বাংলা ছবির খাঁটি সোনা

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

ছায়া দেবী (জন্ম: ৩ জুন, ১৯১৪ – মৃত্যু: ২৭ এপ্রিল, ২০০১)

সত্যি তিনি বাংলা ছবির কনক। খাঁটি সোনা। যার মনটাও ছিল নিখাদ সোনা।

ভাগলপুরে তিন জুন ১৯১৪ সালে জন্ম কনক বালার। প্রাথমিক পাঠ ভাগলপুরের মোক্ষদা গার্লস স্কুলে।পরে বাবার সঙ্গে দিল্লিতে এসে ভর্তি হন ইন্দ্রপ্রস্থ গার্লস স্কুলে। কখনো দিল্লি কখনো কলকাতায় থাকতেন তাঁরা।

কনকবালার অল্প বয়সেই বিয়ে হয় রাঁচির অধ্যাপক ভূদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কিন্তু একবছরও বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। বৈভবের বিয়ে ভেঙে খানখান যখন সে ভালো করে বুঝতই না বিবাহ কি বস্তু!

স্বামী জানিয়ে দেন সংসারে তাঁর মন নেই।কনক ফেরত চলে আসেন উত্তর কলকাতায় বাপের বাড়ি। কিন্তু সেইখান থেকেই যেন জীবনের মোড় ঘুরে গেল কনকবালার।পাশের বাড়ি ছিল সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে’র।

সুরের সরগমে কেটে গেল কনকের বিষাদ জীবন কাহিনী। পাকা শিল্পী হতে থাকল সে। নিতে থাকল সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে গানের তালিম। সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে যিনি মান্না দে’র কাকা। জনপ্রিয়তা পেল কনক গানের আসরে। কিন্তু শুধু গান নয় নাচেও পারদর্শিনী সে। বাপের বাড়িতে যাতায়াত ছিল বায়োস্কোপের লোকদের। তখন চলচ্চিত্র নয় বায়োস্কোপ বলা হত। সেখান থেকেই ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ এল।

সুচিত্রা সেনের সাথে

প্রথম ছবি ‘পথের শেষে’। সেখান থেকেই কনকের নাম বদলে নতুন নামকরণ হল ছায়া দেবী। নতুন তারার জন্ম হল। সেই ছবিতে ছায়াকে দেখে অভিভূত হন নাট্টাচার্য্য দেবকীকুমার বসু। ‘সোনার সংসার’-এ নায়িকা হিসেবে প্রথম সই করান ছায়া দেবীকে।

এরপর বাংলা চলচ্চিত্রে ছায়া যুগ শুরু। ছায়া দেবী অভিনীত সব কটি চরিত্র সেরা। বলে শেষ হবে না। যদি ছবির মান মোটার দাগেরও হয়ে থাকে ছায়া দেবীর অভিনয় নিঁখুত।

সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবিতে না সুযোগ পেয়েও ছায়া দেবী বাংলার জননী। ছায়া দেওয়া বটবৃক্ষই যেন তিনি, এতটাই যার মাতৃত্ব। যার বিকল্প হয়না।

সত্যজিতের ছবি হয়তো তিনি পাননি এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন অকুণ্ঠ। প্রতিটি চরিত্রে তিনি তাঁর সবটা দিয়ে লেজেন্ডারি করে গেছেন।

উত্তম সুচিত্রা জুটি ছবির অনেকটাই টেনে দিতেন ছায়া দেবী।

অজয় করের ‘সাত পাকে বাঁধা’য় ছায়া দেবী সহনায়িকার পুরস্কার না পেলেও অর্চনার মা হয়ে তিনি ঘরে ঘরে মেয়েদের বেশি ভালো করতে গিয়ে ক্ষতি করে দেওয়া মায়েদের গল্প বলে গেছেন। যা আজও প্রাসঙ্গিক।

সেই দাপটের একদম বিপরীত নীরব চরিত্র রিনার মা আয়া। যে নিজের মেয়েকে আয়া ধাইমার পরিচয়ে বড় করে তুলে প্রান দেয় লম্পট সাহেব স্বামীর বন্দুকের গুলিতে। কি নিরুচ্চার অথচ ঘা দেওয়া অভিনয়।

ছায়া দেবীর কান্নার দৃশ্যে অভিনয় করতে চোখে গ্লিসারিন লাগতনা আপনা থেকেই চোখে জলের বন্যা বয়ে যেত। এই মস্ত সাধনা মাধবী মুখোপাধ্যায় ছায়া দেবীর অভিনয় দেখে শেখেন।

‘বিদ্যাপতি’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’-র শুচিবাই গ্রস্থ বিধবা বড় বউ থেকে শুরু করে ‘হারমোনিয়াম’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘আপনজন’, ‘দেয়া নেয়া’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘রাজকুমারী’, ‘ধনরাজ তামাং’, ‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’ বলে শেষ হবেনা।

তপন সিনহার ‘নির্জন সৈকতে’ ছবির জন্য চার অভিনেত্রী ছায়া দেবী, ভারতী দেবী, রেণুকা রায় ও রুমা গুহঠাকুরতা সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার ভাগ করে নেন। যা এক বাংলা ছবিতে যুগান্তকারী ঘটনা।

নায়িকা রূপে পার্শ্বনায়িকা রূপে ছায়া দেবীর হারিয়ে যাওয়া নাম না জানা অনেক ছবি ‘রজনী’, ‘হারজিৎ’, ‘হাল বাংলা’, কানন দেবীর সঙ্গে ‘অনির্বান’, ‘যখের ধণ’, ‘বামণ অবতার’, ‘জনক নন্দিনী’, ‘বন্দিতা’, ‘বার্মার পথে’ অজস্র ছায়াছবি। যা অনেক গুলোই লুপ্ত।

মাইলস্টোন ছবি করার পরেও শেষ জীবনে খুব একা হয়ে পড়েন। নিজের অভিনয় জীবনে পাওয়া পুরস্কার গুলো ফিরেও দেখতেননা। ছায়া দেবীও অনেকটাই সুচিত্রা সেনের মতো বেশি ভিড়, বেশি লাইমলাইটে থাকা পছন্দ করতেন না।নিজের শর্তে বাঁচতেন।

দেবশ্রীর সাথে

উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা দুটো বাড়ি যেতেন। এক দেবশ্রী-তনুশ্রী’র বাড়ী। যারা কনকের দুই মেয়ে চুমকি আর ঝুমকি। আর তার স্ক্রিণ কন্যা প্রাণের সখী সুচিত্রা সেনের বাড়ি। সুচিত্রা অন্তরালে যাবার পরও ছায়া দেবীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। হত আড্ডা গল্প রান্না করে খাওয়া দাওয়া।

ছায়া দেবীর ভাইঝি থাকলেও তার কন্যাসম ছিলেন দেবশ্রী রায় ও তাঁর দিদি তনুশ্রী রায় ভট্টাচার্য্য। শেষ জীবনে ছায়া দেবীর সাথী তাঁরাই। যত খুনসুটি তাদের সঙ্গেই। শেষ ছবিও দেবশ্রীরই সঙ্গে। ১৯৯৩-এ রাম মুখোপাধ্যায়ের ‘তোমার রক্তে আমার সোহাগ’। একটা দোলের গানে ঐ ছবিতে নেচেওছিলেন ছায়া দেবী।

২০০১ সালের ২৭ এপ্রিল তাঁর জীবন অবসান ঘটান সৃষ্ঠিকর্তা। তবুও ছায়া দেবীকে বাংলা ছবির মায়ের আসন থেকে সরাবে কার সে সাহস? প্রয়ানের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা ছবিতে ঝনক ঝনক কনক কাঁকন চিরকালই বাজবে।

দুই বোন – তনুশ্রী ও দেবশ্রী

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।