বাংলা চলচ্চিত্রের সাইকোপ্যাথ চরিত্র

সাইকোপ্যাথ (Psychopath) একটি মানসিক অসুস্থতা যা মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় ‘পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার’ নামে পরিচিত। এধরনের রোগ নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আবেগ ও সহানুভূতি বর্জিত অপরাধ প্রবণতা, শারীরিক আগ্রাসন, অসামাজিক আচরণ, বেপরোয়া ঝুঁকি গ্রহণ করা, ঠাণ্ডা মাথায় অন্যায় করা, নিজ দোষ শিকার না করা, নিজেকে অনেক কিছু মনে করা, মানুষকে মিথ্যা দিয়ে প্রভাবিত করা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, প্ল্যান করে খারাপ কাজ করা, ধান্দাবাজি, মানুষের ক্ষতি করে অনুতপ্ত না হওয়া, মানুষের কষ্ট দেখে উপহাস করা এসকল আচরণ একজন সাইকোপ্যাথ এর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।

সারা দুনিয়াতে বিশেষ করে হলিউড এবং কোরিয়ান মুভিজগতে সাইকোপ্যাথদের নিয়ে বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এদের মধ্যে অনেক চলচ্চিত্র বিপুল জনপ্রিয়তা ও প্রশংসা অর্জন করেছে। তবে সে অনুপাতে উপমহাদেশে এই ঘরানার কাজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিমাণ খুবই কম।

পৃথিবীর দশ কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারদের একজন আমাদের দেশের নাগরিক, অথচ আমাদের দেশে সাইকোপ্যাথ কিংবা সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে কি কি কাজ হয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। তো এই লেখার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য অল্প কিছু সাইকোপ্যাথ চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। লেখায় উক্ত চলচ্চিত্রগুলোর গল্প নিয়ে কম-বেশি আলোচনা করা হয়েছে অর্থাৎ স্পয়লার রয়েছে, মূল লেখায় যাওয়ার আগেই বলে নিচ্ছি।

  • বড় ভাই – হুমায়ূন ফরিদী (বিশ্বপ্রেমিক – ১৯৯৫)

১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত রোম্যান্টিক-সাইকো-থ্রিলার ঘরানার চলচ্চিত্র ‘বিশ্বপ্রেমিক’। রুবেল, মৌসুমী, সোহেল রানা, খলিল, গোলাম মোস্তফারদের মতো তারকা ও শক্তিমান অভিনেতাদের থাকার পরও, হুমায়ূন ফরিদীর সেই ভয়ানক চরিত্র ও অভিনয়ের কারণে এছবিটি বাংলা সিনেপ্রেমীদের কাছে এখনো বিশেষ কিছু হয়ে আছে।

এখানে হুমায়ূন ফরিদীর চরিত্রটি মানসিকভাবে বিপর্যস্থ একটি চরিত্র, যিনি মেয়েদের বুকের তিল সংগ্রহ করেন! কারণ তিনি মনে করেন এটি থাকলে মেয়েরা বিপথগামী হয়ে যায়। ছোটবেলায় তিনি তার মা কে পরকিয়াকৃত অবস্থায় দেখার পর থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার মায়ের বুকেও তিল থাকায় তার মনে এমন বিশ্বাসের তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তিনি তিল সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক মেয়েকে গুম ও খুন করেন।

  • শাহজাহান শিকদার – শাকিব খান (খুনি শিকদার – ২০০৪)

২০০৪ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় মনোয়ার খোকন পরিচালিত ক্রাইম, অ্যাকশন ও ড্রামা জনরার চলচ্চিত্র ‘খুনি শিকদার’; যেখানে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন শাকিব খান, নদী, লিটন হাশমি, সোহেল সহ আরো অনেকে। কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের জীবনের ছায়া অবলম্বনে এ ছবিটি নির্মিত হয়েছে।

 

এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র শাহজাহান শিকদার পেশায় একজন চোর। চুরি করতে গিয়ে একাধিকবার ধরা পড়ায় গ্রামবাসী তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তার মা বাঁধা দিতে গেলে তিনি শাহজাহানের চোখের সামনেই পরলোকগমন করেন। অনুতপ্ত শাহজাহান এতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং ক্রোধান্বিত হয়ে শহরে চলে যান৷ ঘটনাক্রমে তিনি সেখানকার একটি লোকাল গ্যাংয়ে যোগ দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

একটা সময় তিনি এক রাতের মধ্যে গ্যাং লিডারদের খুন করে ‘বড় দাদা’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে গুম, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকান্ডে লিপ্ত হন। ২০০৪ সালে ছবিটি মুক্তির পর শাকিব খানের অভিনয় সমাদৃত হলেও কুরুচিপূর্ণ গান এবং অশ্লীল দৃশ্যাবলির জন্য তুমুল সমালোচিত হয়েছিল।

  • মারুফ – কাজী মারুফ (অন্য মানুষ – ২০০৪)

একই বছর অর্থাৎ ২০০৪ সালেই মুক্তি পায় কাজী হায়াত পরিচালিত রোম্যান্টিক-থ্রিলার ঘরানার ছবি ‘অন্য মানুষ’। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন কাজী মারুফ, শাবনূর, শাকিল খান, রাজিব, ডন সহ আরো অনেকে। এছবিটি এর এক বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল ছবি ‘কাধাল কোন্দেন’-এর (২০০৩) আনক্রেডিটেড রিমেক।

এখানে মারুফ এতিম, ছোটবেলায় পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত অবস্থায় বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গায় চোখের সামনে তার পিতামাতা নিহত হয়৷ সেই ট্রমা নিয়ে মারুফ পরবর্তীতে এতিমখানায় বড় হয়, সেখানে তিনি বিভিন্নভাবে বারবার লাঞ্ছিত হন। পদে পদে জীবনের বিভিন্ন জায়গায় লাঞ্ছনা ও অপমান সহ্য করতে করতে একসময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন৷ কলেজের একটি মেয়েকে একতরফা ভালোবাসতে গিয়ে তিনি তার আপনজনদের খুন করে ফেলেন। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পর এছবিটি দর্শকমহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল, ‘ইতিহাস’, ‘অন্ধকার’-এর পর কাজী মারুফ এই ছবিতেও তার অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত হয়েছিলেন।

  • অমিত – মাহফুজ আহমেদ ও সোনিয়া – জয়া আহসান (জিরো – ২০১৫)

২০১৫ সালে নির্মাতা অনিমেষ আইচ নির্মাণ করেন ক্রাইম-থ্রিলার জনরার ছবি ‘জিরো ডিগ্রি’। এখানে একটি নয়, দু-দুইটি মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্র তো বটেই, উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে একাধিক সাইকো চরিত্র নিয়ে এক চলচ্চিত্রে কাজ হয়েছে এমন উদাহরণ ততকালীন সময় পর্যন্ত খুব কম পাওয়া যাবে। এখানে মূলত দুজন সাইকোপ্যাথের গল্প পাশাপাশি চলতে থাকে, পরবর্তীতে এদের গল্পগুলো একসূত্রে মিশে যায়৷

অমিত পেশায় একজন চাকরিজীবী, স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে নিয়ে তার সংসার৷ ঘটনাক্রমে অমিতের স্ত্রী পরকিয়ায় জড়িয়ে অমিত ও তার ছেলেকে দেশে রেখে বিদেশে চলে যান। এরপর রোড এক্সিডেন্টে ছেলের মৃত্যু হলে অমিত স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে সম্পূর্ণভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে গ্রামের জমিদার পরিবারে বেড়ে ওঠা সোনিয়া ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে মেয়ে নিয়ে তার পিতার আমোদ-প্রমোদ। সোনিয়ার মা এতে প্রতিবাদ করতে গেলে সোনিয়ার সামনেই তিনি নিহত হন।

এর কয়েক বছর পর সোনিয়া গ্রাম থেকে পালিয়ে শহরে চলে এলে দুষ্টলোকের তাড়নায় পড়ে একাধিকবার লাঞ্ছিত ও ধর্ষিত হন, এতে করে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে দুজনই প্রতিশোধের খেলায় মেতে ওঠেন, সাইকোপ্যাথ কিলারে পরিণত হন। ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া এ ছবিটি দর্শকমহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে মাহফুজ আহমেদ ও জয়া আহসান দুজনেই যথাক্রমে সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হন।

  • জিসান – তাসকিন রহমান (ঢাকা অ্যাটাক – ২০১৭)

২০১৭ সালে নির্মাতা দীপন্কর দীপন নির্মাণ করেন পুলিশ-এ্যাকশন-থ্রিলার ঘরানার চলচ্চিত্র “ঢাকা অ্যাটাক”; যেখানে একজন স্মার্ট সাইকোপ্যাথ কিলার শেষ পঁয়ত্রিশ মিনিটের উপস্থিতি দিয়ে পর্দা কাঁপানো পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিলেন!

এখানে জিসান চরিত্রটি ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিমান, কিন্তু মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ। মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলা সে বেশ উপভোগ করে। একসময় তার পিতা দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে এটি তাকে মানসিকভাবে আঘাত করে, এতে তিনি তার পিতামাতা দুজনকেই খুন করেন। পরবর্তীতে তার অসৎ চাচা বিশাল সম্পত্তি ভোগের উদ্দেশ্যে তাকে লালনপালন করে, তবে বড় হওয়ার পর জিসান তার চাচার উদ্দেশ্য ধরে ফেললে তিনি মালয়েশিয়া পালিয়ে যান এবং সেখানকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেন।

পরবর্তীতে নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশকে সিরিয়াল বোম্বব্লাস্টের মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেন। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন আরিফিন শুভ, মাহিয়া মাহি, এবিএম সুমন, কাজী নওশাবা আহমেদ, শতাব্দী ওয়াদুদ সহ আরো অনেকে।

মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি দর্শকমহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল এবং তাসকিন রহমান এছবিতে অভিনয়ের পর রাতারাতি তারকাখ্যাতি পেয়ে যান। এই চরিত্রটির জন্য তিনি সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে মেরিল-প্রথম আলো পুরষ্কার অর্জন করেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।