.

বাংলা ভাষায় অন্যতম কুৎসিত এবং শ্রুতিকটু ব্যাপার হচ্ছে শ এবং ষ কে স এর মত উচ্চারণ করা। যেমনঃ চেস্টা, কস্ট, বৃস্টি ইত্যাদি। সাধারণত স্বল্প বা অর্ধ শিক্ষিত মানুষ জোর করে শুদ্ধ উচ্চারণ করার চেষ্টা করলে এই ব্যাপারগুলো প্রকট হয়ে ওঠে।

প্রায় একই রকম আরেকটি বিরক্তিকর সমস্যা হল স এর যুক্তাক্ষর দিয়ে শুরু শব্দের আগে ই দিয়ে উচ্চারণ করা, যেটাকে আদি স্বরাগম বলে। যেমন- ইস্টাইল, ইস্কোর, ইস্টেডিয়াম ইত্যাদি। অবশ্য বন্ধু মহলে, হালকা আড্ডায় বা মজা করেও এরকম উচ্চারণ করা হয়। তবে, কোন আড়ম্বর পরিবেশে এই উচ্চারণ কোনমতেই কাম্য নয়।

দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের অধিকাংশ ধারাভাষ্যকারই এই দোষে দুষ্ট। শুধু তাই নয় তাদের আরও অনেক শব্দের উচ্চারণও বিকৃত। যেমন – এখন পর্যন্ত চলমান সাফ ফুটবল টুর্নামেন্টে কাউকে রেফারি শব্দটি ঠিকমত উচ্চারণ করতে শুনি নি। প্রায় সবাই বলছেন ‘রেফ্রি’!

২.

রেডিও এবং টিভি ধারাভাষ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শ্রোতাগণ চোখের সামনে দেখছেন না বলে রেডিও ধারাভাষ্য অনেক বেশি বর্ণনামূলক হতে হয়। এ কারণে ‘এক্স দিলেন ওয়াইকে, ওয়াই দিলেন জেডকে, জেড দিলেন…’ টাইপ ধারাভাষ্য রেডিওতে মানায়, টিভিতে নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিভিতে প্রায় তিন-চার দশক হল এরকম ধারাভাষ্য আর দেয়া হয় না। খুব বেশি হলে তারা শুধু নাম উচ্চারণ করে, যেমন ‘এক্স…ওয়াই…জেড, এগেইন এক্স…’ এবং পুনরাবৃত্তি হলে তারা অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

অথচ আমাদের ফুটবল ধারাভাষ্যকারগণ টানা একশ পাস হলে একশবারই বলবেন এবং একশবারই খেলোয়াড়ের নাম উচ্চারণ করবেন। রেডিও ধারাভাষ্যগণকে জোর করে টিভির সামনে বসিয়ে দিলে যা হয় আর কী। অবশ্য, নবাগতরাও একই দোষে দুষ্ট। হবেই বা না কেন, তাদের আদর্শ তো ঐ নিম্নমানের পুরনোরাই!

পাস দেয়ার ব্যাপারটি ছাড়াও আরও অনেক কিছুই আছে যা আমাদের ধারাভাষ্যকারগণ এখনও ব্যবহার করছেন, অথচ এসব আজ থেকে কয়েক দশক আগেই আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে উঠে গেছে। যেমন- লব দেয়া বা লব উঠানো, মাইনাস করা, সাইড পাস, স্কয়ার পাস, স্টপার ব্যাক ইত্যাদি।

মাঝে মাঝে মনে হয়ে এরা আদৌ কোন আন্তর্জাতিক বা বিদেশি লিগের খেলা দেখেন বা তাদের ধারাভাষ্য শোনেন? ওদের কাছ থেকে কিছুই কি শিখতে পারেন না?!

৩.

ধারাভাষ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হল মুদ্রাদোষ। শুধু আম্‌, উম্ম, অ্যাঁ, ইয়ে, মানে ইত্যাদিই নয়, যে কোন কথা বারবার বলাটাও মুদ্রাদোষ। যেমন- একজন ধারাভাষ্যকার আছেন যিনি একটু পর পর বলছেন ‘এত মিনিটস অন দ্যা ক্লক!’ কোথা থেকে শিখেছেন জানি না, তবে একটু পর পর এটা বলা অবশ্যই মুদ্রাদোষ এবং শ্রবণ কটু। আরেকজন আছেন যিনি যে কোন শটের পর বলেন ‘শটটি গোল পোস্ট বরাবর থাকলে গোল হতে পারত!’

এরকম একজন আছেন যিনি যে খেলোয়াড়কে বল নিয়ে টান দিতে দেখলেই উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠছেন, গোলের সম্ভাবনা ১০০ ভাগ হোক আর এক ভাগই হোক-চিৎকার করবেনই! হ্যাঁ, লাতিন আমেরিকান ধারাভাষ্যকারগণও প্রচুর আবেগ এবং উত্তেজনার সাথে কাজ করেন, এমনকি গোল হবার পর কে কতক্ষণ ধরে ‘গো ও ও ও ল’ বলে চিৎকার করতে পারেন সেটারও প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু বল নিয়ে ছুটতে দেখলেই ওরা অযথা চিৎকার করে না!

৪.

ধারাভাষ্য একটি শিল্প। এবং মোটেই সহজ নয়, বরং কঠিন একটি শিল্প। এই কাজে দক্ষ হবার জন্য খেলার ব্যাপারে আগ্রহ থাকতে হয়, খেলাটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হয়, দেশ-বিদেশের প্রচুর খেলা দেখতে হয়, সব বিষয়ে যাকে বলে আপ-টু-ডেট থাকতে হয়। এসবের পাশাপাশি উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর, পিচিং (শব্দের তীক্ষ্ণতা) ঠিক করা, শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা ইত্যাদি বিষয়েও কাজ করতে হয়। সবশেষে দরকার সেন্স অব হিউমার এবং কমন সেন্স।

মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চোখের সামনে যা দেখছি তা গড়গড় করে বলে যাওয়াই ধারাভাষ্য নয়, অন্তত টিভির ক্ষেত্রে তো নয়ই। বিখ্যাত অজি ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো টিভি দর্শকদের সামনে সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে কথা বলতে বারবার নিষেধ করেছেন। অথচ আমাদের ধারাভাষ্যগণ ঠিক এই কাজটাই করেন।

সারা পৃথিবীর ধারাভাষ্যকারদের মান অনুসারে সাজানো হলে নিকৃষ্টতম দশজনের মধ্যে অধিকাংশই হবে আমাদের দেশ থেকে। আমি অন্তত তিনজনকে (ফুটবল এবং ক্রিকেট মিলিয়ে) চিনি যারা অবশ্যই থাকবে! অবশ্য, আমরা যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পেছনের সারিতে আছি ধারাভাষ্যই বা থাকবে না কেন?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।